পর্যবেক্ষণ

ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রক্রিয়া

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

মত-মতান্তর ২০ আগস্ট ২০২০, বৃহস্পতিবার

গত ৪ আগস্ট ব্যাপক মাত্রার একটা বিস্ফোরণে লেবাননের রাজধানী বৈরুত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২৭৫০ টন অতি বিস্ফোরক কেমিক্যাল বিস্ফোরণে ২২০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। ৬ হাজার মানুষ আহত ,তিন লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতা আর শব্দ তরঙ্গের তীব্রতায় নগরজুড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বহু ভবন। ২০০ কিলোমিটার দূরে গ্রিসে কম্পন অনুভূত হয়েছে। লেবানন গত কয়েক দশক ধরে অনেক ধরনের বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে, আগ্রাসনের শিকারও হয়েছে।
আল জাজিরা তার বিশ্লেষণে বলেছে, এই শহর তার পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে সাতবার ধ্বংস ও পুননির্মিত হয়েছে। অতীতে এ নগরের উপর যত যুদ্ধ আগ্রাসন বা ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা ঘটেছে সাম্প্রতিকতম বিপর্যয় এগুলো সব ছাপিয়ে গেছে ।
এর কারণ সম্ভবত এটি বাইরের কোন বৈরী শক্তি বা প্রাকৃতিক ঘটনার ফল নয়।
নিজ দেশের ক্ষমতাসীন অভিজাতদের ডেকে আনা বিপর্যয় এটি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় শক্তির গভীরে যে দুর্নীতি অদক্ষতা ও অবহেলার শিকড় গেড়ে বসেছে এটা তারই সর্বশেষ রক্তক্ষয়ী,বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ফলাফল।
বৈরুতে ৪ আগস্ট যা ঘটেছে অবহেলা, অযোগ্যতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজধানীকে ধ্বংস ও জনগণকে মেরে ফেলে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সরকারের অপচেষ্টার নামান্তর।

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরণের পর জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণে লেবানন উত্তাল। বৈরুত এখন বিস্ফোরণে ধ্বংপ্রাপ্ত এবং জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণে রণক্ষেত্র। জরুরি অবস্থা জারি করে এবং সরকার পতনের পরও জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারেনি।
একসময় যে দেশটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস সেখানে এখন মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ লোক গৃহহীন। লেবাননের বৈভব ও ঐশ্বর্যের ঝিলিক গৃহযুদ্ধ ,দুর্নীতি ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের বাইরে আরেক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিভাজনের রাজনীতি লেবাননকে ধ্বংসের মুখোমুখি করেছে। জনগণ আরব বসন্তের মতো স্লোগান দিয়েছে ক্ষমতাসীনদের পতন চায়। এখন বিক্ষোভকারী জনগণ সমঝোতা ভিত্তিক ক্ষমতা ভাগাভাগি ও বিদেশী হস্তক্ষেপের অবসান চাইছে। কিন্তু বহুদিন ধরেই আভ্যন্তরীণ রাজনীতির দুর্বলতার কারণে আমেরিকা ইসরাইল এবং ইরান লেবাননের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। লেবানন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বলির পাঠা হয়ে নামকাওয়াস্তে টিকে আছে। পশ্চিমা বিশ্বের ভূ-রাজনীতি লেবাননকে রাজনৈতিকভাবে ছিন্নভিন্ন করে রেখেছে। সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে থাকা দলগুলো ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারের জন্য গড়ে তুলছে নিজস্ব মিলিশিয়া বা সশস্ত্র বাহিনী। পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ ,ইসরাইলের নিরাপত্তা, মিশর সিরিয়া সৌদি আরবের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সব মিলিয়ে লেবানন এখন কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এখন বিদেশি প্রভাব সরিয়ে নিলে ভিতরে ভিতরে আরো বড় ধ্বসের আশঙ্কা করছে। পৃষ্ঠপোষক দেশগুলো যদি সরে যায় তাহলে আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ হবে। বিক্ষোভকারী জনগণের আক্রোশ উপশম হবে না আরো বেড়ে যাবে। অতএব লেবানন সংকটের আপৎকালীন সমাধান নাই বরং ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাই উজ্জল।
আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং বাইরের শক্তির লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে একটি রাষ্ট্রকে কিভাবে মীমাংসাহীন অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয় তার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে লেবানন।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জনগণের অবস্থান, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দুর্নীতি, অদক্ষতার সমাবেশ ও আঞ্চলিক শক্তির কৌশল নিয়ে গভীর পর্যালোচনা দরকার।
বাংলাদেশের ব্যাপক দুর্নীতি নিয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে অপশাসন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই বিপন্ন করে দিচ্ছে। হত্যা, গুম, নিপীড়ন, নির্যাতন কার প্রয়োজনে কিভাবে সংঘটিত হচ্ছে তা জানার প্রয়োজনও রাষ্ট্র উপলব্ধি করতে পারছে না । একজন শিক্ষিত আদর্শবান যুবক সরকারি চাকরিতে যোগদান করার পর বেআইনি কাজে কিভাবে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, কিভাবে দিনের পর দিন মানুষ খুন করার কলাকৌশল রপ্ত করে যাচ্ছে, কিভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার পর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে এটি নিয়ে আমাদের পর্যালোচনা নাই। কোন মূল্যায়ণ নাই। যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য’র জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার কর্তব্য সে তার কর্তব্য অস্বিকার করে খুনে জড়িত হচ্ছে বা একজনকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সুবিধা আদায় করছে। আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করছি বিচারের সম্মুখীন করছি এতে কি মূল সমস্যার সমাধান হবে? প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদবি অর্জনকারী সচিব যদি ভুয়া মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট দিতে পারে, রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী কেউ যদি প্রকাশ্যে রাস্তায় কোন পুলিশকে কান ধরে উঠবস করিয়ে শাস্তি দিতে পারে সেখানে আইনের শাসন মানবিক মর্যাদা ন্যায়বিচার কতটুকু দুরূহ সে সম্পর্কে আমাদের কোন পর্যালোচনা নাই।

