মতামত

আঞ্চলিক ভূরাজনীতি: যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

ডা: রফিকুর রহমান

মত-মতান্তর ২৮ অক্টোবর ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৭:২৯

যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। ভারত সফর শেষে তিনি বাংলাদেশে আসেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আব্দুল মোমেন এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং উভয়েই সাক্ষাৎ পরবর্তী এক সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী  বিগান  সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লেখ করেন,  ইন্দো-প্যাসিফিক সেন্টারের  কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের অবস্থান।  তিনি আরো বলেন  যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে প্রধান অংশ হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে এক পর্যায়ে বলেন  যে, ওয়াশিংটন এখন আর ঢাকাকে দিল্লির চোখে দেখে না। তিনি  বলেছেন,  যদি তাই হতো তাহলে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিগান দিল্লি থেকে ঢাকা আসতেন না, ওয়াশিংটন চলে যেতেন। 

সাউথ এশিয়ান মনিটরকে  উল্লেখ করে একটি পএিকা বলেছে যে, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিগান দিল্লি সফরকালে বলেছেন, এই অঞ্চলে ভারতের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ওয়াশিংটন তার আগ্রহের কথা স্পষ্ট করেছে। তার ওই বক্তব্য এবং ঢাকায় দেয়া বক্তব্য  সম্পূর্ণরূপে পরস্পর বিরোধী । কারণ দিল্লির স্বার্থকে একতরফাভাবে এগিয়ে নিতে চাইলে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হবে বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে সংঘাতপূর্ণ।

তার অর্থ হলো ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে এখনো দিল্লির চোখে দেখে। এটা আরো স্পষ্ট হয়েছে যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং  প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার বর্তমানে দিল্লি সফর করছেন। এরপর তারা শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপ সফর করবেন। এই সফরসূচিতে বাংলাদেশের নাম নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এর ব্যাখ্যা থেকে বলা যায় যে, ওয়াশিংটন তার আগের অবস্থান থেকে এখনো পিছপা হয়নি অর্থাৎ 'ওয়াশিংটন এখনো ঢাকাকে দিল্লির চোখেই দেখে'।

যাইহোক, বিগান  ঢাকা আসলেন, কথা বললেন, নিভৃতে চলে গেলেন। ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে সরকারের সাথে যে কথা হয়েছে সেটা শুধু বিগান বলে গেলেন, কিন্তু আমাদের কেউই স্বীকার করলেন না যে, এ বিষয়ে সরকারের সাথে তাঁর কথা হয়েছে। 

ঢাকার অবস্থান অবশ্য পূর্ব থেকেই স্পষ্ট ছিল। বিগান আসার আগে পরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন  'ওনারা চায় অস্ত্র বিক্রি করতে আর আমরা তো চাই শান্তি”। এতেই প্রতীয়মান হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিক ইস্যুতে আর যাই হোক ঢাকা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবে। আর এটা স্পষ্ট যে, নিরপেক্ষ ভূমিকা কখনো কখনো কারো পক্ষে পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে কাজ করে। 

যুক্তরাষ্ট্র চায় ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশেষ করে সাউথ চায়না সিতে চীনের আধিপত্যকে খর্ব করা এবং চীন বিরোধী জোটে বাংলাদেশকে যুক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল হবে স্বাধীন অবাধ এবং নিরাপদ। যে অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং নিরাপদ অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত মাথাব্যথা ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বহিরাগত। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের অবস্থান এই  অঞ্চল থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। শুধুমাত্র একটি দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জোট করার পেছনে যে অগ্রণী ভূমিকা তা সন্দেহের চোখে দেখার অবশ্যই অবকাশ থাকে। এই মুহূর্তে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাপট কোনভাবে খাটো করে দেখার উপায় নেই। কয়েকদিন আগেই দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া যৌথ নৌমহড়া সম্পন্ন করেছে।  এ বছরে এটা ছিল এই গ্রুপের পঞ্চম নৌমহড়া। এ বিবেচনায় ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য চীনের থেকে অনেক বেশি।

