করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুচিন্তিত কৌশল আবশ্যক

ড. বদিউল আলম মজুমদার

প্রথম পাতা ৫ আগস্ট ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:০০

প্রফেসর এ বি এম আবদুল্লাহ তাঁর ‘যেভাবে চলছে তাতে সংক্রামণ কমবে না’ শিরোনামের উপ-সম্পাদকীয়তে (প্রথম আলো, ১২ই  জুলাই ২০২০) বলেছেন, ‘জনসাধারণের বড় একটি অংশ করোনা সংক্রামণের ব্যাপারে উদাসীন। তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মানেন না, মাস্ক পরেন না, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ান। সরকার এই জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে পারেনি।’ উপ-সম্পাদকীয়টিতে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও গত রোজার ঈদে সরকারের সিদ্ধান্তের নড়চড়ের কারণে দলে দলে মানুষের গ্রামে গিয়ে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ও তিনি উল্লেখ করেন। সুস্পষ্টভাবে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রামণের ভবিষ্যৎ  নিয়ন্ত্রণ ‘পুরোটাই নির্ভর করছে সরকারের কার্যক্রম আর জনসাধারণের স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর,’ যদিও জনগণের স্বাস্থ্যবিধি মানা-না মানাও বহুলাংশে সরকারের গৃহীত কৌশলের ওপর নির্ভরশীল। এসব সত্য, গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রণিধানযোগ্য কথাগুলো অকপটে বলার জন্য অধ্যাপক আবদুল্লাহকে ধন্যবাদ।

প্রথমেই জনগণের স্বাস্থ্যবিধি না মানার বিষয়টিতে আসা যাক। ঘন ঘন হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা তথা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলার মাধ্যমে সরকার জনগণকে তাদের ‘বিহেভিয়ার’ বা মজ্জাগত অভ্যাস বদলানোর কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে- মানুষের অভ্যাস বদলানো সহজসাধ্য নয়, এজন্য সুচিন্তিত ‘কমিউনিকেশন’  কর্মসূচি ও দীর্ঘসময় প্রয়োজন।
প্রয়োজন বিশেষায়িত জ্ঞান। জোর করে, পুলিশের মাধ্যমে তা বদলানো সম্ভব নয়। কারণ এটি মেনে নেয়ার নয়, মনে নেয়ার- বোধে নেয়ার বিষয়। এর জন্য সরকারের সুচিন্তিত কৌশল প্রয়োজন।  

মানুষের অভ্যাস বদলাতে হলে তাদেরকে সঠিক তথ্য দিতে হবে। অনেক সঠিক তথ্যই গণমাধ্যমের সুবাদে অবশ্য মানুষ পেয়েছে। তবে মানুষ প্রতিনিয়ত অনেক অপ ও ভুল তথ্যেরও শিকার হচ্ছে, যা তাদেরকে বিভ্রান্ত করছে। যেমন, কিছুদিন আগে  আওয়ামী ওলামা লীগসহ আরো কিছু দল প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে দাবি করেছে যে, করোনাভাইরাস সংক্রামক রোগ নয় এবং মসজিদে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাকে তারা কুফরি বলে আখ্যায়িত করে। এধরনের স্পর্শকাতর এবং ধর্মের অপব্যাখ্যামূলক অনেক বক্তব্যই প্রতিনিয়ত মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে নিরুৎসাহিত করছে। এসব প্রতিহত করার লক্ষ্যে   সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ আবশ্যক। তাই মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি না মানার অপবাদ দিয়ে আমরা অপপ্রচারের ভিকটিমদেরকেই দোষারূপ করছি।

মানুষ সরকারের কথা শুনতে হলে সরকারের সঙ্গে তাদের একটা আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকা আবশ্যক। এ জন্য সরকারকে মানুষকে আস্থায় নেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন সব তথ্য অকপটে ও কোনোরূপ লুকোচুরি ছাড়া জনগণের কাছে তুলে ধরা। উদাহরণস্বরূপ, করোনাভাইরাস প্রতিহত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল কেরালা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সহকর্মীরা মহামারির   সময়ে প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রকাশ করে জনগণকে আস্থায় নিয়েছেন। পক্ষান্তরে আমাদের কিছু নেতা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি এবং সফলতা নিয়ে অনেক মিথ্যা আশ্বাস ও দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে  জনগণকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তাদের আস্থা হারিয়েছেন।  