আমরা কি রাষ্ট্রের যথাযথ কর্তব্য(duties of right) সম্পাদন করার জন্য নৈতিকতার উপর কখনো কোনো গুরুত্ব আরোপ করেছি? কর্তব্য অনুযায়ী কাজ করা এবং কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করা এসব কি আমরা প্রাধান্য দিয়েছি! নৈতিকতা কি, নৈতিকতা বলতে কি বুঝায় নৈতিকতার উৎস কি এসব প্রশ্নের দার্শনিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা আমরা কোনদিন উপলব্ধি করেছি? নৈতিকতার সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি অবিচ্ছিন্ন ভাবে জড়িত। অর্থাৎ আত্মনিয়ন্ত্রণের ও ইচ্ছা স্বাধীনতার উপর নৈতিকতার কাঠামো স্থাপিত। বাংলাদেশের সংবিধানকে নৈতিক ভাবে পালন না করার কারণে এখন সংবিধান বিদ্যমান আছে কিন্তু সংবিধানিক কোন শাসন নেই । ফলে সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, সংসদ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ,কর্মবিভাগ সবার দায়িত্ব কর্তব্য নির্ধারণ করা আছে কিন্তু রাষ্ট্রে তার প্রয়োগ নাই।
দার্শনিক কান্ট তাঁর নীতি দর্শনে বলেছেন, স্বাধীনতা নামক যে নীতির উপর নৈতিকতার ভিত্তি স্থাপিত সেই প্রত্যয় যদি অলীক যুক্তিহীন প্রত্যয়ে পর্যবসিত হয় তাহলে স্বাধীনতার মৃত্যুর সঙ্গে নৈতিকতার মৃত্যু ঘোষিত হতে বাধ্য। মানুষের চেতনায় নৈতিকতার যে প্রত্যয় বিদ্যমান কান্ট সে প্রত্যয়কে অস্বীকার করেননি বরং তাকে মূলধন করে তিনি স্বাধীনতার অনুসন্ধানে অগ্রসর হয়েছেন। কর্তব্যবোধ ও কর্তব্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার মাধ্যমেই নৈতিকতা। অতএব নৈতিকতার ভিত্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ স্বাধীনতা।

