যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ

প্রণয় শর্মা

বিশ্বজমিন ২০ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৪২

চলতি সপ্তাহে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের ঢাকা সফরকে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি এমন সময় ঢাকায় সফর করলেন যখন চীন তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প ঘিরে এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় দেশগুলোতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে চীন।

বিগানের তিন দিনব্যাপী সফরের আগে গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার। বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারের এক নিবন্ধে ওই ফোনালাপকে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন উদ্যম’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিগানকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছিল, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আরও  বলেছিলেন, একটি মুক্ত ও স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে বাংলাদেশ’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে উচ্চ পর্যায়ের সফর দেখা যেতো ঠিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ দিয়ে। ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এসেছিলেন সেই বছরের আগস্টে। তার উত্তরসূরী হিলারী ক্লিনটন এসেছিলেন ২০১২ সালের মে মাসে। আর এখন, বিগান এলেন আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ২ লাখ বাংলাদেশি-আমেরিকানরা ডেমোক্রেট সমর্থনকারী হিসেবেই পরিচিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ওই ভোটারদের নিজেদের দিকে ভেড়ানোর চেষ্টা করার ব্যাপারটি বাদ দিলেও— ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের জন্য মিত্র খোঁজাই বিগানের সফরের বড় প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়ায়।

সাহাব এনাম খান বলেন, নিশ্চিতভাবে চীনকে টক্কর দেয়াই এই তৎপরতার মূল বিষয়বস্তু।

বাংলাদেশ সফরের আগে সপ্তাহের শুরুর দিকে দিল্লিতে ছিলেন বিগান। সেখানে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ জড়িত অঞ্চলগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে একটি যৌথ কৌশলগত আলোচনার প্রস্তুতিমূলক কাজও শেষ করেছেন। এ মাসের শেষের দিকে নয়া দিল্লিতে ওই আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকটিতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ভূমিকা ও করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিগানের সফর কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতসহ এ অঞ্চলের আরও  ছোট ছোট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিতস্বরূপ।

গত সেপ্টেম্বরে, মালদ্বীপের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ চুক্তির আওতায়, ভারত মহাসাগরে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায়ে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করবে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নেপালের সঙ্গে দেশটির একইরকম উদ্যোগ দেখা গেছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সহকারী উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোসেফ এইচ ফেল্টার কাঠমান্ডু সফর করেন। এর আগে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ কুমার গিয়াওলি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে এক বৈঠক করেছিলেন।

দিল্লিতে অবস্থানকালে বিগান ভারতে নিযুক্ত ভূটানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলে না ভূটান।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি মাসের শেষের দিকে শ্রীলঙ্কায়ও সফর করতে পারেন পম্পেও। এশিয়ার কৌশলগত বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, ওয়াশিংটন-ভিত্তিক কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্সের টাটা চেয়ার, অ্যাশলি জে টেলিসের মতে, এসব সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঘিরে হয়ে থাকে। এ কারণে ভারত মহাসাগর ও আশেপাশের অঞ্চলগুলো তাদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে ভারতের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্কের সূত্র ধরে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক গড়ে তোলা।

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নবতেজ স্বর্নার মতে, এ অঞ্চলে মিত্র শক্তিগুলোর সঙ্গে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা কমানো, আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চল থেকে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি হ্রাস করা, এ অঞ্চলে চীনের জোরালো ও বাড়ন্ত ভূমিকার পাল্টা জবাব দেওয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থেরও অংশ। কিন্তু অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখতে চায় না।

টেলিস বলেন, ছোট ছোট দক্ষিণ এশিয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক থেকে মুক্ত রাখতে চায়। আবার ভারতের সঙ্গেও আলাদা সম্পর্ক রাখতে চায়।

অবশ্য টেলিস করেন, দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক কৌশল নিয়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছ থাকা উচিত। তার ভাষ্যমতে, যেহেতু এ অঞ্চল ঘিরে দুই দেশের মধ্যে লক্ষ্যের মিল রয়েছে, সেহেতু অন্যান্য দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ভারতের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না।

অন্যদিকে, স্বর্ণা জানান যে, নিজেদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ভারতের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি সৃষ্টি করেছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের আকার, সুযোগ ও বিশ্বাস বৃদ্ধি এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘিরে একধরণের মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, যেটির সুযোগ্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, চীন ঘিরে প্রত্যেক পক্ষের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করেছে।

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় দাতা ও বেশিরভাগ দেশের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায়- যুক্তরাষ্ট্র দেশগুলোর কাছে বেশ আকর্ষণীয় মিত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাওয়ায় তাদের মধ্যে একধরণের মেরুকরণের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের মাধ্যমে নেপালে ৬৩ কোটি ডলারের ও শ্রীলঙ্কায় ৪৮ কোটি ডলার উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য প্রস্তাব উভয় দেশেই তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে, এই অর্থায়নের সঙ্গে দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিও বেড়ে যাবে।

এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিস এগ্রিমেন্ট ও স্ট্যাটাস অব ফোর্স এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরে অনাগ্রহ দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কা। দ্বিতীয় চুক্তিটি স্বাক্ষর হলে শ্রীলঙ্কার বন্দর ও অন্যান্য স্থাপনায় মার্কিন সেনাদের প্রবেশাধিকার বেড়ে যেতো।

টেলিস বলেন, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার এই বিরোধিতা মূলত এমন ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে যে, এই চুক্তিগুলো তাদের মিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যে স্বার্বভৌমতা রয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। আদতে তারা তেমনটা পারবে না।

দক্ষিণ এশিয় দেশোগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের উন্নয়নে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্র একটি বৈশ্বিক শক্তি, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর প্রধান দাতা ও বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও চীনের মতো করে নিজেদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে এগুতে পারছে না। কিন্তু চীনের সঙ্গে দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েই চলেছে। দেশটি এ অঞ্চলে নিজেদের নীতিমালা আরও ধারালো করে তুলেছে। তাদের প্রত্যাশা, কেবল ইচ্ছুক মিত্রদের বাইরেও অন্য কিছু মিত্রও তারা জুটাতে পারবে।

(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ)

আপনার মতামত দিন

বিশ্বজমিন অন্যান্য খবর

রয়টার্সের প্রতিবেদন

করোনামুক্ত সিঙ্গাপুর!

২৫ নভেম্বর ২০২০

বিবিসির রিপোর্ট

মার্কিন রণতরীকে তাড়া করার দাবি রাশিয়ার

২৫ নভেম্বর ২০২০

রয়টার্সের রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ও একটি মিরাকল

২৫ নভেম্বর ২০২০

দ্য হিলের রিপোর্ট

‘ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আসছে করোনার টিকা’

২৫ নভেম্বর ২০২০

দৃপ্তকণ্ঠে বাইডেনের উচ্চারণ

যুক্তরাষ্ট্র আবার বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে, পিছপা হবে না

২৫ নভেম্বর ২০২০



বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত



DMCA.com Protection Status