এমসি ক্যাম্পাসে ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণের ফাঁদ

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে

প্রথম পাতা ১ অক্টোবর ২০২০, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৭

এমসি কলেজের পেছন দিকে মন্দিরের টিলা। নির্জন টিলাটি। যারা এমসি’র ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান তারা এক সময় ঘুরে ঘুরে টিলার কাছে চলে যান। আর ওখানে গেলেই ঘটতো বিপত্তি। ছাত্রলীগের সাইফুরের নেতৃত্বে ওই চক্রের সদস্যরা মন্দিরের টিলায় বসে আড্ডা দিতো, ইয়াবা সেবন করতো। আর কেউ গেলেই ‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হতো। প্রেমিক-প্রেমিকা হলে তাকে ছবি তুলে আদায় করা হতো মুক্তি পণ। স্বামী-স্ত্রী গেলে কখনো কখনো স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করা হতো।
এমন ঘটনা ওই টিলায় ঘটেছে অহরহ। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিকার পেতেন না। সম্ভ্রম, টাকা-স্বর্ণালংকার ওদের কাছে বিলিয়ে দিয়ে ফিরতে হতো শূন্য হাতে। এমসির ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনার পর খবর পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বাবলা চৌধুরী। বিকাল হলেই তার চোখ থাকতো এমসির ক্যাম্পাস, হোস্টেল কিংবা পাশের আলুরতল। প্রায়ই এ ধরনের ঘটনার খবর আসে তার কাছে। এ কারণে সবার আগে এমসির ছাত্রাবাসের ঘটনার খবর এসেছিলো তার কাছে। তিনি গিয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই নারীকে উদ্ধার করেন। বাবলা চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ‘এমসি কলেজ ও আশপাশের এলাকায় গত ৫ বছরে একাধিক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ভুক্তভোগীরা এসে বিচার দাবি করলেও কিছু করতে পারিনি। এ কারণে তার নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী মোটরসাইকেল নিয়ে নানা জায়গায় পাহারা দিতো। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই করা হতো প্রতিবাদ। উদ্ধার করা হতো নির্যাতিতা কিংবা ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া নারী-পুরুষদের।’ বাবলা চৌধুরী জানিয়েছেন বছর দু’য়েক আগের একটি ঘটনা। একদিন বিকালে জগন্নাথপুরের এক তরুণ তার তালতো বোনকে নিয়ে এমসি কলেজের বাংলোর পেছনে গিয়ে বসে। এমন সময় সাইফুর চক্রের সদস্যরা তাদের পায়। এক পর্যায়ে অসামাজিক কাজের অভিযোগ তুলে তারা ওই তরুণ-তরুণীর ছবি তুলে। এরপর ছেলেটিকে বেঁধে তরুণীকে গণধর্ষণ করে। টাকাও চায় তরুণীর কাছে। খবর পেয়ে তিনি গিয়ে ওই তরুণী ও ছেলে বন্ধুকে উদ্ধার করলেও কাউকে খুঁজে পাননি। এ ঘটনার পর নির্যাতিত কিংবা সঙ্গে থাকা ছেলেটি আইনি ঝামেলা এড়াতে মামলায় যায়নি বলে জানান বাবলা। এদিকে- শুধু এই ঘটনাই নয়, খোদ এমসি কলেজের ভেতরে এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে এমসি কলেজের গার্ড মাইকেলকে ক্যাম্পাসেই গণধোলাই দেয়া হয়েছিলো। স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে তাকে গণধোলাই দেয়। সাইফুর-রনি সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতো মাইকেল। কেউ ক্যাম্পাসে গেলেই মাইকেল খবর দিতো ওই সিন্ডিকেটকে। মন্দিরের টিলার ঢালু জায়গাতে আড্ডাস্থল সাইফুর, রনি, রবিউলদের। স্থানীয়রা জানায়- বিকাল হলেই ধান্ধায় বের হতো তারা। চলে আসতো ওখানে। প্রতিদিনই মন্দিরের টিলায় ঘুরতে যায় তরুণ-তরুণীরা। আর তাদেরই টার্গেট করে ওরা। তাদের হাতে সম্ভ্রম হারানো অনেক নারী বিচার না দিয়েই চলে যান। কখনো কখনো কেউ বিচার প্রার্থী হলেও তাদের খোঁজ মিলে না। নাম-পরিচয় পাওয়া যায় না। ফলে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার হলেও নীরবে সহ্য করতেন সবাই। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন- এমসি কলেজের ক্যাম্পাস ছিল ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা। তাদের কাছে অসহায় ছিল কলেজ প্রশাসনও। তিনি দাবি করেন- গত ৫ বছরে ক্যাম্পাসের পেছনের টিলায় অন্তত ১০টির মতো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনাই প্রশাসন জানতেন। