গণধর্ষণের নেপথ্যে

ড. মাহফুজ পারভেজ

শেষের পাতা ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৯

একটি মাত্র কারণে এতো বড় ও নৃশংস অপরাধ ঘটেনি। নেপথ্যে রয়েছে আরো অনেক কার্যকারণ। সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে পালাক্রমে গণধর্ষণের ঘটনাটি আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক অনেকগুলো কারণের ফলে সৃষ্ট একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
অপরাধটি মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। কিংবা সিলেটে ঘটেছে এমনও নয়। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই ধর্ষণ, গণধর্ষণের মতো অপরাধ প্রায় প্রতিদিনই সংঘটিত হচ্ছে। ধর্ষিতা হিসেবে যেমন শিশু, কিশোর, বয়েসী মহিলাকে ভিকটিম হতে দেখা যাচ্ছে, ধর্ষক হিসেবেও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন বয়স ও পেশার লোকজনকে। চাঞ্চল্যকর গণধর্ষণের অপরাধীচক্র কতো পাওয়ারফুল ছিল, সেটা তো ঘটনার ধারাক্রম থেকেই প্রমাণ হয়। প্রকাশ্যে গাড়ির ভেতরে গণধর্ষণ করলো তারা।
একজন দুইজন নয়, আট দশজন শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি প্রতিষ্ঠানে স্বামীকে আটক করে নির্ভয়ে ও পালাক্রমে গণধর্ষণের বর্বর উল্লাস করলো, কেউ কিছুই বলার সাহস পেলো।
অপরাধীদের ক্ষমতার গভীরতা টের পাওয়া যায় মিডিয়ায় প্রকাশিত অধ্যাপক সালেহ আহমেদ, অধ্যক্ষ, এমসি কলেজ-এর বক্তব্যে: ‘আপনি সারা বাংলাদেশের অবস্থা দেখছেন, আমাদের সমাজের অবস্থা দেখছেন। আমরা কী করতে পারি বলেন। আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা। এগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয়, অনেক কিছু আছে যেগুলো বিচারিক আদালতের বিষয়, যেটা সরকারের বিষয়, সরকারি যে বিভিন্ন সংস্থা আছে তাদের বিষয়।  আপনি আমার দিকটাও বোঝেন, আমার কী সীমাবদ্ধতা, আমি কতোটা অসহায়। একটা কলেজের অধ্যক্ষকে ধরে পানিতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে আপনার মাধ্যমেই আমরা খবর পাই, টিভিতে দেখি। আমাদের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করেন।’
এই প্রবল ক্ষমতাধর ধর্ষক কারা? ছাত্র। বয়সে তরুণ-যুবক। এখন বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ২৫-৪০ বয়সের মানুষ সর্বাধিক। এই তরুণ-যুবকগণ, যতো না পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জনে ইচ্ছুক, তার চেয়ে বেশি বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ ও কনজিউমারিজম ভিত্তিক  সংস্কৃতি দেখে দেখে ভোগপ্রবণ বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মহীবুল আজিজ আমাকে বলেছেন, তাদের যোগ্যতা থাক বা না থাক, তাদের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে উচ্চাকাঙ্খা তৈরি হয়েছে। ফলে তারা রাজনীতির ছত্রছায়া গ্রহণ বা অপরাধ করে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা হাসিলের জন্য। এই অপরাধীদের সঙ্গে রাজনীতি, আদর্শ, দর্শন, মূল্যবোধ, চেতনা ও কমিটমেন্টের কোনো সম্পর্ক নেই। এরাই সময়ে সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের হীন স্বার্থে ও ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে দল বদলায়। দলের অসৎ ও কুচক্রী রাজনীতিবিদগণ সংখ্যায় নগণ্য হলেও ক্ষমতাবান হয়ে উঠছেন। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত বা দলগত স্বার্থে এই তরুণ-যুবকদের কাজে লাগান। এরাই তাদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে তরুণ-যুবকদের বিপথগামী করেন। তরুণ-যুবকরাও ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে মাদক, ধর্ষণ বা অর্থ উপার্জনে লিপ্ত হয়। ফলে ক্ষমতা ও রাজনীতির আড়ালে একটি অপরাধচক্র প্রতিষ্ঠা পায়। তারা নৃশংস অপকর্ম করতেও পিছপা হয় না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক সাবেক সহকর্মী, বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পীস স্টাডিজ ও রাজনীতি বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞানের প্রফেসর ড. হেলাল মহিউদ্দিনের সঙ্গেও গণধর্ষণ সমস্যা নিয়ে কথা বলি। এই তরুণ সমাজ বিজ্ঞানী মনে করেন, সরকারে থাকা দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের একাংশ ছাত্র না হয়ে গুণ্ডা হয়, ধর্ষক হয়, ডাকাত হয়। কেন হয়? পেশির কারণে। পেশি বা ইংরেজি ‘মাসল’ মানে শুধুই কি গায়ের জোর? না, মোটেও তা নয়। এই ‘মাসল’-এর অর্থ ক্ষমতার জোর। দল ক্ষমতায়, ফলে ‘যা ইচ্ছে তাই করে পার পেয়ে যাওয়া যাবে’ বিশ্বাসের জোর। সিনিয়র নেতারা যারা ছাত্রদের স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাদের আস্কারা ও মদদের জোর। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরব থাকার জোর।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা ধর্ষণ নামক অপরাধ কর্মের সঙ্গে পাশবিকতা ও কামপ্রবণতার সম্পর্ক পেয়েছেন, যার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা, যেমন আর্থিক, সামাজিক, শারীরিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাও জড়িত। বিশেষ করে, গণধর্ষণকাণ্ডে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও বিশেষভাবে দায়ী। সিলেটে গৃহবধূকে গণধর্ষণের অপরাধের নেপথ্যে কাজ করেছে এমনই বহুবিধ  কারণ।
সিলেট একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ এবং এমসি কলেজ একটি স্বনামধন্য প্রাচীন প্রতিষ্ঠান। সেখানে আবাসিক হল দখল করে একটি নির্দিষ্ট কক্ষকে অপরাধের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা কেমন করে সম্ভব হলো? জায়গাটি তো আকাশ থেকে পতিত হয়নি। কলেজ কর্তৃপক্ষ ছিল, আশেপাশে সমাজের মানুষজন ছিলেন এবং পুরো শহরের মতো ঐ জায়গাটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে থাকার কথা নয়। সবাই যে সেখানকার অপরাধচক্র সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন, সে কথাও বলতে হবে। যদি সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগেভাগে সতর্ক হতেন ও প্রতিরোধ করতেন, তাহলে এমন অপরাধচক্রই গড়ে উঠতে পারতো না এবং এহেন নৃশংস গণধর্ষণের ঘটনা ঘটাও সম্ভব ছিল না।
ফলে অপরাধীদের ধরা ও শায়েস্তা করার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অপরাধ হওয়ার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি ঠেকানোর উদ্যোগ গ্রহণ করাও অতীব জরুরি। সেটা শুধু সিলেটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, দেশের সব জায়গার জন্যই দরকার। অপরাধ হওয়ার পর উত্তেজনা ও স্পর্শকাতরতা সৃষ্টির প্রবণতায় শরিক না হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে বর্জন করতে হবে, যে কর্তৃপক্ষের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, পরিবার থেকে সকলেই।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

