বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অন্য এক বাংলাদেশ দেখতাম

মো. ফজলে রাব্বী মিয়া

প্রথম পাতা ১৫ আগস্ট ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩৫

১৫ই আগস্টের গভীর ষড়যন্ত্র মূল্যায়ন করতে হলে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট থেকে শুরু করা প্রয়োজন। ওইদিন পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত ছিল। এক পাকিস্তান থেকে আরেক পাকিস্তানের মাঝে দূরত্ব কয়েক হাজার মাইল। সুতরাং এই দুই প্রান্তকে নিয়ে একটি দেশ অভাবনীয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের স্বার্থকে সুরক্ষিত করার জন্য বিদেশিদেরকে যেকোনো ভাবে কনভিন্সড করে এ ধরনের পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি তৈরি হয়েছিলো দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টের পর পাকিস্তানে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। ওই নির্বাচনে মওলানা ভাসানী নৌকা নিয়ে জয়লাভও করেছেন।
যেভাবেই আমরা বলি না কেন ’৫৬ সালে কিন্তু পাকিস্তানের সংবিধান রচিত হয়েছিলো। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে সেই সংবিধান রদ করে ১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত এই দীর্ঘকাল সামরিক শাসন দিয়ে দেশ চালিয়েছেন। সুতরাং গণতন্ত্র বলতে যেটা বোঝায় বা ইসলামের দোহাই দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিরা গণতন্ত্র গেল, ইসলাম গেল এসব বলে যে ধোয়া তুলতো সেটা কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তারাই করেছে। গণতন্ত্রকে তো তারা দাঁড়াতেই দেয়নি। এরইমধ্যে যাতে পূর্ব পাকিস্তান যেনো পূর্ব বাংলা হতে না পারে সেজন্য শেখ মুজিবের ওপর এমন কোনো অত্যাচার নেই যেটা করা হয়নি। কিন্তু বীর বাঙালিদের কাছে পশ্চিমাদের হার মানতে হয়েছে। যেখানে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার জন্ম হয়েছিলো সেখানে কিন্তু মীরজাফরেরও জন্ম হয়েছিলো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ করবে কি করবে না- এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। লেখালেখি হয়েছে। এমনকি মওলানা ভাসানীও সেই সময় শেখ মুজিবকে সাপোর্ট করেননি। শেখ মুজিব পরবর্তীকালে যাকে বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করলেন এবং সর্বশেষ তিনি জাতির পিতা হলেন-তিনি কিন্তু ওই সময় অটল ছিলেন নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না হলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হটানো যাবে না এটা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার এই উপলব্ধির পেছনে অনেক কারণ আছে। আমি যেটুকু দেখেছি উনি পাকিস্তানের কনস্টিটিউট এসেম্বলিতে বিভিন্ন বিলের ওপর বক্তব্য রেখেছেন। আমাদের দেশে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে গণতন্ত্রমনা আর কেউ নেই, মওলানা ভাসানীকে আমরা বাদ দিয়ে চিন্তা করতে পারি না, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু এদের কেউই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। তারা চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনোদিনই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কোনো স্পৃহাও তাদের ছিল না। নেতাজি সুভাষ বসুর সঙ্গে আমাদের বঙ্গবন্ধুকে তুলনা করলে দেখা যায়- নেতাজি ভারতবাসীকে বলেছিলেন-তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদেরকে স্বাধীন ভারতবর্ষ দেবো। আর আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো তবু বাংলার মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’ এর মধ্য দিয়েই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা রেসকোর্স ময়দানে দিয়ে দিয়েছিলেন। পূর্বাপর চিন্তা করলে দেখা যায়-পশ্চিম পাকিস্তানিরা সব সময় ছিল সামরিক শাসনের পক্ষে। অপরপক্ষে বঙ্গবন্ধু যে পূর্ব বাংলার কথা চিন্তা করতেন সেটার বিরোধিতাকারী কিছু বাঙালি ওদেরকে মদত দিয়েছে। এ জন্য আগেই বলেছি- এদেশে যেমন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলারও জন্ম হয়েছে আবার মীর জাফরেরও জন্ম হয়েছে। আমি তাদেরকে মীর জাফরের ভাষায় আখ্যায়িত করতে চাই না। কারণ তারা তো রাজনীতি করতেন। তাদের চিন্তাধারা অনুযায়ী যেটা দেশের মঙ্গলের জন্য সেটা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতাটা তারা উপলব্ধি করতে পারেননি। বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ৭ই মার্চের ভাষণটি তিনি আগেও দিতে পারতেন কিন্তু তা দেননি। পূর্ব বাংলার বাঙালিদের একখানে করার সর্বোত চেষ্টা তিনি করেছেন। যখন তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন-‘এখন তাওয়া আমার গরম হইছে, রুটি দিলেই এখন ভাজা হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে গিয়ে তিনি ওই ভাষণ দেন। আসলে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এদেশে কোনো গণতন্ত্র ছিল না। ১৯৪৭ সাল থেকে যারা কোনোদিনই  গণতন্ত্র চায়নি ১৫ই আগস্ট সৃষ্টি করেছে তারাই। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করতে ১৫ই আগস্ট ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্র। পাঠ্যপুস্তকে বলা আছে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য ১৫ই আগস্ট সৃষ্টি করেছে। এই সেনারা কারা? তারা কিন্তু বাংলাদেশের সেনা সদস্য নন। তারা কিন্তু পাকিস্তানি সেনা সদস্য। তাদের রসুনের কোয়া ছিল একখানে। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তাদেরকে কখনই বাংলাদেশের সেনা সদস্য বলা যায় না। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো নয়। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে দেশাত্মবোধের প্রশিক্ষণ দেয়া আছে। বঙ্গবন্ধু প্রথম যখন আর্মিদের সামনে ভাষণ দিয়েছেন তখন তিনি বলেছিলেন-আপনারা কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নন। সুতরাং আপনাদের মানুষের সঙ্গে থেকেই কাজ করতে হবে। পুলিশদেরও একই কথা বলেছিলেন। ৩রা নভেম্বর হত্যাকাণ্ডও ছিল একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা। ১৫ই আগস্টের সৃষ্টি হঠাৎ করে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্র করেছে যে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখলে বাংলাদেশ বাঁচবে আর বাংলাদেশ বাঁচলে গণতন্ত্র স্থান করে নিতে পারবে। আর গণতন্ত্র যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে পাকিস্তানের মতো দেশে যেখানে কিছুদিন পরপরই মার্শাল ল’ হয় তখন সেটা আর হতে পারবে না। এসব কারণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। গণতন্ত্রকে বাংলার মাটি থেকে নির্বাসিত করার জন্য এবং দেশের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার জন্যই ১৫ই আগস্ট সৃষ্টি করা হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছিলো। কিন্তু কোনোটাই প্রতিষ্ঠা পায়নি। বঙ্গবন্ধু ফর এ সার্টেন পিরিয়ড বাকশাল গঠন করেছিলেন। বাংলাদেশের মাটিতে বাকশাল কায়েম করার জন্য কিন্তু তিনি বাকশাল গঠন করেননি। বিভিন্ন ধরনের অরাজকতা যেমন পাটের গুদাম পুড়িয়ে দেয়া, মাঠে এমপিদের গুলি করে হত্যা করা- এসব বন্ধ করতে সকল রাজনৈতিক দলকে একত্রিত করে একটা প্ল্যাটফরমে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। বাকশাল তার কোনো ফিলোসফি ছিল না। ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে আসলে বাকশাল গঠন করা হয়। দেশটাকে বাঁচাতে ও অরাজকতায় নিমজ্জিত না হয় সেজন্য তিনি সেদিন বাকশাল গঠন করেছিলেন। আমি নিজেও গাইবান্ধায় বাকশালের জয়েন সেক্রেটারি ছিলাম। তরুণ হিসেবে তখন আমরা তার উদ্দেশ্য কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। যাই হোক না কেন-সবুজ বিপ্লবের কাজ কিন্তু শুরু হয়েছিলো। যখন জিনিসপত্রের দাম কমা শুরু হয়েছিলো ঠিক তখনই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। তার মানে ষড়যন্ত্রকারীরা চায়নি এদেশে গণতন্ত্র কায়েম হোক। বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে আজ আমরা অন্য এক বাংলাদেশ দেখতাম। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে আমাদের অবস্থান থাকতো অনন্য এক উচ্চতায়। বঙ্গবন্ধু তো বঙ্গবন্ধুই। তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা দেখুন। করোনাভাইরাস আক্রান্তের পর পৃথিবীর কোনো দেশ যখন প্রণোদনা ঘোষণা করেনি তখন বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট দেশ, অর্থনৈতিকভাবে আমরা এখনো স্বাবলম্বী নই সেখানে তিনি কিন্তু প্রণোদনা দিয়েছেন। ফলে আমরা যে এক্সপোর্ট করতাম তার অনেক বাতিল হয়ে যেতো কিন্তু সেটা হয়নি। দূরদর্শিতাটা এখানেই। যাই হোক যুগের পর যুগ ধরে ১৫ই আগস্ট আমাদের মাঝে কালোদিন হয়ে থাকবে। এই দিনটি না হলে হয়তো বাংলাদেশ নামক দেশটির ইতিহাস হতো উন্নত দেশের ইতিহাস, উন্নত জীবনযাত্রার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাবার সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করে চলেছেন। এরইমধ্যে তিনি অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন। আশা করি নিকট অতীতে আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে প্রবেশ করবো।
লেখক: ডেপুটি স্পিকার, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