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন না। ওদের কাছে জিম্মিই ছিল কলেজ প্রশাসন। বরং খাদিজার ঘটনার পর থেকে প্রশাসন জানতো ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্যাম্পাসকে নিরাপদ রাখছে। বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের আগে কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন নিতাই চন্দ্র চন্দ। সাবেক অধ্যক্ষের কাছে সাইফুর-শাহ রনি ও রবিউল সিন্ডিকেটরা তার কাছে হোস্টেলে বসবাসকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর বেতন ও খাওয়ার বিল মওকুফের দাবি জানান। এতে কলেজ অধ্যক্ষ অস্বীকৃতি জানালে তারা অধ্যক্ষের কক্ষ ভাঙচুর করে। বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের পরও নানা ভাবে তারা প্রভাব বিস্তার করে। এ কারণে কলেজ অধ্যক্ষ নিজেই স্বীকার করেছেন- তিনি অসহায় ছিলেন। এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গত শুক্রবার রাতে ধর্ষণ ঘটনার আগে ছাত্রলীগ কর্মীরা এমসি কলেজের ক্যাম্পাসে ছিল। সন্ধ্যা নামার পরপরই তারা চলে আসে কলেজের ফটকে। এ সময় সেখানে স্ত্রীসহ আসেন ওই স্বামী। কলেজ ক্যাম্পাসের ফটক থেকেই স্ত্রীকে গাড়িতে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর ধর্ষণের পর তারা গাড়ির চাবি ও মোবাইল ফোন রেখে দেয়। তার পরিবর্তে তারা দাবি করেছিলো ৫০ হাজার টাকা। ঘটনার পরপরই সেখানে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা গিয়ে গাড়ির চাবি ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। ওই ছাত্রলীগ নেতা জানান- সাইফুর চক্রের কাজই হচ্ছে, বেড়াতে আসা পুরুষকে বেঁধে নারীদের ধর্ষণ করা। এরপর তারা মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। গত শুক্রবারের ঘটনায়ও তারা একই কাজ করেছে। এমসি কলেজের ফটকের বাইরে রাজপাড়া গলির মুখে রয়েছে মাদক সিন্ডিকেটের আস্তানা। ওই আস্তানার নিয়ন্ত্রক গ্রেপ্তার হওয়া আইনুদ্দিন আইনুল। তার সঙ্গে রাজপাড়ার শাহ জুনেদ, হাসানসহ কয়েকজন ওই মাদক আস্তানার নিয়ন্ত্রণ করে। রাজপাড়া এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন- বিকাল হলেই সাইফুর-রনির অপরাধের সঙ্গ দিতে তারা ছুটে যেতো এমসির ক্যাম্পাসে। শিশু স্কুলের পাশ দিয়ে তারা ওই এলাকায় প্রবেশ করতো। এমসির কলেজের হোস্টেল এলাকায় আগে নারী ধর্ষণের ঘটনা কখনো ঘটেনি। কিন্তু গত এক বছর ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে হোস্টেলের বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা। তারা জানায়- সন্ধ্যা নামলেই হোস্টেলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা খুব প্রয়োজন ছাড়া হলের রুম থেকে বের হতো না। তবে- প্রায় সময়ই সাইফুর-রনি প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশায় মহিলাদের নিয়ে এসে ঢুকতো। এবং তারা শিক্ষক বাংলোতে চলে যেতো। এসব ঘটনা দেখলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পেতো না। হোস্টেলে সুপার থাকতেন না। ফলে হোস্টেলের নিয়ন্ত্রণ করতো তারাই। এমসি কলেজের পাশেই রয়েছে আলুর তল এলাকা। একই এলাকায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ার কলেজ অবস্থিত। বিকাল হলেই অনেক পর্যটক স্ত্রী ও বান্ধবীকে নিয়ে সেখানে ঘুরতে যান। তারা নির্জন, নিরিবিলি টিলায় গেলেই ওই এলাকায় একটি চক্র তাদের একইভাবে ব্ল্যাকমেইল ও ধর্ষণ করতো। এ ধরনের অনেক ঘটনা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে রটছে। তারা জানান- বেশির ভাগ সময় প্রেমিক-প্রেমিকা টিলায় বেড়াতে আসেন। তাদের ব্ল্যাকমেইল করে ছাত্রলীগের বালুচরের একদল কর্মী। এসব কর্মীদের পুলিশে নানা সময় অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয়নি। সিলেট সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ জানিয়েছেন- এমসি কলেজ কিংবা আশপাশের এলাকাকে নিরাপদ করতে একটি থানার প্রস্তাব রয়েছে। হযরত শাহ বোরহান উদ্দিনের নামে ওই থানা করার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। থানা হলে, পুলিশি টহল বাড়বে ধর্ষণ, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা কমে যাবে। তিনি জানান- এমসি কলেজ ও আশেপাশে এলাকায় জোরপূর্বক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির অনেক ঘটনা তার কাছে আগেও এসেছে। কিন্তু পরিচয় না পাওয়ায় কোনো প্রতিকার করা সম্ভব হয়নি। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন- এমসি কলেজ ও আশেপাশের এলাকায় সব সময় পুলিশ টহল ছিল। এখনো আছে। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ধর্ষক ও আসামিদের বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন ঘটনায় মামলা ছিল বলে জানান তিনি।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mohammad Amin