বাংলাদেশ রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া ভয়ঙ্কর। ফলে পরাশক্তিগুলোর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের যে সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে তা তা যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে আমরাও পরাশক্তির কুরুক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পরবো। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরাও যে পরাশক্তির বলির পাঠা হতে পারি এ বিষয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব খুব সচেতন বলে মনে হয়না।
লেবাননে কয়েক হাজার টন অতি বিস্ফোরক সাত বছর ধরে গুদামজাত করার পরও রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের দেশেও জনস্বার্থে নজরদারি শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। একজন থানার ওসি ১৫০ মানুষ খুন করছে, কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোন নজরদারিতে ছিলনা। যেমন ছিল না পাপিয়া, সাহেদ করিমদের বেলায়। সারা দেশের জনগণ কতবার অভিযোগ করছে বিনা অপরাধে বা গায়েবি মামলা দিয়ে জনগণকে হয়রানি করা হচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্র জনগণের অভিযোগ আমলে নেয়নি। বাংলাদেশের মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেছেন আমরা স্বীকার করছি প্রকল্পের টাকার অপচয় হয়, কিছু ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। জনগণের অর্থ নিয়ে নয়ছয় নয়। প্রকল্পের জুম মিটিং এ খাবারের খরচ হয় আমরা এখন সেই রাষ্ট্রের বাসিন্দা।
নাগরিকদের স্বার্থ ইচ্ছা সংকল্প বা অধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র পদক্ষেপ নেয় না। সুতরাং রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রকাঠামো কোনটাই এখন আর গণমুখী নয়। প্রশাসনকে দলীয়করণ এর কারণে অদক্ষতা ও দুর্নীতি নির্ভরতা জনস্বার্থে বা শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় নিয়মতান্ত্রিক কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্র নাগরিকদের উপর বল প্রয়োগ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুগত রাখার পদানত রাখার শাসকের সংস্কৃতিই সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিস্তার লাভ করে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের স্বপক্ষে, আইন এর স্বপক্ষে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। অন্যায় অবিচার অপশাসন রক্তপ্রবাহের মত সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। জনগণ ক্রমাগত রাষ্ট্রের নৈতিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে উদাসীন হতে থাকে।

লেবাননে এখন কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাই। সবকিছু ভেঙে পড়েছে।দেশের অর্থনীতি নাজুক। বিদেশি সাহায্য দিলেও দুর্যোগ মোকাবেলা সম্ভব হবে না। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম উদাহরণ লেবানন।
গতবছর অক্টোবরে গণ বিস্ফোরণের মুখে পতন ঘটে একটি সরকারের আর এই বিস্ফোরণের পর আবার আরেকটি সরকারের পতন ঘটল। পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এ দেশে দুর্নীতি বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ। তিনি মন্তব্য করেছেন একমাত্র ঈশ্বর পারেন এ দেশকে বাঁচাতে।

রাষ্ট্রীয় রাজনীতি যদি অপশাসন কেন্দ্রিক হয়, দুর্নীতি নির্ভর হয়, বলপ্রয়োগ কেন্দ্রিক হয় সর্বোপরি গণ বিরোধী হয় তাহলে একদিন সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন ঈশ্বর ছাড়া দেশ বাঁচানোর সমস্ত সক্ষমতা হারিয়ে যায়। ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রক্রিয়া এই ভাবে শুরু হয়।

লেবানন থেকে বাংলাদেশ যদি শিক্ষা নিতে পারে তা হবে আমাদের জন্য আশীর্বাদ।

লেখক: গীতিকার
[email protected]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

রাতের পাখি

২০২০-০৮-২০ ০৪:০৫:৫৯

আমাদের রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বাকি কিছু আছে? 'ঠ্যালা ঠেলির ঘর খোদায় রক্ষা কর' এটা আমাদের গ্ৰামীন প্রবাদ।বলির পাঁঠা আমরা আম জনতা। আপনার কথা শুনার লোক কি দেশে আছে? দেশটা জঙ্গলে ভরে গেছে।আগাছা মুক্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ আপাতত নাই। তাই দুলকি চালে চলুক দেশ। সোনার বাংলাদেশ।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তাব

আলোচনায় ডিজিটাল বৈষম্য ও ঝুঁকি

১৮ অক্টোবর ২০২০

শামলাপুর চেকপোস্ট থেকে বন্দরবাজার ফাঁড়ি

প্রদীপ-আকবর একই সুতোয় গাঁথা

১৬ অক্টোবর ২০২০

ইজ্জত লুট

১০ অক্টোবর ২০২০

ধর্ষকের আত্মকথা

১০ অক্টোবর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত