অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তাব

আলোচনায় ডিজিটাল বৈষম্য ও ঝুঁকি

সাজেদুল হক

মত-মতান্তর ১৮ অক্টোবর ২০২০, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ২:০৪

ফাইল ছবি
সিদ্ধান্তটি এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা। এজন্য গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির ভিসি মুনাজ আহমেদ নূরের নেতৃত্বে তৈরি করা সফটওয়্যারকে কাজে লাগানোর কথা বলছেন তারা।

অস্বীকার করার জো নেই, করোনা এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শুধু বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর কোনো দেশই এমন পরিস্থিতি আগে মোকাবিলা করেনি। তবে নতুন এক বাস্তবতায় পৃথিবী আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। আক্রান্ত, মৃত্যু কমছে না। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সারা দুনিয়াতেই মোটামুটি আবার শুরু হয়েছে।
যদিও দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় ইউরোপের কিছু কিছু দেশে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে দেশে দেশে নানা আলোচনা, বিতর্ক চলছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো খোলেনি। বেশ কিছু পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ওঠলেও খুব বেশি সমালোচনা হয়নি। এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, এ শিক্ষার্থীদের ফল কীভাবে ঘোষণা করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা কীভাবে ভর্তি হবেন।

গত কয়েক মাস ধরে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। কোনো পরীক্ষা হচ্ছে না। কিন্তু এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বৈষম্যের বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষকরে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে ব্যাপক। এখনো পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর হাতে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন নেই। গ্রামে ও শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও সমান নয়।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকা থেকে মাত্র ৭১ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর বেলাব উপজেলা; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে সেখানেও অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন সরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা। তবে তাতে সাড়া মিলছে না। বেলাবর দেওয়ানের চর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইসলাম উদ্দিন জানান, ফেইসবুক লাইভে ক্লাস নেয়া হলেও শতকরা ৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে না। বিভিন্ন জেলায় খবর নিয়ে এমন কথাই শোনা গেল। বাগেরহাটের খারদ্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসানের কাছে হ্যালোর সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল- কেন সে অনলাইন ক্লাসে যায় না? উত্তরে সাকিব বলে, “আমাদের তো বড় ফোন (স্মার্ট ফোন) নাই, তাই আমি করতে পারছি না।”

বেলাবর দেওয়ানের চর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইসলাম বলেন, “কতজনের স্মার্টফোন আছে? ৫ বা ১০ ভাগ অভিভাবকের হয়ত স্মার্টফোন আছে, কিন্তু কতজন অভিভাবক শিক্ষার্থীকে মোবাইল দিচ্ছে? কতজনের বাড়িতে ওয়াইফাই আছে? দিনে ৪টা ক্লাস হয়, ২৫ মিনিট করে ১০০ মিনিট। সেজন্য নেট কিনতে তো টাকা লাগে। এ টাকা তাদের কাছে নাই।” নেটওয়ার্ক সমস্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাটও অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতির হার কমিয়ে দিচ্ছে বলে জানান শিক্ষকরা ।

এই যখন অবস্থা তখন উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা অনলাইনে নেয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক  সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। কথা হচ্ছে যেসব শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষা দিতে চান তাদের সবার কি ইন্টারনেট ব্যবহারের সামর্থ্য আছে? সবার কাছে কি ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন আছে? সবার কি ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য আছে? এছাড়া, ডিজিটাল ঝুঁকির বিষয়টিতো রয়েছে। কয়েক লাখ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেবেন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যদি তাদের একটি অংশ পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারেন সে দায় কে নেবে? আর ডিজিটাল জালিয়াতির আশঙ্কাতো উড়িয়ে দেয়া যায় ই না।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

আবুল কাসেম

২০২০-১০-১৮ ০২:৩০:২০

ডিজিটাল দুর্নীতির, সার্ভারের যান্ত্রিক ত্রুটির এবং পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে অকস্মাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সাথে সাথে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ও সার্ভারের লোড ক্যাপাসিটি বা ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পরীক্ষার্থী যদি সার্ভার ইউজার হয়ে পরীক্ষায় উপস্থিত হয় তাহলে সার্ভার অনিবার্য ভাবে ডাউন হবেই হবে, ফলে একই সঙ্গে অগণিত পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নিশ্চিত ভাবে ভন্ডুল হয়ে যাবে। এটা হলো শহরের অবস্থা। কিন্তু গ্রামের পরীক্ষার্থীরা প্রায় সকালেই ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন না থাকায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে এবং জিবি কেনার সামর্থ্য না থাকার দরুন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ শিক্ষার সোপানে আরোহন করার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেনা। এসকল বাস্তবতার নিরিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিছুতেই অনলাইনে গ্রহণ করা সঙ্গত হবে না। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা অনলাইনে নেয়া ঠিক হবে না। কারণ সারা দেশের সব মেধাবীদের দৃষ্টি এদুটো সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে থাকে। এদুটোতে ভর্তির স্বপ্ন সব মেধাবীদের মনে দীর্ঘদিন থেকে লালিত হয়ে আসছে এবং এদুটোতে ভর্তির প্রতিযোগিতাও অন্যদের চেয়ে বেশি। অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হলে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ একেবারে একশো ভাগ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু থাকার ও কাঙ্ক্ষিত গতির নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেনা। এছাড়া অনেক পরীক্ষার্থীর যারা অনেক মেধাবী অথচ দরিদ্র তাদের লেপটপ বা কম্পিউটার নাও থাকতে পারে। তাছাড়া কর্তৃপক্ষ যে সার্ভার ও প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা নেবেন সেটাতে অকস্মাৎ বা হঠাৎ ত্রুটি দেখা দিলে পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা কারোরই কাম্য হতে পারে না। অন্য দিকে দুর্নীতিগ্রস্থ পরীক্ষার্থীরা যদি অসদুপায় অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ে সে ক্ষেত্রেও মেধাবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং ভর্তি পরীক্ষার মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা যার সুযোগ পরীক্ষার্থীরা সারা জীবনের জন্য একবার-ই পায় তা অনলাইনে গ্রহণ করা মোটেই যুক্তিসঙ্গত হবে না। প্রয়োজনে দেশের ৮ টি বিভাগে ৮ দিনে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। তাহলে গ্যাদারিং কম হবে এবং দরকারী দূরত্ব বজায় রাখাও সম্ভব হবে। আর বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ পদ্ধতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত হবে না। কারণ ঐ একটাই , এদুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে দেশের সেরাদের সেরা মেধাবীদের অন্য রকম একটা বিশেষ আগ্রহ , আকর্ষণ ও স্বপ্ন থাকে। গুচ্ছ পদ্ধতিতে গেলে তারা নির্ঘাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের লালিত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ফলে অনেকের শিক্ষা জীবন থেমেও যেতে পারে এবং কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ না পেয়ে তাদের শিক্ষার বাঁক পরিবর্তন ঘটলে তাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সর্বসাকুল্যে যে কথা দাঁড়ায় তা হলো, দেশের সেরা মেধাবী ও দরিদ্র-মেধাবী শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনলাইনে নেয়া মোটেই ঠিক হবে না এবং গুচ্ছ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত হওয়াও ঠিক হবে না। প্রয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে ভাগে ভাগে পরীক্ষা নিতে হবে। আমরা সুন্দর একটা ভর্তি পরীক্ষা চাই। কারো ক্ষতি, স্বপ্নভঙ্গ ও বঞ্চনা চাই না। সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমাদের কথা হলো কারো উদ্ভাবিত সফটওয়্যারের সক্ষমতা প্রমাণের জায়গা ভর্তি পরীক্ষা নয়। অন্য অনেক জায়গা আছে তারা তাদের সফটওয়্যার ব্যবহার করে দেখতে পারেন। 'একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না' কথাটা যদিও সড়কের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে ; কিন্তু সত্যিকার ও অর্থবহ প্রতিযোগিতা ছাড়া এবং কোনো অসতর্ক অব্যবস্থাপনার কারণে যদি একজন শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তাহলে শুধু তার কান্না নয় বরং তার পিতা মাতা ও ভাই বোনের কান্না সারা জীবনেও শেষ হবে না। সারা দেশের পরীক্ষা একই দিনে নিতে গেলে লাখের মতো পরীক্ষার্থীর সমাগম হবে। তাই ৮ কর্মদিবসে ৮ বিভাগের পরীক্ষার্থীদের বা আরো ছোটো আকারেও পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। সেজন্য আলাদা আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে ; যা কোনো কঠিন কাজ নয়। স্মর্তব্য যে, যতো সংখ্যক এইচএসসি পরীক্ষার্থী মানে তের লাখ একযোগে এইচএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা ছিলো ততো সংখ্যক পরীক্ষার্থী কিন্তু মেডিকেল বলেন আর ইন্জিনিয়ারিং বলেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বলেন একযোগে সবাই কোনো ভর্তি পরীক্ষাতেই অবতীর্ণ হবে না। সুতরাং অনলাইনের চিন্তা বাদ দিয়ে হলের মধ্যে বসে খাতা কলমে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হলে কোনো রকম সমস্যা হবে না। বুয়েট কর্তৃপক্ষ মাত্র দশ হাজার শিক্ষার্থীকে তাদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করার সুযোগ দিয়ে থাকেন। এই স্বল্প সংখ্যক পরীক্ষার্থীর এক সঙ্গে হলের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব। মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অধিক সংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তবুও সেটা লাখের বেশি নয়। প্রয়োজনে সেগুলো খন্ডাকারে নেয়া যেতে পারে। তবুও অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যাবে না। কারণ তাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। যা কোনো কালেই পূরণ হবার নয়।

M ABUL KALAM

২০২০-১০-১৮ ১৫:২২:৫৮

ON THE LIGHT OF REALITY ONLINE CLASS & TAKING ADMISSION TEST PROPOSAL IN BANGLADESH TOTALY A RIDICULAS THING.

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ

১৫ নভেম্বর ২০২০

বাসে সিরিজ আগুন

উদ্বেগের বৃহস্পতিবার, জনমনে নানা প্রশ্ন

১৩ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status