পর্যবেক্ষণ

নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় ঐতিহাসিক রায়

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

প্রথম পাতা ১ অক্টোবর ২০২০, বৃহস্পতিবার

সংবিধানে বর্ণিত নাগরিক অধিকার সুরক্ষা দেয়ার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন।এ রায় অধিকার বঞ্চিত মানুষদের মহৎ অনুপ্রেরণা যোগাবে। এ রায় জনগণের ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে এবং গণতন্ত্রের জন্য একটি উজ্জ্বল কীর্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আনুষ্ঠানিক লিখিত চাহিদা ছাড়া এবং গ্রাহককে না জানিয়ে সরকারি-বেসরকারি মুঠোফোন অপারেটরের কাছ থেকে কললিস্ট কল রেকর্ড (কথোপকথন) সংগ্রহ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত বলে অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত রায়ে বলেছেন অডিও-ভিডিও সহ নাগরিকদের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রায়ই ফাঁস হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্দেশে প্রকাশিত হয়, যা এখনকার সাধারণ অভিজ্ঞতা। অথচ এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, সংবিধানে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অন্যান্য যোগাযোগের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এটা কোনো আগ্রহী গোষ্ঠীর জন্য সহজে লঙ্ঘন করা যাবে না।

রায়ে বলা হয়েছে, কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তাকে যখন কোনো তদন্তের জন্য কোনো কল লিস্ট বা তথ্যের প্রয়োজন পড়বে তাকে অবশ্যই কোমপানির যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হবে। অনুরোধপত্রে তাকে তথ্য চাওয়ার কারণ এবং এই তথ্য তার তদন্তের জন্য কেন জরুরি তা উল্লেখ করতে হবে। শুধুমাত্র এমন পর্যায়েই ফোন কোমপানিগুলো কল লিস্ট বা তথ্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রদান করতে পারবে। এই প্রক্রিয়ার বিষয়ে ব্যবহারকারীকেও জানাতে হবে।
নইলে প্রদানকৃত নথি তার সত্যতা হারাবে এবং যেই কর্মকর্তা এই নথি প্রদান করবেন তিনিও তার বৈধতা হারাবেন। একইসঙ্গে তাকে একজন নাগরিকের সংবিধানে ঘোষিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। প্রসঙ্গত, এ নির্দেশনা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ পালন করতে বাধ্য।

বাংলাদেশের সংবিধান ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা দিলেও অতীতে আমরা দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার টেলিফোনিক কথোপকথন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। দুই নেত্রীর কথোপকথন প্রকাশ একদিকে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে, অন্যদিকে সম্মানিত নেত্রীদ্বয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এর কোনো প্রতিকার করা হয়নি। বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যক্তিগত কথোপকথন ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। এই রায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রকাশে লাগাম দিতে পারবে।
সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের ধারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের (ক) প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক হইতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকিবে; এবং (খ) চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকিবে।

নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে এ রায় যুগান্তকারী রায়। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্য কোনো আইন সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারবে না। সরকারের বিভাগসমূহের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। আমাদের সংবিধানে সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চয়তা দেওয়ার ফলে আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের কাজের বৈধতা যাচাইয়ের কর্তৃত্ব বিচার বিভাগের উপর ন্যস্ত করে। কেউ যেন সাংবিধানিক সীমানাকে লঙ্ঘন করতে না পারে তার জন্য ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বিচার বিভাগকে।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ প্রসঙ্গে কতিপয় আদেশ ও নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিচার বিভাগ সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বকে দুইটি পদ্ধতিতে নিশ্চিত করে। (১) বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে (By judicial Enforcement) এবং (২) বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে (By judicial Reviwe)
সংবিধানের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণ নির্ভর করে একটি দেশের আদালতের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতার উপর।

যখন শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে তখন আদালত যে ক্ষমতা বলে মৌলিক অধিকারকে বলবৎ করে তাকে বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা বলে। আর শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগ যখন সংবিধানের সীমালঙ্ঘন করে বা আইনগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে কোনো কাজ করে তখন যে ক্ষমতা বলে আদালত উক্ত কাজকে অসাংবিধানিক বা অবৈধ ঘোষণা করে তাকে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা বলে।

আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি কোনো আইন সংসদ প্রণয়ন করতে পারবে না তা ২৬ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করেছে এবং সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জাতীয় সংসদকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং আমাদের সংসদকে সংবিধানের অধীন করা হয়েছে, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারবে।

সংবিধান পরিপন্থি কোনো আইন জাতীয় সংসদে গৃহীত হলেও সংবিধানের ৭, ২৬ ও ১০২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আদালত অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। সুতরাং উচ্চতর আদালত সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

যখন কতিপয় মানবাধিকারকে দেশের সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং সাংবিধানিক নিশ্চয়তা (constitutional guarantees) দ্বারা সংরক্ষণ করা হয় তখন তাদেরকে মৌলিক অধিকার বলা হয়। এই সংবিধানিক নিশ্চয়তা বিচার বিভাগের মাধ্যমে কার্যকর হয়। মৌলিক অধিকারগুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে উচ্চতর মর্যাদা দেওয়া হয় এজন্য যে যাতে শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে না পারে, যখন তখন ছিনিয়ে নিতে না পারে।
মানুষের আত্মবিকাশের জন্য কতিপয় সুযোগ-সুবিধাই হচ্ছে মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে তো ৪৪ পর্যন্ত ১৮ টি অধিকার সন্নিবেশ করা হয়েছে।

কিছু মৌলিক অধিকারের উপর বাধানিষেধ আরোপ করা যায় না আর কিছু মৌলিক অধিকারের উপর যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপ করা যায়। জনস্বার্থে, জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা স্বার্থে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে, আইন-শৃঙ্খলা স্বার্থে আরোপিত বাধানিষেধ যুক্তিসঙ্গত কি না এবং তা জনস্বার্থে করা হয়েছে কি না তা দেখার দায়িত্ব আদালতের।

মৌলিক অধিকার বলবৎ করার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের বাইরে অন্য আদালতকেও ক্ষমতা প্রয়োগ করার নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদের (২)-এ বলা হয়েছে এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রয়োগযোগ্য সকল বা যেকোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন।
কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও কোনো সংসদ জনগণের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার প্রশ্নে অন্য কোনো আদালতকে এরূপ এখতিয়ার প্রদানে কোনো আইন প্রণয়ন করেনি বা প্রয়োজনও মনে করেনি।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্র ক্রমাগত অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করছে। জনগণের ভোটের অধিকার মৌলিক অধিকার বিলুপ্ত হওয়ার পথে। বাঙালির চিরকালীন মূল্যবোধও আমরা পরিত্যাগ করে ফেলেছি। অন্যায়, নৃশংসতা ও বর্বরোচিত সংস্কৃতি আমাদের রক্তের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। এসব বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমাদের অনেকের এখন সীমাহীন ক্ষমতা। এই বাস্তবতায় জনগণের স্বপক্ষে একটি যুগান্তরকারী রায় মানুষকে আশাবাদী করবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সুবিচার নিশ্চিত করার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করবে।

লেখক: শহীদুল্লাহ ফরায়জী, গীতিকার
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০.

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

ক্ষমতার দাপট

২৭ অক্টোবর ২০২০

আক্রান্ত ছাড়ালো ৪ লাখ

২৭ অক্টোবর ২০২০

করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে। সংক্রমণ শুরুর ২৩৩ দিনের মাথায় করোনা ...

মানুষকে মাস্ক পরাবে কে?

২৬ অক্টোবর ২০২০

নো মাস্ক নো সার্ভিস

২৬ অক্টোবর ২০২০

মাস্ক না পরলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সেবা মিলবে না। এমনই নির্দেশনা দিয়েছে ...

পহেলা নভেম্বর থেকে সবার জন্য খুলছে ওমরাহ’র দরজা

২৬ অক্টোবর ২০২০

আগামী ১লা নভেম্বর থেকে ওমরাহ পালন করতে পারবেন বিশ্বের সকল দেশের মুসল্লিরা। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা ...

অনশন ভাঙালেন মেয়র আরিফ

রায়হানের মায়ের কান্না

২৬ অক্টোবর ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত