প্রথম পাতা
আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
শাফকাত মুনীর, জ্যোতি এম. পাঠানিয়া
২০২০-১২-১৮
ঊনপঞ্চাশ বছর আগে প্রায় এই সময়ে বাংলাদেশের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল বিশ্ব। একটি রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছিল। বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী যখন ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন পুরোদমে যুদ্ধ চলছে। ১৯৭১ সালের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, দৃঢ়তা পেয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সেই সম্পর্ক অদ্বিতীয়। অর্ধ শতাব্দী ধরে এই সম্পর্ক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। দুই দেশের জনগণ নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে একত্রে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। আমরা যখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রথম অর্ধ শতাব্দীর দিকে অগ্রসর হচ্ছি, তখন আগামী পঞ্চাশ বছর কি ঘটবে তা দেখার সময় এসে গেছে। এখন সময় আমাদের সাফল্যকে মূল্যায়ন করা, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলোকে স্বীকার করে নেয়া এবং বদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে চিন্তা করা দরকার যে, এই সম্পর্ককে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে কি কি করা যেতে পারে।
অনেক প্রশ্ন আছে, তাৎক্ষণিকভাবে যা উত্থাপন করা উচিত। যেমন আমাদের কি অর্জিত সম্মান নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা উচিত অথবা এই সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক অন্তঃদর্শনে লিপ্ত হওয়া উচিত? যেহেতু নতুন প্রজন্মের হাতে চলে যাবে সব, যারা দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও সভ্যতার বন্ধন হয়তো মূল্যায়ন করতে পারে। কিন্তু পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো আবেগঘন সম্পর্ক অথবা সামষ্টিক স্মৃতি একই রকম তাদের মধ্যে নাও থাকতে পারে। কীভাবে আমরা তাদের সঙ্গে এই সম্পর্ককে যুক্ত করতে পারি? ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এই যুগে ঢাকা ও নয়া দিল্লি পরিবর্তিত পরিস্থিতি কীভাবে পরিচালনা করবে? আমরা কি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে অসংলগ্ন কথাবার্তাকে পিছনে ফেলে বৈশ্বিক বৃহত্তর ইস্যুগুলোর সঙ্গে মিশে যেতে পারবো? এসবের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, পরবর্তী ৫০ বছরে আমাদের সম্পর্ককে কীভাবে আমরা আরো উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবো?
নতুন সুদূরপ্রসারী সহযোগিতা: অসংখ্য চ্যালেঞ্জ, উভয় রাজধানীতে দোদুল্যমানতা এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে দৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। এই কৃতীত্বের বড় অংশীদার ঢাকা এবং নয়া দিল্লি উভয় স্থানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তারা সম্পর্ককে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে আসতে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। গত এক দশকের সবচেয়ে বড় সফলতার অন্যতম হলো, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সফল মেকানিজম তৈরি করা হয়েছে এবং কার্যকর আস্থা গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে আরো অনেক কাজ এখনো করতে হবে। সম্ভাবনা সীমাহীন। কিন্তু চারটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
১. সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রপন্থা মোকাবিলায় উভয় দেশ একত্রে বড় সফলতা অর্জন করেছে। অপারেশনাল সহযোগিতা বিভিন্নভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। যেমন যৌথ অপারেশন, তদন্ত এবং তথ্য বিনিময়ের ক্রমবর্ধমান ও অব্যাহত সহযোগিতা। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের এক সময়ের অস্থিরতা কাটিয়ে সেখানে স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যখন সন্ত্রাসের হুমকিকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, মোকাবিলা করেছে, তখন একইভাবে ভারতের সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন সময় এসেছে কাউন্টার ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজমের (সিভিই) বিরুদ্ধে অপারেশন এবং অধিক শক্তি বিনিয়োগের বাইরেও চিন্তা করার। উগ্রপন্থা মোকাবিলার, বিশেষ করে তরুণদের উগ্রপন্থার ক্ষেত্রটিতে- দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। এই তরুণ উগ্রপন্থা দ্রুত একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। প্রিভেনশন অব ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজ (পিভিই) বা সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত যৌথ কৌশল অবলম্বনের সুযোগ রয়েছে। আগামী দশকে সহিংস উগ্রপন্থা বা সন্ত্রাসের হুমকির বিষয়ে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী এবং তরুণদের মধ্যে সহিংস উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে যৌথ কর্মসূচির মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবিলা হতে পারে আরেকটি মূল বিষয়। একে মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি করার একটি সুযোগ আছে। অপারেশনাল সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো যাচাই করার জন্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে যে, আর কি কি নতুন উদ্দীপনা বা পদক্ষেপ যুক্ত করা যেতে পারে। তথ্য শেয়ার করা এমন একটি খাত, যা সুনির্দিষ্টভাবে সম্পর্ক উন্নয়নে এবং উন্নত করার একটি সুযোগ। সন্ত্রাসের ‘নিঃসঙ্গ নেকড়ে’ বা চুপিসারে সন্ত্রাসী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অধিক জোরালো হুমকি হয়ে উঠেছে। একসঙ্গে এমন হুমকি মোকাবিলার ধারণা এবং কৌশল উন্নত করার সুযোগ থাকতে পারে। অনেক যৌথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও নতুন নতুন ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা দরকার, যেখানে যৌথ প্রশিক্ষণ অধিক কার্যকর হতে পারে।
২. বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে জল প্রবাহ। তিস্তার জল বণ্টন নিয়ে বিরোধ তো রয়েছেই। একই সঙ্গে, ব্রহ্মপুত্র নদসহ ভারত যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে তা নিয়েও ঘোর আপত্তি তুলবে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে দুই দেশকে অবশ্যই একইসঙ্গে কাজ করতে হবে। ২০২৬ সালেই গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি রয়েছে তা শেষ হচ্ছে। তাই এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং গঙ্গার জলপ্রবাহ নিয়ে গবেষণা শুরু করতে হবে। নিকট ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে মানুষ স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হবে। একইরকম ঝুঁকির মুখে রয়েছে ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলোও। তাই বাংলাদেশ ও ভারত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি যৌথ নদী সেক্রেটারিয়েট গঠন করতে পারে। পাশাপাশি, পানযোগ্য জল নিশ্চিতে লবণাক্ত জলের ডি-স্যালাইনাইজেশন প্রকল্প হাতে নিতে পারে দুই দেশ। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন উভয় দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের এক হয়ে কাজ করা এখন সময়ের দাবি।
৩. আগামী ৫০ বছর হবে সত্যিকার ডিজিটাল যুগ। নতুন নতুন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আমাদেরকে পুরোপুরি কোথায় নিয়ে যাবে তা হয়তো কল্পনা করাও কঠিন। বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়েই ডিজিটাল বিপ্লবকে আলিঙ্গন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ প্রযুক্তি- যেমন ৫জি ও স্যালেটাইট প্রযুক্তির মতো বৃহত্তর প্রযুক্তি সহযোিগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। উভয় দেশের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়, আইটির প্রাণকেন্দ্র এবং উদ্ভাবকদের আরো সমন্বিত ও নেটওয়ার্ক ভিত্তিক বন্ধন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের জন্যও সহযোগিতা এবং একত্রে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারিতে আমাদের জীবন যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে, তখন রোগ নিরাপত্তা, মহামারি নিয়ে অধিক যৌথ গবেষণার সুযোগ রয়েছে এবং মেডিকেল পেশার ব্যক্তিদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। যৌথভাবে মূল্যায়ন যাচাই করা হলে পরবর্তী মহামারি রোধে কৌশলগত বিস্ময় বেরিয়ে আসতে পারে। টেলিমেডিসিন বিষয়ক বৃহত্তর গবেষণাও করা যেতে পারে, যা কোভিডকালীন অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে।
৪. উদীয়মান প্রজন্মকে অধিকহারে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। এই মুহূর্তে প্রয়োজন দুই দেশের তরুণদের মধ্যে বড় ধরনের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা। বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া খবর এবং গভীর মিথ্যার এই যুগে একে অন্যের বিরুদ্ধে ভুল ধারণার শিকারে পরিণত হওয়া খুবই সহজ এই যুব সমাজের, বিশেষ করে একটি অংশের। যোগাযোগ বৃদ্ধি করার ফলে শুধু একে অন্যের সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলোই সরে যাবে এমন না। একই সঙ্গে খুলে যাবে গঠনমূলক বিতর্ক এবং আলোচনার সুযোগ। খুলে যাবে অনুধাবনের বৃহত্তর সুযোগ। সড়ক, সেতু এবং পানিপথের সংযুক্তি নিয়ে কথা বলে আমরা অনেক সময় ব্যয় করেছি। কিন্তু এটা হলো মানসিক সংযুক্তি, যা হবে চূড়ান্ত বিনিয়োগ।
বৈশ্বিক ইস্যু এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৃহত্তর রূপান্তর
অনেক সময় গত অর্ধ শতাব্দীর সফলতার গল্প বলা এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বিগ না হওয়া খুব সহজ। যেকেউ হয়তো যুক্তি দেখাবেন যে, সম্পর্ককে টেকসই এবং সফল করার জন্য আমাদের পার্থক্যগুলো চিহ্নিত করতে এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে এতো বেশি কথা বলা হয়েছে যে, এখন আমাদের শুধু মুক্তমন নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কথা বলতে হবে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক অসমতা, পানি বণ্টনের সমস্যা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এসব চ্যালেঞ্জের মূলে। মাঝে মাঝে উল্লেখযোগ্য অর্জনকে তাচ্ছিল্য করা হয়। তাই আন্তরিক প্রত্যাশা হলো, এসব সমস্যার একটি টেকসই সমাধান বের করতে উভয় সরকার একত্রে কাজ করবে এবং তীব্র সমালোচনা এবং নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীদের সুযোগ অস্বীকার করবে। এই শ্রেণিটি দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে তার ভিতর থেকে লাভ খোঁজে। আমরা শুধু তখনই সমৃদ্ধি অর্জন করবো, যদি আমরা চ্যালেঞ্জ, প্রতিবন্ধকতাকে মুক্তমনে গ্রহণ করি এবং স্বীকার করি যে, কোনো সম্পর্কই যথার্থ নয়।
এক দশকের ওপরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের (ট্র্যাক ২) প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন হিসেবে মাঝে মাঝে মনে করি, দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় আমরা খুব বেশি বিধিনিষেধের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছি। সীমান্তের ওপারে আমার অনেক সহকর্মীরও হয়তো একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। সাইবার সুশাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অভিন্ন নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের সমৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে আরো অর্থপূর্ণ আলোচনায় আমাদের যুক্ত হওয়ার সময় এসে গেছে। যেহেতু অর্থনৈতিক গতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ, তাই ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিনিয়োগ আনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার শক্তি আছে তার। অভিন্ন সমৃদ্ধিতে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে প্রয়োজন যৌথ গবেষণা এবং সহযোগিতা। স্মার্ট সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর সমন্বয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে এমন সব সমস্যার সমাধান করতে, যা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। আগামী ৫০ বছরে যদি আমরা এই যৌথ সহযোগিতার ফল পেতে চাই তাহলে ঢাকা এবং নয়া দিল্লির কৌশল এবং নীতি গ্রহণকারীদের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কৌশলকে ‘রিডাবল’ করতে হবে। এই সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত রাখতে পারেন এবং রাখবেন থিংক ট্যাংকরা। এভাবেই ‘ট্র্যাক-২’ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন অধিকতর অনুপ্রেরণা বাক্সবন্দি চিন্তাভাবনাকে সাহস জোগানো এবং সহজতর করা।
বাংলাদেশ নিছক একটি ভৌগোলিক সত্তা এমন নয়। এটি হলো রক্ত দিয়ে আত্মত্যাগ আর সম্পদহানির মাধ্যমে অর্জিত একটি আদর্শ। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাসকে মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ শক্তিশালী, প্রাণবন্ত এবং প্রফুল্ল জাতি হিসেবে উঠে দাঁড়িয়েছে। এর আছে দৃঢ় সামাজিক সূচক, অর্থনৈতিক পথচলা। এসব দেখে অনেকে বিস্মিত হন। বাংলাদেশ যখন আগামী ৫০ বছরের জন্য তার গতিপথ নির্ধারণ করছে এবং যাত্রাপথ ঠিক করছে, তখন বাংলাদেশ চায় ১৯৭১ সালে গড়ে উঠা ঐতিহাসিক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আরো পরিপক্ব, টেকসই এবং দৃঢ় বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে। ঠিক এখনই প্রয়োজন একটি নিপুণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে স্বীকার করে নেয়া হবে চ্যালেঞ্জগুলোকে। কখনো কখনো এটাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাকেও সম্মান করতে হবে। চূড়ান্তভাবে এতে জোর দেয়া হবে অভিন্ন প্রবৃদ্ধি আর সমৃদ্ধিতে। সহযোগিতার সুযোগ অসীম। আর আমরা আমাদের নিজস্ব কল্পনায় সীমিত। আগামী প্রজন্মের কাছে এটা আমাদের শুধু পৌঁছে দেয়ার মধ্যেই দায়িত্বের শেষ নয়। একই সঙ্গে এ দায় অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সার্ভিসম্যানের প্রতিও। যারা সেই উত্তাল ডিসেম্বরেও তাদের চূড়ান্ত আত্মদানের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তারা হয়তো এটা একটিমাত্র কারণেই করেছিলেন। সেটা হলো একটি স্বপ্নকে অনুধাবন করেছিলেন তারা। একটি আদর্শকে লালন করেছিলেন, যাকে আজ আমরা বাংলাদেশ বলি।
(শাফকাত মুনীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর রিসার্স ফেলো এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর টেরোরিজম রিসার্স-এর প্রধান। জ্যোতি এম. পাঠানিয়া দিল্লির সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজের উর্ধতন কর্মকর্তা)
অনেক প্রশ্ন আছে, তাৎক্ষণিকভাবে যা উত্থাপন করা উচিত। যেমন আমাদের কি অর্জিত সম্মান নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা উচিত অথবা এই সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক অন্তঃদর্শনে লিপ্ত হওয়া উচিত? যেহেতু নতুন প্রজন্মের হাতে চলে যাবে সব, যারা দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও সভ্যতার বন্ধন হয়তো মূল্যায়ন করতে পারে। কিন্তু পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো আবেগঘন সম্পর্ক অথবা সামষ্টিক স্মৃতি একই রকম তাদের মধ্যে নাও থাকতে পারে। কীভাবে আমরা তাদের সঙ্গে এই সম্পর্ককে যুক্ত করতে পারি? ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এই যুগে ঢাকা ও নয়া দিল্লি পরিবর্তিত পরিস্থিতি কীভাবে পরিচালনা করবে? আমরা কি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে অসংলগ্ন কথাবার্তাকে পিছনে ফেলে বৈশ্বিক বৃহত্তর ইস্যুগুলোর সঙ্গে মিশে যেতে পারবো? এসবের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, পরবর্তী ৫০ বছরে আমাদের সম্পর্ককে কীভাবে আমরা আরো উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবো?