পাপের সদর দপ্তর ২০৫

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

শেখ হাসিনা-মোদি বৈঠক ডিসেম্বরে

আজ জেসিসি বৈঠক, উঠবে তিস্তা-সীমান্ত হত্যা ইস্যু

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

শাহেদের যাবজ্জীবন

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদ করিমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই ...

নির্যাতিতার জবানবন্দি

হাতে-পায়ে ধরলেও মন গলেনি ধর্ষকদের

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

শেখ হাসিনার জন্মদিন আজ

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে সাজা দিতে হবে

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনা পরীক্ষায় ধীরগতি

নতুন বিড়ম্বনায় সৌদি প্রবাসীরা

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

অপকর্মের কেন্দ্র ২০৫ নম্বর কক্ষ

কলঙ্কিত এমসি ক্যাম্পাস ধর্ষকদের ‘উল্লাস’

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

গ্রেপ্তার হয়নি অভিযুক্ত ছাত্রলীগ কর্মীরা

ক্ষোভে উত্তাল সিলেট সড়ক অবরোধ

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



নির্যাতিতার জবানবন্দি

হাতে-পায়ে ধরলেও মন গলেনি ধর্ষকদের

অপকর্মের কেন্দ্র ২০৫ নম্বর কক্ষ

কলঙ্কিত এমসি ক্যাম্পাস ধর্ষকদের ‘উল্লাস’

গ্রেপ্তার হয়নি অভিযুক্ত ছাত্রলীগ কর্মীরা

ক্ষোভে উত্তাল সিলেট সড়ক অবরোধ

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে সাজা দিতে হবে

করোনা পরীক্ষায় ধীরগতি

নতুন বিড়ম্বনায় সৌদি প্রবাসীরা