বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম

রনি আহমেদ

চলতে ফিরতে ৮ অক্টোবর ২০২০, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:২০

প্রবাদ আছে- বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম।
বর্ণিল সুতোয় গাঁথা জীবনের বয়ান নাম তার চলনবিল। চলনবিল যার নাম শুনলেই সুবিশাল জলরাশির উথাল পাতাল ঢেউ। চোখে ভাসে দিগন্ত রেখায় সবুজের আল্পনা আঁকা অফুরন্ত সৌন্দর্য। চলনের রুপ সর্বোচ্চ বর্ষায়।

ঋতুচক্রের পালাবদলে, এক এক ঋতুতে এক এক রুপে আসে চলনবিল। বর্ষায় সমুদ্রের মতো সুবিশাল জলরাশি বুকে নিয়ে ভয়ংকর রুপ ধারণা করে এ বিল। শরৎ এ বিলের জলরাশি হয়ে ওঠে শান্ত ও স্থির।
হেমন্তে বিল জুড়ে পাকা ধান আর সোঁদা মাটির গন্ধে ম-ম করে চারিদিক। শীতে শস্যের হলুদ রঙ আর সবুজের মিশ্রণ সৃষ্টি করে এক অপরুপ সৌন্দর্যের মাধুর্য এবং গ্রীষ্মে চলনের রুপ হয়ে ওঠে শুষ্ক ও রুক্ষ।

রুপবদলের এই বৈচিত্রে বর্ষার চলনবিল এক স্বর্গীয় জগৎ । যে দিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি, একে ছোট একটি সমুদ্রও বলা যায়। আকাশে দেখা দেয় সজল-কাজল মেঘ। নানা রঙের ফুল, হরেক রকমের পাখির কলরব। সাদা হাতির মতন করে তেড়ে আসে ঢেউ। আছড়ে পড়ে পাড়ে। এর মাঝে ডিঙি নৌকা একবার ঢেউয়ের পিঠে উঠে আবার নামে, আছাড় খায় বারবার। সুবিশাল জলরাশির উত্তাল তরঙ্গ, নির্মল বায়ু, শ্রাবণের জোসনা, মেঘ-রৌদ্দুর লুকোচুরি খেলা, জেলেদের ডিঙি নৌকায় মাছ ধরা, ইঞ্জিন চালিত ছোট-বড় নৌকা, পালতোলা ডিঙি নৌকা, জলরাশির মাঝে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট গ্রাম আর সন্ধ্যা বেলায় চলনবিলের বুকে সূর্যের সলিল সমাধি চলনবিলকে করে তোলে বিচিত্র সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

চলনবিলের রুপবিকাশে পদ্মা, কচুরিপানা, বিলজুড়ে নানা রঙের বুনো ফুল, বিভিন্ন জলজ গাছ, পানকৌড়িদের ডুবসাঁতার খেলা আর সমস্থ বিলে সাদা বকের ছড়াছড়ি সঙ্গে ভাসমান দোল খাওয়া শাপলা চলনবিলের সৌন্দর্যের বৈচিত্রকে করে তোলে যেন পরিপূর্ণ।

এক সময় এ বিলকে ডাকা হতো ‘মাছেদের বাড়ি’। এখন সেই আগের মতন মাছে ভরপুরতা নেই এ বিলে, তবুও বহু প্রজাতির দেশি মাছের দেখা মেলে।

বিলে মেলে রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, শিং, মাগুর, কই, শোল, গজার, টাকি, বাইম, পাবদা, ট্যাংরা, পুঁটি, চাঁদা, গুচি, পাতাশি উল্লেখযোগ্য।

শুধু কি বিল? বিলের মধ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৪ হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনের ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খাল ও অসংখ্য পুকুর। এইসব নদ-নদী এবং খাল আঁকাবাঁকা জলরাশিত তৈরি করেছে চলনবিলের ভিন্ন এক সৌন্দর্য।

চলনবিলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি দেখা মেলে দেশের বড় গ্রামগুলোর অন্যতম ‘কলম গ্রাম’। এই কলম গ্রাম নাটোরের সিংড়া উপজেলার ৪ নম্বর কলম ইউনিয়নে পড়েছে। মূলত কলম গ্রামের নাম থেকেই ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। কলম গ্রামের নামকরণের পিছনে কথিত আছে, এই স্থানে এক রাজা ভ্রমণে এসে কলম হারিয়ে যায়। সেখান থেকেই নাম হয় কলম গ্রাম।

এছাড়া ও নাটোরের গুরুদাসপুরে খুবজীপুর গ্রামে দেখা মেলে চলনবিল জাদুঘর। এখানে রয়েছে চলনবিলের বিভিন্ন ঐতিহ্যময় জিনিসপত্র। দেয়ালে টাঙ্গানো রয়েছে উটের চামড়া, মিসরের পিরামিডের পাথর আর বিভিন্ন সময়ের স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা ও ধাতব মুদ্রা। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ব্যবহৃত বুলেট, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লার হাতে লেখা ডায়েরি, বাদশাহ নাসির উদ্দিন ও মোগল সম্রাট আলমগীরের হাতে লেখা কোরআন শরীফ, রানি ভবানীর হাতে লেখা দলিল দেখা যায় চলনবিল জাদুঘরে।

বিশাল এই বিলকে কেন চলনবিল নামে ডাকা হয়, এর সঠিক উত্তর মেলেনি আজও। কথিত আছে, দুই হাজার বছর আগেও চলনবিল নামের অস্তিত্ব ছিলো নাহ। তখন এই অঞ্চল ছিলো সমুদ্রগর্ভে। কালের বিবর্তনে সমুদ্র সরে যায় আরো দক্ষিণে। সমুদ্র সরে যাওয়ার পর তার স্মৃতি ধরে রেখেছে চলনবিল। অন্যান্য বিলের মতো এই বিল স্থির নয়, হইতো নদীর মতো এতে স্রোত ছিলো বলেই এর নাম হয়েছিলো চলনবিল।

নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার এই তিন জেলার নয়টি থানা মিলে চলনবিলের অবস্থান। ধারণা করা হয় উৎপত্তির সময় চলনবিলের আয়তন ছিলো প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে যা প্রায় আটশ’ বর্গমাইল।

চলনবিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসুদের বর্ষা মৌসুমে আগমন ঘটে। দেশি দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বিদেশি পর্যটকদেরও চোখের তৃষ্ণাকে এ বিল করেছে পরিপূর্ণ।

এখানে আগত পর্যটকদের অনেকেই আসার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, বিশুদ্ধ বাতাস এবং অপার সৌন্দর্য উপভোগ ,বর্ষা মৌসুমে নৌকা ভ্রমণ, জলকে জয় করে গ্রামীণ মানুষের সংগ্রামী জীবনযাপন, জেলেদের ডিঙি নৌকা নিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য, পরিবারের সঙ্গে বনভোজন করতে পারা, অনেক প্রজাতির পাখি দেখার সুযোগ এবং দেশিয় মাছ খাওয়ার সুযোগ।


লেখক- শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

NARUTTAM KUMAR BISHW

২০২০-১০-১০ ১২:৩৩:৫৯

ধন্যবাদ ভাইয়া, চলনবিল নিয়ে আরও বেশি বেশি লেখালেখি করুন। যাতে এটি বাংলাদেশের অন্যতম একটা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পায়। ইতিমধ্যে যদিও নাম ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এটিকে একটি মিনি কক্সবাজার করার পরিকল্পনা করা যায় কি না সেই কথা লিখুন।

jamia

২০২০-১০-০৮ ০৯:২৩:২৪

আপনার উপমা আর বর্ণনাভঙ্গি অসাধারণ❤❤

আপনার মতামত দিন

চলতে ফিরতে অন্যান্য খবর

কলকাতার ডায়েরি

হাওড়া সেতুতে চালু হলো লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো

১৩ জানুয়ারি ২০২০

এক কাপ চায়ে সাতটি রং!

১৩ জানুয়ারি ২০১৯



চলতে ফিরতে সর্বাধিক পঠিত