নতুন সুদূরপ্রসারী সহযোগিতা: অসংখ্য চ্যালেঞ্জ, উভয় রাজধানীতে দোদুল্যমানতা এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে দৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। এই কৃতীত্বের বড় অংশীদার ঢাকা এবং নয়া দিল্লি উভয় স্থানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তারা সম্পর্ককে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে আসতে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। গত এক দশকের সবচেয়ে বড় সফলতার অন্যতম হলো, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সফল মেকানিজম তৈরি করা হয়েছে এবং কার্যকর আস্থা গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে আরো অনেক কাজ এখনো করতে হবে। সম্ভাবনা সীমাহীন। কিন্তু চারটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
১. সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রপন্থা মোকাবিলায় উভয় দেশ একত্রে বড় সফলতা অর্জন করেছে। অপারেশনাল সহযোগিতা বিভিন্নভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। যেমন যৌথ অপারেশন, তদন্ত এবং তথ্য বিনিময়ের ক্রমবর্ধমান ও অব্যাহত সহযোগিতা। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের এক সময়ের অস্থিরতা কাটিয়ে সেখানে স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যখন সন্ত্রাসের হুমকিকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, মোকাবিলা করেছে, তখন একইভাবে ভারতের সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন সময় এসেছে কাউন্টার ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজমের (সিভিই) বিরুদ্ধে অপারেশন এবং অধিক শক্তি বিনিয়োগের বাইরেও চিন্তা করার। উগ্রপন্থা মোকাবিলার, বিশেষ করে তরুণদের উগ্রপন্থার ক্ষেত্রটিতে- দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। এই তরুণ উগ্রপন্থা দ্রুত একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। প্রিভেনশন অব ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজ (পিভিই) বা সহিংস উগ্রপন্থা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত যৌথ কৌশল অবলম্বনের সুযোগ রয়েছে। আগামী দশকে সহিংস উগ্রপন্থা বা সন্ত্রাসের হুমকির বিষয়ে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী এবং তরুণদের মধ্যে সহিংস উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে যৌথ কর্মসূচির মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবিলা হতে পারে আরেকটি মূল বিষয়। একে মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি করার একটি সুযোগ আছে। অপারেশনাল সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো যাচাই করার জন্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে যে, আর কি কি নতুন উদ্দীপনা বা পদক্ষেপ যুক্ত করা যেতে পারে। তথ্য শেয়ার করা এমন একটি খাত, যা সুনির্দিষ্টভাবে সম্পর্ক উন্নয়নে এবং উন্নত করার একটি সুযোগ। সন্ত্রাসের ‘নিঃসঙ্গ নেকড়ে’ বা চুপিসারে সন্ত্রাসী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অধিক জোরালো হুমকি হয়ে উঠেছে। একসঙ্গে এমন হুমকি মোকাবিলার ধারণা এবং কৌশল উন্নত করার সুযোগ থাকতে পারে। অনেক যৌথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও নতুন নতুন ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা দরকার, যেখানে যৌথ প্রশিক্ষণ অধিক কার্যকর হতে পারে।
২. বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে জল প্রবাহ। তিস্তার জল বণ্টন নিয়ে বিরোধ তো রয়েছেই। একই সঙ্গে, ব্রহ্মপুত্র নদসহ ভারত যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে তা নিয়েও ঘোর আপত্তি তুলবে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে দুই দেশকে অবশ্যই একইসঙ্গে কাজ করতে হবে। ২০২৬ সালেই গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি রয়েছে তা শেষ হচ্ছে। তাই এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং গঙ্গার জলপ্রবাহ নিয়ে গবেষণা শুরু করতে হবে। নিকট ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে মানুষ স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হবে। একইরকম ঝুঁকির মুখে রয়েছে ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলোও। তাই বাংলাদেশ ও ভারত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি যৌথ নদী সেক্রেটারিয়েট গঠন করতে পারে। পাশাপাশি, পানযোগ্য জল নিশ্চিতে লবণাক্ত জলের ডি-স্যালাইনাইজেশন প্রকল্প হাতে নিতে পারে দুই দেশ। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন উভয় দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের এক হয়ে কাজ করা এখন সময়ের দাবি।
৩. আগামী ৫০ বছর হবে সত্যিকার ডিজিটাল যুগ। নতুন নতুন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আমাদেরকে পুরোপুরি কোথায় নিয়ে যাবে তা হয়তো কল্পনা করাও কঠিন। বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়েই ডিজিটাল বিপ্লবকে আলিঙ্গন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ প্রযুক্তি- যেমন ৫জি ও স্যালেটাইট প্রযুক্তির মতো বৃহত্তর প্রযুক্তি সহযোিগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। উভয় দেশের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়, আইটির প্রাণকেন্দ্র এবং উদ্ভাবকদের আরো সমন্বিত ও নেটওয়ার্ক ভিত্তিক বন্ধন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের জন্যও সহযোগিতা এবং একত্রে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারিতে আমাদের জীবন যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে, তখন রোগ নিরাপত্তা, মহামারি নিয়ে অধিক যৌথ গবেষণার সুযোগ রয়েছে এবং মেডিকেল পেশার ব্যক্তিদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। যৌথভাবে মূল্যায়ন যাচাই করা হলে পরবর্তী মহামারি রোধে কৌশলগত বিস্ময় বেরিয়ে আসতে পারে। টেলিমেডিসিন বিষয়ক বৃহত্তর গবেষণাও করা যেতে পারে, যা কোভিডকালীন অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে।
৪. উদীয়মান প্রজন্মকে অধিকহারে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। এই মুহূর্তে প্রয়োজন দুই দেশের তরুণদের মধ্যে বড় ধরনের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা। বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়া খবর এবং গভীর মিথ্যার এই যুগে একে অন্যের বিরুদ্ধে ভুল ধারণার শিকারে পরিণত হওয়া খুবই সহজ এই যুব সমাজের, বিশেষ করে একটি অংশের। যোগাযোগ বৃদ্ধি করার ফলে শুধু একে অন্যের সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলোই সরে যাবে এমন না। একই সঙ্গে খুলে যাবে গঠনমূলক বিতর্ক এবং আলোচনার সুযোগ। খুলে যাবে অনুধাবনের বৃহত্তর সুযোগ। সড়ক, সেতু এবং পানিপথের সংযুক্তি নিয়ে কথা বলে আমরা অনেক সময় ব্যয় করেছি। কিন্তু এটা হলো মানসিক সংযুক্তি, যা হবে চূড়ান্ত বিনিয়োগ।
বৈশ্বিক ইস্যু এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৃহত্তর রূপান্তর
অনেক সময় গত অর্ধ শতাব্দীর সফলতার গল্প বলা এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বিগ না হওয়া খুব সহজ। যেকেউ হয়তো যুক্তি দেখাবেন যে, সম্পর্ককে টেকসই এবং সফল করার জন্য আমাদের পার্থক্যগুলো চিহ্নিত করতে এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে এতো বেশি কথা বলা হয়েছে যে, এখন আমাদের শুধু মুক্তমন নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কথা বলতে হবে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক অসমতা, পানি বণ্টনের সমস্যা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এসব চ্যালেঞ্জের মূলে। মাঝে মাঝে উল্লেখযোগ্য অর্জনকে তাচ্ছিল্য করা হয়। তাই আন্তরিক প্রত্যাশা হলো, এসব সমস্যার একটি টেকসই সমাধান বের করতে উভয় সরকার একত্রে কাজ করবে এবং তীব্র সমালোচনা এবং নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীদের সুযোগ অস্বীকার করবে। এই শ্রেণিটি দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে তার ভিতর থেকে লাভ খোঁজে। আমরা শুধু তখনই সমৃদ্ধি অর্জন করবো, যদি আমরা চ্যালেঞ্জ, প্রতিবন্ধকতাকে মুক্তমনে গ্রহণ করি এবং স্বীকার করি যে, কোনো সম্পর্কই যথার্থ নয়।
এক দশকের ওপরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের (ট্র্যাক ২) প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন হিসেবে মাঝে মাঝে মনে করি, দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় আমরা খুব বেশি বিধিনিষেধের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছি। সীমান্তের ওপারে আমার অনেক সহকর্মীরও হয়তো একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। সাইবার সুশাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অভিন্ন নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের সমৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে আরো অর্থপূর্ণ আলোচনায় আমাদের যুক্ত হওয়ার সময় এসে গেছে। যেহেতু অর্থনৈতিক গতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ, তাই ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিনিয়োগ আনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার শক্তি আছে তার। অভিন্ন সমৃদ্ধিতে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে প্রয়োজন যৌথ গবেষণা এবং সহযোগিতা। স্মার্ট সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর সমন্বয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে এমন সব সমস্যার সমাধান করতে, যা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। আগামী ৫০ বছরে যদি আমরা এই যৌথ সহযোগিতার ফল পেতে চাই তাহলে ঢাকা এবং নয়া দিল্লির কৌশল এবং নীতি গ্রহণকারীদের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কৌশলকে ‘রিডাবল’ করতে হবে। এই সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত রাখতে পারেন এবং রাখবেন থিংক ট্যাংকরা। এভাবেই ‘ট্র্যাক-২’ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন অধিকতর অনুপ্রেরণা বাক্সবন্দি চিন্তাভাবনাকে সাহস জোগানো এবং সহজতর করা।
বাংলাদেশ নিছক একটি ভৌগোলিক সত্তা এমন নয়। এটি হলো রক্ত দিয়ে আত্মত্যাগ আর সম্পদহানির মাধ্যমে অর্জিত একটি আদর্শ। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাসকে মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ শক্তিশালী, প্রাণবন্ত এবং প্রফুল্ল জাতি হিসেবে উঠে দাঁড়িয়েছে। এর আছে দৃঢ় সামাজিক সূচক, অর্থনৈতিক পথচলা। এসব দেখে অনেকে বিস্মিত হন। বাংলাদেশ যখন আগামী ৫০ বছরের জন্য তার গতিপথ নির্ধারণ করছে এবং যাত্রাপথ ঠিক করছে, তখন বাংলাদেশ চায় ১৯৭১ সালে গড়ে উঠা ঐতিহাসিক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আরো পরিপক্ব, টেকসই এবং দৃঢ় বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে। ঠিক এখনই প্রয়োজন একটি নিপুণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে স্বীকার করে নেয়া হবে চ্যালেঞ্জগুলোকে। কখনো কখনো এটাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাকেও সম্মান করতে হবে। চূড়ান্তভাবে এতে জোর দেয়া হবে অভিন্ন প্রবৃদ্ধি আর সমৃদ্ধিতে। সহযোগিতার সুযোগ অসীম। আর আমরা আমাদের নিজস্ব কল্পনায় সীমিত। আগামী প্রজন্মের কাছে এটা আমাদের শুধু পৌঁছে দেয়ার মধ্যেই দায়িত্বের শেষ নয়। একই সঙ্গে এ দায় অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সার্ভিসম্যানের প্রতিও। যারা সেই উত্তাল ডিসেম্বরেও তাদের চূড়ান্ত আত্মদানের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তারা হয়তো এটা একটিমাত্র কারণেই করেছিলেন। সেটা হলো একটি স্বপ্নকে অনুধাবন করেছিলেন তারা। একটি আদর্শকে লালন করেছিলেন, যাকে আজ আমরা বাংলাদেশ বলি।
(শাফকাত মুনীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর রিসার্স ফেলো এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর টেরোরিজম রিসার্স-এর প্রধান। জ্যোতি এম. পাঠানিয়া দিল্লির সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজের উর্ধতন কর্মকর্তা)