করোনার মধ্যেও রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যাচ্ছেন অভিবাসীরা

মানবজমিন ডেস্ক

বিশ্বজমিন ২৪ অক্টোবর ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২৩

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে অভিবাসী রয়েছেন ২৭ কোটি। তারা নিজ দেশে যে নগদ অর্থ পাঠিয়ে থাকেন, তা রেমিট্যান্স নামে পরিচিত। করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে পর্যুদস্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি। ব্যাংক ও দাতা সংস্থাগুলো বিশ্বজুড়ে অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ধস নামার আশঙ্কার কথা জানাচ্ছে। দেশে দেশে চাকরি হারাচ্ছেন ও হারানোর আশঙ্কায় আছেন অসংখ্য অভিবাসী। কিন্তু তা সত্ত্বেও মহামারির মধ্যে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্সের প্রবাহ নিম্নমুখী হয়নি। শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রাহক দেশগুলোর সর্বশেষ উপাত্ত অনুসারে, কিছু ক্ষেত্রে উল্টো তা আরো বেড়ে গেছে।

উদাহরণস্বরূপ, মেক্সিকোয় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে ৯.৪ শতাংশ। পাকিস্তানেও রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোয় রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে করোনা মহামারির মধ্যে রেমিট্যান্স হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৮.২ বিলিয়ন ডলার ।  যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৬ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স রেকর্ড হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯ শতাংশ বেশি।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধির কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক আবার কিছু উদ্বেগজনক।

রেমিট্যান্সের গুরুত্ব
সাধারণত বিশ্বের ধনী দেশগুলো থেকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় রেমিট্যান্স প্রবাহিত হয়। গত বছর বিশ্বজুড়ে অভিবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন—৫৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিনিয়োগের চেয়েও এ অর্থের পরিমাণ বেশি।
রেমিট্যান্স বেশি নির্ভরযোগ্যও। সাধারণত, অর্থনৈতিক মন্দায় বিদেশি বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক সহায়তা কমলেও রেমিট্যান্স বাড়ে। দেশের দরিদ্রতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতেও রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোয় রেমিট্যান্স দরিদ্রতা হ্রাসে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে। কিছু দেশের ক্ষেত্রে, তাদের জিডিপির একটি বড় অংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে। কিছু দেশের জন্য তা জিডিপির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আর এসব কারণেই, রেমিট্যান্সের প্রবাহ নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা বেশ উদ্বেগের বিষয়। গত এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় রেমিট্যান্সের প্রবাহ ২০ শতাংশ কমতে পারে। তেমনটা হলে ১০ হাজার কোটি ডলার আয় হারিয়ে যেতো।

উর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্স
অনেক দেশের জন্য রেমিট্যান্সের ওপর প্রাথমিক আঘাত এসেছিল গত বসন্তে। কিন্তু গ্রীষ্মে তা বেড়ে যায়। আবার কিছু দেশে মহামারির মধ্যেও উর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্স প্রবাহ দেখা গেছে।
গত বছর মেক্সিকোর রেমিট্যান্স ছিল ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। চলতি বছর মার্চে এক মাসের জন্য দেশটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পেয়েছে। গ্রীষ্মজুড়ে সে রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। মিসর এখন অবধি গত বছরের তুলনায় এ বছর ৮ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স প্রবাহ দেখছে।
ফিলিফাইনের রেমিট্যান্স দেশটির জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমান। গত বসন্তে তাদের অর্থ প্রবাহ কমলেও বছরের শেষের দিকে এসে সে ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে গেছে। বাংলাদেশ, এল সালভাদর, ভিয়েতনাম ও হন্ডুরাসের একইরকম ধারা দেখা গেছে।

সম্ভাব্য কারণ
উপাত্তের অভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ দর্শিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বজুড়ে চরম আর্থিক মন্দা সত্ত্বেও অনেক অভিবাসী অর্থ আয় অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। একটি বিষয় হচ্ছে, অভিবাসীরা সাধারণত কৃষি ও নির্মাণের ‘এসেনশিয়াল’ বা প্রয়োজনীয় বিবেচিত কাজে নিযুক্ত থাকেন। মহামারির মধ্যেও এ ধরণের কাজ খুব একটা বিঘ্নিত হয়নি। ইউরোপে কিছু এসেনশিয়াল খাতের মোট কর্মচারীদের এক-তৃতীয়াংশই অভিবাসী।

