ইতিহাস কি শুধু দিস্তা দিস্তা কাগজ?

শামীমুল হক

মত-মতান্তর ২৫ অক্টোবর ২০২০, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৪৬

রাতের পরে দিন আসে/ দুখের পরে সুখ/ হাসির পর কান্না আসে/ কান্নার পর হাসি। আসলে জীবন মানেই হাসি কান্না। জীবন মানেই সুখ দুখ। পৃথিবী সৃষ্টির পর এ রীতিতেই চলছে সব। আর এ কারণেই দেখা যায় প্রবল প্রতাপশালী পরিবারের প্রভাবও এক সময় থমকে দাঁড়ায়। জমিদার পরিবারও একদিন হয়ে পড়ে নিঃস্ব। এক প্রজন্ম কিংবা দুই প্রজন্ম কোনরকমে প্রভাব ধরে রাখতে পারে। এরপর অর্থবিত্ত আর বৈভবের প্রভাবের সঙ্গে শক্তির প্রভাবও কমে যায়।
একদিন দেখা যায়, যে ব্যক্তির কথায় গোটা গ্রাম চলতো, যার কথায় গ্রামের পশুপাখি পর্যন্ত নড়তো, সেই ব্যক্তি হয়ে পড়েন অসহায়। সম্পদ নেই, তার প্রভাবও নেই। আসলে পৃথিবীতে সম্পদ রয়েছে একই পরিমাণ। এমন তো নয়, পৃথিবীর আকার বছরে বছরে বাড়ছে। আর নতুন নতুন জায়গায় নতুন অধিপতিরা দায়িত্ব নিচ্ছে। তা নয় বলেই একই সম্পদ হাত বদল হচ্ছে। একেক জায়গা একেক সময় একেক জনের হচ্ছে। তারা ওই জমি কিংবা অর্থের কিছুটা সময়ের জন্য মালিক হন।

গ্রামে গ্রামে একটি প্রবাদ বয়স্কদের মুখে মুখে শোনা যায়- অঘাট ঘাট হবে। অমানুষ মানুষ হবে। মানুষ অমানুষ হবে। অপথ পথ হবে। মুরব্বিদের মুখের এসব শোনা কথা বাস্তবে মিলে যাচ্ছে। বিশ ত্রিশ বছর আগে যারা সমাজে নেতৃত্ব দিতেন, তারা আজ কাবু। আর ওইসব নেতাদের যারা তোষামদি করতেন তারা আজ সমাজের অধিপতি। অর্থবিত্তের মালিক। না, তারা কারও দয়ায় অর্থবিত্তের মালিক হননি। তারা তাদের শ্রম আর মেধা দিয়ে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু মূল নেতারা নিজেদের নিয়ে অহঙ্কার করতেন। নিজেদের রাজা ভাবতেন। এ ভাবনা নিয়েই তারা এগিয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এটা ধরে রাখতে পারেননি। এখন যারা অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছেন তাদের মাঝেও অহঙ্কার বোধ চলে আসছে। তাই হয়তো মুরব্বিরা বলে গেছেন, অহঙ্কার পতনের কারণ।

পাঠ্যপুস্তকে এ কথা মুখস্থ করেও অহঙ্কার থেকে নিজেকে কয়জন পারে সরাতে? প্রবাদ প্রবচনে তো এ কথা সবার মুখে মুখে। তারপরও অহঙ্কারই যেন কারও কারও অলঙ্কার। যারা অহঙ্কারকে দূরে ঠেলে এগিয়ে যেতে পেরেছেন তারা তাদের মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছেন। তবে এর সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। কথা হলো-মানুষ সবই বোঝে, জানে। তারপরও কেন যে একই ভুল করেন তা ভেবে পাই না। কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়। কিন্তু এ কথা কÕজন মানে। মানে না বলেই বার বার ভুলপথে ধাবিত হচ্ছে সবাই।