MUNNA

২০২০-০৯-২৯ ১৬:২৫:৫৯

direct crossfire ok

Muhammad Hasanuzzama

২০২০-০৯-২৮ ১৯:৩৬:০৮

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নৈতিক অবস্থান এতটাই নষ্ট ও নাজুক এবং তাদের অভিলাষ এতটাই কুৎসিত যে, তারা এসব পশুকে শুধু বাড়তেই সাহায্য করে। মূলত এদেরকে আগে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

মোঃ জহিরুল ইসলাম

২০২০-০৯-২৮ ১৮:০২:২৭

দলে যতদিন নৈতিকতাবোধ জাগ্রত না হবে, ততদিন অন্যায় অপরাধ চলতেই থাকবে।

Mahmudul Hassan

২০২০-০৯-২৮ ২৩:২৪:৫৩

জনাব শুভ্র প্রকাশ হালদার, আপনাদের মতো মানসিকতার লোকজনের জন্য দেশের এ অবস্থা। আপনার কথা অনুযায়ী যারা ধর্ষন করলো তাদের কোনো দোষ নেই একথাটি কিভাবে বলেন? যারা এই জঘন্য কাজটা করেছে বা করছে তারা তো প্রাপ্ত বয়স্ক তাইনা? তাদের ভালো খারাপ ন্যায় অন্যায় বোঝার ক্ষমতা আছে। একজন স্কুলের ছাত্র এবং একজন ইউনিভার্সিটির বা কলেজের ছাত্রকে যদি একই কাতারে ফেলেন তাহলে এদেশের জন্য সত্যি করুনা হয়। তবে একটা কথা ঠিক এদের সাথে সাথে যারা এদেরকে তৈরী করছে তারাও একই দোষে দোষী।

