চট্টগ্রামে পচা পিয়াজে ভর্তি খাল ডাস্টবিন!

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে

এক্সক্লুসিভ ২১ নভেম্বর ২০২০, শনিবার

সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে পিয়াজ। অধিক মুনাফার লোভে মজুত সেই পিয়াজ নষ্ট হচ্ছে পচে-গলে। এতে সাধারণ ক্রেতার চোখে যেমন জল আসছে, তেমনি রীতিমতো চোখের জল ফেলছে মজুতদার-ব্যবসায়ীরাও।

চোখের জল ফেলছে চসিকের পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও। কারণ নগরীর খাল ও ডাস্টবিনগুলো এখন পচা পিয়াজে ভর্তি। যেগুলো পরিষ্কার করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জানান, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ নগরীর এমন কোনো ডাস্টবিন নেই, যেখানে পচা পিয়াজের স্তূপ নেই।
সম্প্রতি নগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাক্তাই খালে পচা পিয়াজের ভাগাড় দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন।
তিনি বলেন, খাল-নালা পানি চলাচলের জন্য। পচা পিয়াজ ফেলার জন্য নয়। দাম বাড়তে দেখে পিয়াজ মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা। এদের সংঘবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। খাল-নালায় যারা পচা পিয়াজ ফেলে তাদের পাহারা দিয়ে ধরে গণধোলাই দিতে হবে।  

এদিকে পিয়াজের লোকসানে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক-ব্যবসায়ীদের হাহাকার চলছে। মূলধন হারানোর আশঙ্কায় অনেক আমদানিকারক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন স্টাটাস দিয়েছেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়ৎদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সমপাদক মো. মহিউদ্দিন।
তার স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে সরজমিন দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বড় পাইকারি মোকামে গিয়ে দেখা যায় হাহাকার। তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পিয়াজ আমদানি করায় বাজারে ধস নেমেছে। ৬০ টাকায় আমদানি করা পিয়াজ ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মান নষ্ট হয়ে যাওয়া পিয়াজ ১০-১৫ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। পচে যাওয়া পিয়াজ খালে ফেলে দিতে হয়েছে। অনেক আমদানিকারক ব্যাংক ঋণ ও লোকসান গুনে দেউলিয়া হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম প্লান্ট কোয়ারেন্টিন স্টেশনের উপ- পরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বুলবুল জানান, ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৭৬৩ টন পিয়াজ আমদানি হয়েছে। এছাড়া অনুমতি (আইপি) নেয়া হয়েছে আরো ২ লাখ ৬ হাজার ৭৮৮ টন।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত ২০শে অক্টোবর দেশি পিয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা দরে। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। মিয়ানমারের ভালোমানের পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৭০-৭৫ টাকা দরে। তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। নিম্ন ও মধ্যমানের পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা দরে। পাকিস্তানি পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৬৫-৭০ টাকা দরে। তা বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকা দরে। তুরস্কের পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৭০ টাকা। তা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। মিশরের পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৬৫ টাকায়। তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। ইরানি পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫০ টাকা দরে। তা বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায়। নিউজিল্যান্ডের পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫০ টাকায়। তা বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকায়। হল্যান্ডের পিয়াজ বিক্রি হয়েছিল মানভেদে ৫০-৬০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪২ টাকা দরে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাটের ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন বলেন, শুক্রবার খাতুনগঞ্জ থেকে ৩০ কেজি করে ১১০ বস্তা পিয়াজ কিনে খুলে দেখি অর্ধেক পিয়াজই পচা! এতে আমার পুঁজি হারানোর শঙ্কা রয়েছে।

পুঁজি হারানোর বিষয়কে ভাঁওতাবাজি- ক্রেতাদের সঙ্গে মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাব’র চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, তারা ৫০ পয়সা কমিশনে পিয়াজ বিক্রি করে আসছেন। বাজার উত্থান-পতন বা লাভ- লোকসানের সঙ্গে জড়িন নন তারা। এখন রাতারাতি কীভাবে তারা আমদানিকারক হয়ে গেলেন। লোকসান গুনে, পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। এটা পুরোটাই ভাঁওতাবাজি। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা ও মিথ্যাচার করছেন।

তিনি বলেন, পাইকারি মোকামে প্রতিটি আড়ৎ ও দোকানে পিয়াজে ঠাসা। বস্তায় বস্তায় পিয়াজ ট্রাক-ভ্যানে আনা-নেয়া চলছে। বেশির ভাগ পিয়াজের মানই নষ্ট হয়ে গেছে। বেশির ভাগ বস্তা ফুঁড়ে বীজ বের হয়ে গেছে। অনেক পিয়াজ পচে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আড়ৎ ও দোকানের সামনে এলোমেলো পড়ে রয়েছে পচা পিয়াজের বস্তা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর পিয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার পর বাংলাদেশে ভারত থেকে পিয়াজ আসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেশের বাজারে পিয়াজের দাম কেজিতে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত একাধিকবার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে অভিযান চালিয়ে পিয়াজ মজুতের প্রমাণ পান। যেগুলো পচে গলে নষ্ট হচ্ছে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Amir

২০২০-১১-২১ ১১:২৩:৪২

অধিক মুনাফার লোভে মজুত সেই পিয়াজ নষ্ট হচ্ছে পচে-গলে। ---------রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় পণ্য আমদানি করে রাষ্ট্রের জনগণকে ভোগ করতে না দিয়ে ধ্বংস করে ফেলা- এটা কি রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়? রাষ্ট্রদ্রোহীতার সংগা হালনাগাদ করার এখনই উপযুক্ত সময়!

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডে বাবা-মেয়ের মৃত্যু, শঙ্কায় মা

২৩ নভেম্বর ২০২০

নারায়ণগঞ্জে ঘরের ভেতর জমে থাকা গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়েছেন। এরমধ্যে হাসপাতালে ...

নয় দফা দাবি সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ কর্মকর্তাদের

২২ নভেম্বর ২০২০

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ নানা বৈষম্য দীর্ঘদিনের। এসব বৈষম্য নিরসনে বারবার দাবি জানানো হলেও ...



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status