মূল কথা, ক্ষমতা ধরে রাখার সক্ষমতা কয়জনের আছে? গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ীতে গিয়ে অনেক কাহিনী শোনা যায়। রাজা যেখানে বসে বিচার করতেন সে জায়গায় গিয়ে যে কেউ অবাক হবেন। সে সময়ই কত সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল রাজদরবার। আজ রাজা নেই। রাজার বংশধরও কেউ নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন রাজবাড়ী দেখা যায়। যেসব কালের সাক্ষি হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। রাজা নেই, রাজপুত্তুর নেই, বংশধরও নেই। যেন এক বিরান ভূমি এসব রাজবাড়ী। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল না বানালে কÕজন মনে রাখতো তার কথা। পাঠ্যপুস্তকে মুঘল আমল, নবাবি আমলের কথা সামান্যই লেখা আছে। সেসব লেখা পড়েও মানুষ নিজেকে নিয়ে ভাবেন না। হাজার মাইল দূর থেকে এসে ইংরেজ বৃটিশরা বাংলা বিহার ওড়িশার অধিপতি বলে নিজেকে গর্বিত মনে করতেন যে নবাব সেই নবাব সিরাজ-উদ দৌলাকে পরাস্ত করেন। হত্যা করেন। এ করুণ ইতিহাস নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। মঞ্চ নাটক হয়েছে। হয়েছে উপন্যাসও। মানুষ গোগ্রাসে এসব উপন্যাস গিলেছে, মঞ্চ নাটক দেখে মীরজাফরকে জুতা পর্যন্ত মেরেছে। তারপরও যুগে যুগে মীরজাফররা সমাজে টিকে আছে। তারা তাদের কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। কিন্তু নবাবরা তা বোঝেন না। বুঝতে চেষ্টাও করেন না। এ কারণেই নবাবদের পরিণতি হয় ভয়াবহ। যা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেয়। ইতিহাস থেকে মানুষকে শিক্ষা নেয়ার জন্যই তৈরি হয় ইতিহাস। কিন্তু মানুষ কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়? না। এ ইতিহাস শুধু কয়েক দিস্তা কাগজেই থাকে বন্দি। মনীষীরা বলে গেছেন, ইতিহাসের ভয়াবহ দিক হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Looking for you.

২০২০-১১-০৭ ১৪:৪২:৩৭

শিক্ষার জন্য ভালো এবং সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করাটাই প্রথম পদ্ধতি।

Shahid

২০২০-১০-২৭ ০৭:৫৮:৩৩

লক্ষ লক্ষ বেকার তৈরির কারখানা ইতিহাসবিদরা।

মাহবুবুর রহমান শিশির

২০২০-১০-২৬ ০০:৫৯:১১

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষাই হলো- ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আর অনেক ক্ষেত্রেই বংশের ৩য় পুরুষ ১ম পুরুষের সম্পদ আর ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে না।

আবুল কাসেম

২০২০-১০-২৫ ০২:১৯:২২

কোথায় আজ মোগল সাম্রাজ্য ! কোথায় সেন বংশ ! কোথায় ঈসা খাঁ ! কোথায় নমরূদ, ফেরাউন , হামান , কারুন , শাদ্দাদ ! আজ সবই ইতিহাস। সবই কাহিনি। সবই অতীত। সদা সর্বদা অতীতের গর্ভে বিলীন হচ্ছে বর্তমান। কতো ধ্বংস প্রাপ্ত জনপদের সাক্ষ্য বহন করছে এই নশ্বর জগত, তা আমাদের-ই চোখের সামনে রয়েছে। অথচ এর পরেও আমরা পৃথিবীর মাটি আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই। দম্ভ , অহংকারে মত্ত হয়ে বেপরোয়া ক্ষমতার লড়াইয়ের নেশায় উন্মত্ত ধরনী। কতো শক্তিধর মানুষের দর্পচূর্ণ করে আল্লাহ তায়ালা ধ্বংস করে দিয়েছেন। তার ইতিহাস কুরআনুল কারিমে রয়েছে। বলে রাখা ভালো, কুরআন কোনো ইতিহাস গ্রন্থ নয়। কিন্তু ইতিহাসের আলোচনা এখানে রয়েছে মানুষকে নসিহত করার জন্য এবং অতীত ঘটনাবলি ও ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহন করার জন্য। কুরআন মজিদ একটি উপদেশ সমৃদ্ধ গ্রন্থ। মানুষ এর বিষয়বস্তু। মানুষের ভালো-মন্দ, কল্যান-অকল্যান, উত্থান-পতন, লাভ-ক্ষতির বিস্তারিত আলোচনার ভান্ডার আল কুরআন। তাই অতীতের মানুষ অহংকারে মত্ত হয়ে বেপরোয়া জীবন যাপন করে কিভাবে ধ্বংসের অতলান্তে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং তার থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ কিভাবে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে তা-ই কুরআনে ইতিহাসের আলোচনা এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "এমন কতো জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদের উপর আমার আজাব যখন আসতো তখন তারা রাতের বেলায় ঘুমিয়ে থাকতো কিংবা মধ্য দিনের বেলায় আহারের পর বিশ্রামে থাকতো।" সূরা আল আ'রাফ। আয়াত-৪। কুরআনে আলোচিত অতীত জাতির কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। নূহ আ. কে যখন তাঁর জাতির লোকেরা অমান্য করলো তাদের পরিনতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, "অতপর তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, আমি তাকে এবং তার সাথে যারা নৌকায় আরোহন করেছিলো তাদের সবাইকে উদ্ধার করেছি। আর যারা আমার আজাবকে মিথ্যা বলেছে তাদেরকে আমি পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছি। এরা ছিলো আসলেই গোঁড়া ও অন্ধ।" সূরা আল আ'রাফঃ৬৪। এরপর আ'দ জাতির লোকেরা হুদ আ. কে যখন অমান্য করলো তখন তাদেরকেও আজাব দিয়ে নির্মুল করা হয়। "অতপর যখন আজাব এসে গেছে আমি তাকে ও তার সাথের ঈমানদার লোকদেরকে আমার রহমত দিয়ে বাঁচিয়ে দিলাম। আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে আমি তাদের নির্মুল করে দিলাম। কেননা এরা ঈমানদার ছিলো না।" সূরা আল আ'রাফ-৭২। এরপর সামুদ জাতির লোকেরা সালেহ আ. কে অমান্য করলে তাদেরকেও ধ্বংস করা হয়। "অতপর এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প তাদের গ্রাস করে ফেললো। ফলে তারা নিজেদের ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকলো।" সূরা আল আ'রাফ-৭৮। লুত আ. এর জাতির লোকেরা যখন বিকৃত যৌনাচার পুরুষ সমকামীতায় আসক্ত হয়ে পড়লো তখন তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে বলেন। কিন্তু তারা তাঁকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে এবং আল্লাহর পথে চলতে অস্বীকার করে। এরপর আসমানী আজাবের ফায়সালা হয়ে যায়। "আমি তাদের উপর প্রচন্ড আজাবের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। অতপর তুমি ভালো করে চেয়ে দেখো অপরাধী লোকদের পরিণাম কী ভয়াবহ হয়েছিলো।" সূরা আল আ'রাফ-৮৪। শোয়েব আ. কে অমান্য করার কারণে মাদইয়ানবাসীকেও আজাব দিয়ে নির্মুল করা হয়। "নবীর কথা অমান্য করার কারণে একটা প্রচন্ড রকমের ভূমিকম্প এসে তাদেরকে এমনভাবে আঘাত করলো, অতপর দেখতে দেখতে তারা সবাই তাদের নিজ নিজ ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকলো। যারা শোয়েবকে অমাণ্য করলো তারা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে গেলো দেখে মনে হচ্ছে সেখানে কোনো দিন কেউ বসবাসই করেনি। বস্তুত তারাই সেদিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা শোয়েবকে অস্বীকার করেছে। সূরা আল আ'রাফ-৯১-৯২। আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থাকে অস্বীকার করার ভয়াবহ পরিনতি সম্পর্কে এভাবে লিখতে লিখতে কলম ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাবে, কালি ফুরিয়ে যাবে এবং আয়ুষ্কালও শেষ হয়ে যাবে তবুও লেখা শেষ হবে না। তাই ইতিহাসের আলোচনা আর বাড়ানো দরকার নেই বলেই মনে হয়। যেটুকু লেখা হয়েছে সমঝদার লোকের জন্য তাতেই যথেষ্ট।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ

১৫ নভেম্বর ২০২০

বাসে সিরিজ আগুন

উদ্বেগের বৃহস্পতিবার, জনমনে নানা প্রশ্ন

১৩ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status