বর্তমানে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্য যুদ্ধ তা কোনোভাবে প্রশমিত হবার নয়। যুক্তরাষ্ট্র সেই অর্থনৈতিক বাণিজ্যের যুদ্ধকে একটি সামরিক সংঘাতে পরিণত করার জন্য সুকৌশলে ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলকে ব্যবহার করছে এবং ভারতকে দাঁড় করাচ্ছে চীনের বিরুদ্ধে। আমরা যদি একটু পেছন ফিরে ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে  বর্তমান চায়নার ভূমিষ্ঠ হবার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জাপান এবং ফিলিপাইনের সাথে এক ধরনের নিরাপত্তা চুক্তির নামে সেখানে আমেরিকার অনেকগুলো সামরিক ঘাঁটি রয়েছে যেগুলো চীনের মূল ভূখণ্ডের জন্যই হুমকি স্বরূপ। ফিলিপাইন এবং জাপানের জনগণের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো নিয়ে অনেক অস্বস্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা এই সামরিক ঘাঁটি গুলোর অবস্থানই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক দেশের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ। সম্প্রতি রাশিয়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটি মিসাইল নিক্ষেপ ঘাটি স্থাপনের পরিকল্পনার ঘটনায় কড়া  হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে। রাশিয়া আরো বলেছে, যদি মার্কিন মিসাইলের আওতায় রাশিয়ার ভূখণ্ড পড়ে তাহলে এর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, চীনের আধিপত্য খর্ব করার নামে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তার আধিপত্যকে আরো বৃদ্ধি করার জন্যই উঠে পড়ে লেগেছে।

 নিরাপত্তার নামে এই অঞ্চলে চীনকে প্রতিরোধ করার আরেকটা প্রক্রিয়া হচ্ছে Quadrilateral Security Dialogue সংক্ষেপে কোয়াড বা কোয়াড ম্যাকানিজম। ২০০৭ সালে তৎকালীন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র,অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর জন হাওয়ার্ড এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর  সমর্থনে এর জন্ম হলেও পরবর্তী সময়ে এর কার্যকারিতা বেশিদূর এগোতে পারেনি। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকার পরিবর্তন অথবা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণেও কোয়াডের  কার্যকারিতা সময় সময় স্তব্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালে কেভিন রাড অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর চীনবিরোধী এই ম্যাকানিজম থেকে অস্ট্রেলিয়া বের হয়ে যায়। জাপানে ফুকুদা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কোয়াডের কার্যকারিতায় ভাটা পড়ে।  ভারত প্রথম দিকে হালকা ভাবে যুক্ত হলেও  ভারত চায়নি প্রতিবেশী দেশ চীনের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে।  ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চায়না সফরকালে মন্তব্য করেন যে, চীন-ভারত সর্ম্পকই হচ্ছে অগ্রগণ্য। এরপর কোয়াড আর কার্যকর থাকে নি।

 

চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের রেশ ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অকার্যকর ম্যাকানিজমকে গত তিন বছর থেকে একটা কার্যকরী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার  চেষ্টা করছে।  ২০১৭ সালে এই মৃতপ্রায় কোয়াড  ম্যাকানিজমকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আবার পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় শুধুমাত্র এই অঞ্চলে চীনকে প্রতিরোধ করার জন্য।

ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের সুপ্ত বাসনা ভারতের দীর্ঘদিনের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চীন বিরোধী জোটে ভারতের অবস্থান ভারতকে সে সুযোগ এনে দেবে। চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ সেই সুদূর অতীত থেকে। অথচ সাম্প্রতিককালের ভারত এবং চীনের সীমান্ত সংঘাতের ইস্যুটাকে সামনে এনে ভারত এই কোয়াড প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে পড়ে এবং এই ম্যাকানিজমের সাথে সুস্পষ্ট অংশগ্রহণকে সে প্রায় নিশ্চিত করেছে। এর অংশ হিসেবে এ বছরের শেষ দিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার যৌথ নেভাল এক্সারসাইজের পরিকল্পনা রয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে সেটাই হবে কোয়াড সৃষ্টির পর অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রথম পরিপূর্ণ নেভাল এক্সারসাইজ।

 

ভারতীয় রাজনীতিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপির ক্ষমতা দখলের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়  এবং সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকে ভারত সরে আসে। বিজেপি বুঝতে পারে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে টিকিয়ে রাখতে হলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বিষোদগার করতে হবে এবং বাংলাদেশও এর  থেকে বাদ যায়নি। বিগত নির্বাচনে বিজেপি জয়ের জন্য বাংলাদেশি কার্ড ব্যবহার করেছে। সাম্প্রতিককালে ভারত এবং চীনের সীমান্ত দ্বন্দ্বের কিভাবে শুরু এর ব্যাখ্যায় না গেলেও এটা প্রতীয়মান যে,  সীমান্ত দ্বন্দ্বের সুযোগ বিজেপি সরকার নিয়েছে। সমগ্র ভারতে চীনবিরোধী উগ্র  জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থানের জন্য একটা জনমত সৃষ্ট করেছে।

অথচ ২০১৮ সালের জুনে সিঙ্গাপুরের বার্ষিক শ্যাংগ্রি-লা সংলাপে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি মূল বক্তব্যে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, 'ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে সীমিত কিছু দেশের কৌশল বা ক্লাব হিসেবে মনে করে না'। তিনি দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক বিস্তৃতি এবং ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের  উল্লেখ করা থেকে বিরত ছিলেন। মোদির এই মন্তব্য মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিসের বক্তব্যের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল। তিনি চীনা পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। মোদি তখন দু' মাস পূর্বে প্রেসিডেন্ট শি‘র সাথে সাক্ষাতের পর একটা ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন।

 

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে উহানে রাষ্ট্রপতি শি'র সাথে দু'দিনের অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনে  প্রধানমন্ত্রী মোদি আহ্বান করেছিলেন যে আমাদের দুই দেশ ( ভারত ও চীন) এর মধ্যে মজবুত এবং স্থিতিশীল সম্পর্ক বিশ্ব শান্তি এবং অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আরও বলেছিলেন যে, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যখন ভারত এবং চীন একে অপরের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল এবং আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে একত্রে কাজ করবে তখন এশিয়া ও বিশ্বের আরও উন্নত ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। যাহোক, ভারত তার অবস্থান থেকে দূরে সরে এসেছে।

 

আগামী ৩রা নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কোয়াড ম্যাকানিজম এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির ভবিষ্যৎ । প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হলে চীন বিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পক্ষান্তরে বাইডেন নির্বাচিত হলে রাশিয়া বিরোধী কার্যক্রম শুরু হবে। ।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনঃনির্বাচনের জন্য চীনা কার্ড তার দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভালোভাবেই ব্যবহার করছেন। নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চলে দৌড় ঝাঁপ এবং চীন বিরোধী জোট গঠনের প্রক্রিয়া আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর পক্ষে তার দেশে জনমত সৃষ্টির জন্য নির্বাচনের ক্যাম্পিং এর একটি অংশ । পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ ভালো করেই জানেন নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী না হলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের চীন বিরোধী  প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে যাবার আশঙ্কা অনেক বেশি। উল্লেখ্য অতি সম্প্রতি সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ নামের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে  বাইডেন রাশিয়ার নাম নিয়ে বলেন দেশটি ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকির। আর ক্ষমতাধর চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন।

উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার ছবক দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্বব্যবস্থা হচ্ছে একধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম। বিগত ৭৫ বছর এই বিশ্বব্যবস্থার নামে আমরা দেখেছি অব্যাহত যুদ্ধ, খবরদারি , আধিপত্যবাদী, অপছন্দের সরকার পরিবর্তন এবং গুপ্তহত্যা। পৃথিবীর অনেক নির্বাচিত ও অনির্বাচিত রাষ্ট্র নায়কের  প্রাণ দিতে হয়েছে এই বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থায়। আমেরিকার নেতৃত্বে ওয়েস্টার্ন ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক কমিউনিটির ধুয়া তুলে জরুরী বিবেচনায় অপরাধগুলো সংঘটিত করেছে দশকের পর দশক ধরে।