based biplob

২০২০-০৯-২৮ ১৭:৩২:১১

YES OPEN FIRE

rassel

২০২০-০৯-২৮ ১৪:৪৬:৪৩

no sound. open fire

ফয়সাল

২০২০-০৯-২৮ ১০:৫৭:০৬

মাদক ব্যবসাীদের মত সিলেটের ধর্ষক্রকদেরকে সফায়ার দেয়া হওক । তাহলে আমাদের মত সাধারন মানুষ খুশি হবো । তা না হলে আইনের ফাক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবে ওরা ।

syed harun

২০২০-০৯-২৮ ১০:৫৬:১১

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদন করব ঐসকল মানুষরূপী জানোয়ারদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি দিন। বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচান।

Nazrul Islam Bhuiyan

২০২০-০৯-২৮ ০৪:৩২:৪০

বাংলাদেশ এখন প্রয়োজন সমস্ত কচুরিপানা দলগুলোকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মূল দল এবং যুবদল এই দুটো দল রাখা বাকি সব গুলোকে নিষিদ্ধ করতে হবে I এরা দল এবং দেশের কি উপকার করছে তার প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের অনুধাবন করা উচিত I ছোট্ট একটা দেশে এত রাজনীতির হিসাব-নিকাশ কেন ?উন্নয়ন চাই রাজনীতি না I

শুভ্র প্রকাশ হালদার

২০২০-০৯-২৭ ১১:২৯:৩০

ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার যুবসমাজকে দোষ দেবেন না। যদি দোষ দিতে চান তাহলে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের কাছে কৈফিয়ৎ চান। করোনাকালীন সময়ে ছাত্রাবাস খোলা। অধ্যক্ষ কি করেছেন?? নিজের চেয়ার টিকিয়ে রাখার জন্য সন্ত্রাসী নামধারী কিছু ধর্ষণকারী ছাত্রদের ছাত্রাবাসে থাকতে দিয়েছেন?? স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতিবিদদের লজ্জা পাওয়া উচিত। কিভাবে কতগুলি মানুষরুপি জানোয়ার আমাদের ভালোবাসার ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক দলের ব্যানার ব্যবহার করার সুযোগ পায়?? কলেজ সংলগ্ন স্থানীয় পর্যায়ের সিলেটের রাজনীতিবিদদের নিকট এই প্রশ্ন থাকলো। কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি বলেন তারা জানতেন না যে হোস্টেল খোলা আছে তাহলে স্পষ্ট বলা যায় যে তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেশিরভাগ মাস্টার্স লেভেল এর সরকারি কলেজে এরকম সন্ত্রাসীদের কেউই কিছু বলেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদন করব ঐসকল মানুষরূপী জানোয়ারদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি দিন। বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচান।

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন

বিতর্কমুক্ত থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ

২৪ অক্টোবর ২০২০

পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েতি এমপি’র সাক্ষ্য

২৪ অক্টোবর ২০২০

কুয়েতে মানব পাচার ও অবৈধভাবে মুদ্রা পাচারের অভিযোগে আটক বাংলাদেশি এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের ...

বাংলাদেশকে ১০০টি ভেন্টিলেটর পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

২৪ অক্টোবর ২০২০

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সহায়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ১০০টি ভেন্টিলেটর পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ...

সাশ্রয়ী বেসিক সংযোগ আনলো আকাশ ডিটিএইচ

২৪ অক্টোবর ২০২০

টেলিভিশন দর্শকদের জন্য সাশ্রয়ী ‘আকাশ বেসিক’ সংযোগ নিয়ে এসেছে বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স। বিশেষভাবে তৈরি সেট টপ ...

সলিমুল্লাহ এতিমখানা

আড়াই বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি হাইকোর্টের রায়

২৪ অক্টোবর ২০২০

গডফাদাররা অধরা

মাদক ব্যবসার লাগাম টানা যাচ্ছে না

২৩ অক্টোবর ২০২০

সড়ক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী

চালকদের ডোপ টেস্টের পরামর্শ

২৩ অক্টোবর ২০২০

মার্কিন নির্বাচন

আজ শেষ বাহাস

২৩ অক্টোবর ২০২০

যুদ্ধাপরাধী কায়সারের মৃত্যু পরোয়ানা জারি

২৩ অক্টোবর ২০২০

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতা এবং তখনকার মুসলিম লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের ...



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত



আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন

বিতর্কমুক্ত থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