এদিকে, ইতালি ও পর্তুগালের মতো কিছু দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসীদের ঘিরে আইনে সংস্কার আনা হয়েছে, যেগুলোর আওতায় অনিবন্ধিত শ্রমিকরাও পরিষেবা পাচ্ছে ও কিছু ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগও দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানি ধীরে ধীরে অভিবাসীদের জন্য পূর্বে বন্ধ থাকা অর্থনীতির কিছু খাত, এখন খুলে দিতে শুরু করেছে। এসবকিছুই অভিবাসীদের জন্য অর্থ আয় ও নিজদেশে নগদ অর্থ পাঠানো অব্যাহত রাখা সহজ করে দিয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, অভিবাসীরা তাদের নিজদেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে অর্থ বেশি পাঠান। এল সালভাদরের এক অভিবাসী কর্মী জিযাস পেরলেরা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, নিজে কষ্টের মধ্যে থাকলেও মায়ের কাছে টাকা পাঠানো বন্ধ করেননি তিনি। পেরলেলা বলেন, আমি টাকা না পাঠালে মা খাবে কিভাবে?

রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অপর একটি কারণ হচ্ছে, সরকারি সহায়তা প্যাকেজ। মহামারির মধ্যে অনেক অনিবন্ধিত অভিবাসীই তাদের বাসরত দেশে সরকারি সেবা পাচ্ছেন না। তবে কিছু দেশে তাদের ওই সেবাগুলোয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া সরকার তাদের করোনা সহায়তা প্যাকেজের আওতায় সেসব অভিবাসীদের ১ হাজার ২০০ ডলার করে দিয়েছে। এ অর্থও রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেচে।

যেসব অভিবাসীদের কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না, তারা অনেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যার কারণে, তাদের জমানো অর্থগুলো আগেভাগে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
এছাড়া, এটাও সম্ভব যে, কিছু দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির যে হার দেখা যাচ্ছে তা কৃত্তিম। যেমন পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, স্বাভাবিক সময়ে বেশিরভাগ অভিবাসীরা বড় অঙ্কের অর্থ পাঠাতেন ‘ইনফরমাল’ উপায়ে- তারা বাড়ি যাওয়ার সময় নিজের সঙ্গে করে অর্থ নিয়ে যেতেন বা অন্য কারো মাধ্যমে পাঠাতে। এই মহামারির কারণে বহু অভিবাসী ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন। এ পদ্ধতিতে অর্থ পাঠালে তার হিসাব রাখা সহজ হয়ে থাকে। যার মানে হচ্ছে, আগে যে অর্থগুলো অগোচরে থেকে যেত এখন সেগুলো হিসাবের আওতায় আসায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, এমনটা মনে হতে পারে।

উদ্বেগ
রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সুসংবাদতো বটেই, তবে এ বৃদ্ধির কিছু উদ্বেগজনক ইঙ্গিতও রয়েছে। যেকোনোসময় এ প্রবাহ ভেঙে পড়তে পারে।
অভিবাসীরা নিজদেশে ফিরে গেলে তারা অতিরিক্ত অর্থ আয় করতে পারবেন না। উদাহরণস্বরূপ, এপ্রিল থেকে এখন অবধি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ৭৮ হাজার অভিবাসী ফিরে এসেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গত জুনে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার কিছু অভিবাসীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। সাক্ষাৎকারগুলোয় জানা গেছে, ৪১ শতাংশ অভিবাসীই নিজদেশে অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। একইসঙ্গে, যারা অর্থ পাঠাচ্ছেন তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি অর্থের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর

ডেইলি এনকে’র খবর

উত্তর কোরিয়ায় ৪ সেনাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা

৩০ নভেম্বর ২০২০



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status