 

বিগত কয়ক দশকে চীন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের  শিখরে উঠে এসেছে । ১৯৯৬ সালে চায়নার ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ  ছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৪  সালে এসে দাঁড়িয়েছিল  ৪ ট্রিলিয়ন ডলার যা যেকোন দেশের অনুরূপ রিজার্ভের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি। বেল্ট রোড ইনিসিয়েটিভ প্রজেক্টর মাধ্যমে  এসব  অঞ্চলের উন্নয়েনের জন্য চীন বিলিয়ন ডলার  ইনভেস্টমেন্ট করেছে। 

সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে চীন এখন আগের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী ।

আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল অর্থনৈতিক এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব। 

অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব পাশ্চাত্য  থেকে প্রাচ্যে  স্থানান্তরিত হওয়ায়  বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ভারসাম্যহীন হয়ে সংকুচিত হয়ে গেছে। পাশ্চাত্যের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এখন আর  অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। জলে স্থলে আকাশে এবং সাইবারস্পেসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমেরিকা  নিজেকে  গুটিয়ে নিচ্ছে বিশ্বব্যবস্থার অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে। সময়ের ব্যবধানে  যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব এখন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভরা যৌবনে ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। পরবর্তীতে সে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয়ে ঢুকে মুক্তিকামী দেশগুলোর পাশে  দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পড়ন্ত বিকেলে বর্তমানের ভেঙ্গে পড়া বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কতটুকু দিতে পারবে সেটা দেখার বিষয়।

এখন প্রয়োজন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট শি‘র সাথে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদির যে আহ্বান ছিল তার বাস্তবায়নে ন্যূনতম একটা উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ দুইটি দেশের একত্রিত শক্তিই  এশিয়া এবং পৃথিবীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আর সে লক্ষ্যে ভারত এবং চীনকে এখন একসাথে কাজ করার উপায় বের করা আশু কর্তব্য। নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক শক্তি এখন প্রাচ্যে। প্রাচ্য ভিত্তিক দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে এখন নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিতে হবে।

 

লেখক: ডা: রফিকুর রহমান

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Dr Shafiq Rahman

২০২০-১০-৩১ ০২:৩৬:৩২

Informative & Analytical article during this important time.Many thanks Dr Rafiqur Rahman

ডাঃ আল মামুন রিপন

২০২০-১০-৩০ ০০:৩৮:৪২

সুন্দর, সময়োপযোগী ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার জন্য লেখক কে ধন্যবাদ। ভারতকে পশ্চিমাদের ফাদ থেকে বের হওয়া উচিত। চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কে খর্ব করার চেষ্টায় লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা মিত্র। বাংলাদেশের অবস্থা ক্রিটিকালই বলা যায়, তবে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থান কিন্তু ভারতের পরাজয়ই বলা চলে।

ডাক্তার সফিকুল ইসলাম

২০২০-১০-২৯ ০৩:৪৭:৩১

সুচিন্তিত এবং সময় উপযোগী সত্য ভাষণ। ধন্যবাদ আপনাকে ডাক্তার রফিকুর রহমান।

kamal

২০২০-১০-২৯ ১১:১৪:০১

আমেরিকা ভারতকে ব্যবহার করছে চীনের বিরুদ্ধে। চীন দুরবল হলে আমেরিকার লাভ আর চীন দুরবল হলেও ভারতের নিচে যাবেনা উপর্ই থাকবে।

Shobuj Chowdhury

২০২০-১০-২৯ ০৬:৫৫:৫৯

India China work together, wish you good luck.

আবুল কাশেম ই

২০২০-১০-২৮ ০৮:৩২:৪৬

সুন্দর তথ্য সম্রিদ্ধ লেখা। অনেক কিছুই অজানা ছিল। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

অধরা সুখ

২ ডিসেম্বর ২০২০

বাংলাদেশে টিকা আসবে কবে?

১ ডিসেম্বর ২০২০

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status