২০২০-১০-০৪ ১৪:৪০:৫৩

Many thanks , for this well informative article. Our Educationists & Social scientists should pointed out the root causes of degeneration of Character in our youth. Introduction of moral principle in our education system is extremely important at the moment . I hope the Curriculum Specialists , Institution Incharges , Law Enforcing Authorities & Government will take a joint & co-ordinated effort to build our beloved motherland a future safe Bangladesh

NARUTTAM KUMAR BISHW

২০২০-১০-০৩ ১২:৫৬:১৬

আমাদের প্রশ্ন হল যদি সেখানে এতদিন এত ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে কেউ এতদিন মুখ খুলেনি কেন। মরার ভয়ে সেই মরার ভয় কি এখন নেই। এখন সব ঘটনা বের হচ্ছে। সব কলেজেই এই সমস্যা আছে। সব কলেজেই এই তদন্ত হওয়া দরকার।

Mizanur Rahman

২০২০-১০-০২ ২১:২২:৩১

Be aware from rapist league.

Abu Saimon

২০২০-০৯-৩০ ১৮:২১:১৩

প্রতিবেদন পড়ার সময় মনে হল বস্তিবাসি টোকাইদের ঘটনা পড়ছি ৷ আমার তো মনে হয় টোকাইরাও লজ্জা পাবে, অপমান বোধ করবে এসব ছাত্র নামধারী জানোয়ারদের কার্যকলাপ শুনলে ৷

ভেসেল

২০২০-০৯-৩০ ১৪:৪৯:৩৭

বাবলা চৌধুরী যিনি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা , তার জবানবন্দিতে এটা পরিষ্কার যে এমসি কলেজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন কার্যক্রম ছিল না । তিনি নিজেই পাহারা বসাতেন, আর মাননীয় অধ্যক্ষ মহোদয় ছাত্রলীগের হাতে ক্যাম্পাস বর্গা দিয়ে রেখেছিলেন । পুরো বিষয়টি এখন এক করলে কি দাঁড়ায় ? বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট হচ্ছে শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো ! একই অবস্থা সব সরকারি কলেজের, বিশ্ববিদ্যালয়ের ।

ঊর্মি

২০২০-১০-০১ ০১:৪০:৩৩

তুমি ফুল তুমি ফল তুমি তাতে গন্ধ ................. সর্প হইয়া দংশন করো ওঝা হইয়া ঝারো !!! কিছুদিন চোখে বালি, তার পর যেই লাউ সেই কদু

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

ক্ষমতার দাপট

২৭ অক্টোবর ২০২০

আক্রান্ত ছাড়ালো ৪ লাখ

২৭ অক্টোবর ২০২০

করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে। সংক্রমণ শুরুর ২৩৩ দিনের মাথায় করোনা ...

মানুষকে মাস্ক পরাবে কে?

২৬ অক্টোবর ২০২০

নো মাস্ক নো সার্ভিস

২৬ অক্টোবর ২০২০

মাস্ক না পরলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সেবা মিলবে না। এমনই নির্দেশনা দিয়েছে ...

পহেলা নভেম্বর থেকে সবার জন্য খুলছে ওমরাহ’র দরজা

২৬ অক্টোবর ২০২০

আগামী ১লা নভেম্বর থেকে ওমরাহ পালন করতে পারবেন বিশ্বের সকল দেশের মুসল্লিরা। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা ...

অনশন ভাঙালেন মেয়র আরিফ

রায়হানের মায়ের কান্না

২৬ অক্টোবর ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত