মাস্ক ছাড়াই চলছে সবকিছু

নূরে আলম জিকু

এক্সক্লুসিভ ২৮ নভেম্বর ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:০০ পূর্বাহ্ন

শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকহারে বাড়বে- এমন শঙ্কা ছিল আগে থেকেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়েছে। দেশে শীতের তীব্রতা বাড়ছে।  পাশাপাশি গত এক সপ্তাহ ধরে করোনার সংক্রমণও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। সারা দেশের তুলনায় রাজধানী ঢাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অধিক। কিন্তু করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনেও মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ছে না। সরকার এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করলেও বেশিরভাগ মানুষের গাছাড়া ভাব। রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন, বিপণিবিতান ও বাজারগুলোতে মানা হচ্ছে না কোনো ধরনের নিয়ম-কানুন।
রোগ-বালাই থেকে নিজেকে রক্ষার প্রথম ধাপের প্রতিরোধক মাস্ক পরতেও অনীহা অনেকের। ব্যবসায়ীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও এ ব্যাপারে নেই কোনো পদক্ষেপ। মালিক ও কর্মচারীদের মুখে নেই মাস্ক, হাতে নেই গ্লাভস। বাজার ও গণপরিবহনে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না কেউ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগবালাই ও ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে মাস্ক ব্যবহারের বিকল্প নেই। এসব স্থানে লোক সমাগম সব সময় বেশি থাকে। সরকারের উচিত মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে আরো কঠোর হওয়া। শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে দণ্ড দিয়ে হলেও নো মাস্ক, নো সার্ভিস সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা দরকার। অন্যথায় এই শীতের সময়ে বড় বিপদ ডেকে আনবে গণপরিবহন, বিপণিবিতান ও হাটবাজারগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার নিত্যপণ্যের বাজারগুলোতে মাস্কের ব্যবহার একেবারে নেই বললেই চলে। এদের একটি কাওরান বাজার। রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম। দিন রাত ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে এটি। এখানকার ব্যবসায়ীরা পরেন না মাস্ক। মেনে চলেন না স্বাস্থ্যবিধি। আবার অনেকই বিশ্বাস করতে চান না করোনা নামক ভাইরাস। যদিও প্রথম দিকে এখানকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবু এখানে নেই কোনো জনসচেতনতামূলক পোস্টার। একেকজন আরেকজনের গায়ে লেগেই ব্যবসা করেন। করেন চলাফেরা। প্রতিদিন মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত তিল পরিমাণ স্থানও খালি থাকে না এখানে। সর্বত্রই লোকে লোকারণ্য। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন কেনাকাটা করতে। ক্রেতারা একজন অন্যজনের গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে পণ্য কেনেন। কয়েকজন ক্রেতা জানান, তারা মাস্ক পরে এলেও বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক থাকে না। মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই করেন বেচা-বিক্রি। এতে বিক্রেতাসহ ক্রেতারা করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। প্রতিদিন এখানে অসংখ্য ক্রেতা আসেন, তাতে কোনো ব্যবসায়ীর করোনা পজেটিভ হলে সবাই বিপদে পড়বেন। খুচরা পিয়াজ বিক্রেতা রফিজল হক জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা আসেন। তাদের সঙ্গে লেনদেন করি। কথা বলতে হয়। যার কারণে মাস্ক পরি না। খেটে খাওয়া মানুষের করোনা হয় না। আমাদের তো অনেক ব্যবসায়ী আছেন, তারা কেউ মাস্ক পরেন না। তাদের করোনাও হচ্ছে না। কয়েকজন সবজি বিক্রেতা জানান- ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করলে তারা মাস্ক পরেন। অন্য সময় পরা হয় না। মাস্ক পরে কাজ করতে নানা অসুবিধা হয়। রাজধানীর মৌচাক, গুলিস্তান, ফার্মগেট এলাকার বিপনিবিতানগুলো ঘুরে দেখা যায়, আগের চেয়ে জনসমাগম বেড়েছে। চলছে বেচা-বিক্রি। ক্রেতা-বিক্রেতাদের অনেকেরই মুখে নেই মাস্ক। একই পণ্য একাধিক ক্রেতার সংস্পর্শে যাচ্ছে। সরকারের বেঁধে দেয়া কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না কেউই। প্রায় মার্কেটের প্রবেশমুখে জনসচেতনতামূলক লিফলেট কিংবা ‘নো মাস্ক, নো এন্ট্রি’ থাকলেও ভিতরের চিত্র একেবারে ভিন্ন। মাস্ক ছাড়া অবাধে চলাচল করছে জনসাধারণ। অনেকে থুঁতনিতে ঝুলিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে যাচ্ছেন। সেজান মার্কেটে আসা ক্রেতা জেরিন আক্তার মানবজমিনকে বলেন, মাস্ক আছে। হিজাব পরেছি তাই মাস্ক পরতে ইচ্ছা করে না। মার্কেটে অনেকেই আছেন, তাদের কারো মুখেই মাস্ক নেই। কসমেটিকস বিক্রেতা আলী আকবর বলেন, ক্রেতা না থাকলে মাস্ক খুলে রাখি। বাকি সময় মাস্ক মুখে থাকে। এছাড়া ক্রেতারা মাস্ক মুখে নিয়ে মার্কেটে ঢুকলেও ভিতরে প্রবেশ করার পর খুলে রাখেন। আমরা বিব্রত হই। কারণ কিছু বললে ক্রেতারা চলে যান। এতে ব্যবসায় লোকসান দিতে হচ্ছে। মৌচাক মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন অর্ধ-লক্ষাধিক ক্রেতার সমাগম হয় এখানে। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক মানুষ মাস্ক পরে। বাকি মানুষের সঙ্গে মাস্ক থাকলেও, তা হাতে কিংবা ব্যাগে রাখেন। কেউ কেউ থুঁতনিতে রেখে দরকষাকষি করেন। এদের কারো মধ্যে করোনা পজেটিভও থাকতে পারে। ফলে ব্যবসায়ীরাও বিপদে রয়েছেন। অন্যদিকে মার্কেট কমিটি বলছে, মাস্ক ছাড়া কারো কাছে কোনো প্রকার পণ্য বিক্রি করা যাবে না। এদিকে রাজধানীর গণপরিবহনগুলোতে মাস্ক ব্যবহার শতভাগ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। স্বয়ং চালক ও হেলপারও মাস্ক ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছেন। কেবলমাত্র ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশ দেখলে তারা মাস্ক পরেন। গত বুধবার কয়েকটি স্থানে এমনি চিত্রের দেখা মেলে। এদিন রাজধানীর রমনা এলাকায় ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে চালানো হয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। জরিমান করা হয় বেশ কয়েকজন চালক ও হেলপারকে। এ সময় দেখা যায়, প্রায় বাসেরই চালক ও থুঁতনিতে ঝুলছে মাস্ক। কারো মাস্ক পকেটে। মাস্ক ছাড়া গণপরিবহনে যাত্রী উঠা-নামা করতে দেখা গেছে। বসছেন পাশাপাশি সিটেও। কেউবা সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করছেন। জানা যায়, প্রতিটি গণপরিবহনে দিনে হাজার হাজার যাত্রী উঠা-নামা করেন। এসব যাত্রী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা-যাওয়া করেন। মাস্ক ছাড়া গণপরিবহন ব্যবহার করায় বড়ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা। বিহঙ্গ পরিবহনের চালক শিমুল জানান, যাত্রী উঠানোর সময় আমরা মাস্ক পরা আছে কিনা দেখে নিই। বাসে উঠার পর অনেকে মাস্ক খুলে ফেলে। আমাদের কথা শুনতে চায় না। মাস্কের কথা বললে উল্টো নানাধরনের কথা বলেন। আমরা চাই না মাস্ক ছাড়া কেউ বাসে উঠুক। কারণ এটা পাবলিক বাস। নানা ধরনের মানুষ উঠেন। অসুস্থ যাত্রীও ওঠেন। কখন যে আমরা আক্রান্ত হই তার জন্যও চিন্তা লাগে।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা আলেয়া বেগমের সঙ্গে বিআরটিসি বাসে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, গ্রামে তো মাস্ক লাগে না। ঢাকায় আসার পর সবাই মাস্কের কথা বলছে। মুখে কাপড় তো আছে। মাস্ক দিয়ে কি করবো। মাস্ক ছাড়া যাত্রী উঠানো প্রসঙ্গে বাসের চালক শামীম আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাস থামালে অনেকই মাস্ক ছাড়া উঠে যায়। নামতে বললে নামেন না।
এদিকে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ঢাকা সিটি করপোরেশন গণপরিবহন ও জনসমাগম এলাকাগুলোতে ভ্রম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ঢাকা সিটি করপোরেশন বলছে, মানুষের মধ্যে এখনো সচেতনতার দেখা মিলছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মধ্যদিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, স্বাস্থ্য বিধি না মানলে ঝুঁকি বাড়বে। মাস্ক না পরলে বিপদ আসতে পারে। সবাইকে মাস্ক পরার বিষয়ে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি এনজিও এবং বিভিন্ন সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মাস্কের দাম যেন বৃদ্ধি না পায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০২০-১১-২৭ ১৮:২২:২৪

এর পরিণাম ভয়াবহ । তারাই এই পরিণামের শিকার হবে যারা মানবে না। তৎসঙ্গে আশপাশ অন্যকে ও বিপদে ফেলবে।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

পর্ব-৫৩

আমি জানি কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়

২৬ জানুয়ারি ২০২১

পর্ব-৫১

তারা এক নিষ্ঠুর গোলক ধাঁধায় আটকে থাকলো

২৪ জানুয়ারি ২০২১

ইসমোনাকের অভিনব উদ্ভাবন

‘ক’ বর্ণের শব্দের খোঁজে ২০ বছর

২৩ জানুয়ারি ২০২১



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status