সরকারের জনগণের আস্থা হারানোর আরেকটি কারণ হলো স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির কথা সর্বজনবিদিত। এ ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের, তাদের পরিবারের সদস্যদের ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত দুর্বৃত্তদের  অপকর্ম ও দুর্নীতি নিয়ে বহু প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুত আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাই আজ গুরুতর অসুস্থ। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অযোগ্যতার বিষয় নিয়েও অনেক কথা রয়েছে। তবুও এগুলোর বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষত   উচ্চপদস্থদের বেলায় কোনোরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ধাপাচাপা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ব্যবহারের মাধ্যমে সমালোচনাকারীর কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টাও সরকারের জন্য আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে।    

সরকারের ওপর আস্থার সংকট ও অপ-তথ্যের ছড়াছড়ি সত্ত্বেও মানুষের অভ্যাস বদলানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কমিউনিটি পর্যায়ে, জনগণকে সম্পৃক্ত করে এবং তাদের মালিকানায়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তাদেরকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাধ্য করার পরিবর্তে উদ্বুদ্ধ করা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ তাঁর সাম্প্রতিক ‘একটু বুঝান, গ্রামের মানুষও মাস্ক পরবে,’ (প্রথম আলো, ১৩ই জুলাই ২০২০) শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয়তে তার নিজের গ্রামে এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্টের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা পরিচালিত ‘করোনাভাইরাস সহনীয় গ্রামে’ এমন সফলতার তথ্য তুলে ধরেন। প্রসঙ্গত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও করোনাভাইরাসের মহামারি থেকে উত্তরণের জন্য মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন ও কমিউনিটির সম্পৃক্তকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।  

করোনাভাইরাস প্রতিহত করার ব্যাপারে সরকারের কৌশল নিয়ে আরো অনেক গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, মার্চ মাসে বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে না রাখা, ঢাকা-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের মতো কিছু হটস্পটে এটি নিয়ন্ত্রণ না করা এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে করোনাভাইরাসের ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ ঘটেছে; এটি এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব এড়ানো যেত একটি সুচিন্তিত কর্মকৌশলের মাধ্যমে। করোনাভাইরাসের সৃষ্ট একটি ভয়ানক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন  বহুমুখী বিশেষজ্ঞ জ্ঞান। এর জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা বিজ্ঞান, অর্থনীতি, কমিউনিকেশন, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। এ জন্য প্রয়োজন ছিল এ ধরনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। বরং আমরা শুনেছি যে, কারিগরি সহায়তার জন্য সরকার একটি-দুটি নয়, ৪৩টি কমিটি গঠন করছে। এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে, কারণ এসব কারিগরি কমিটির অনেক সদস্যকেই এখন  অভিযোগ করতে শোনা যায় যে, সরকার তাঁদের সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে না। যেমন বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ সত্ত্বেও সরকার  এন্টিজেন টেস্টের অনুমতি দিচ্ছে না, বরং নমুনা পরীক্ষার পরিমাণই কমিয়ে দিয়েছে। কোন যুক্তিতে সরকার নমুনা পরীক্ষা কমিয়ে দিলো তাও অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়।

করোনাভাইরাস একটি অতি সংক্রামক প্যাথোজিন। দলমত, ধর্ম-বর্ণ  নির্বিশেষে কেউই এর থেকে নিরাপদ নয়। ‘উই আর অল ইট টুগেদার’- আমরা সবাই এর ঝুঁকিতে আছি। তাই সবাইকে নিয়েই এর বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল। আর এটি এত বড় একটি দুর্যোগ যে, শুধু সরকারের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি  সংস্থা ও রাজনৈতিক শক্তি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। যে সব দেশ সফলভাবে কোরানাভাইরাস মোকাবিলা  করতে পেরেছে, তারা তা ঐক্যবদ্ধভাবেই করেছে। বিখ্যাত ভারতীয় বলিউড স্টার অমিতাভ বচ্চনের ভাষায় বলতে গেলে, করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করা সম্ভব, তা সম্মিলিতভাবেই সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সরকার ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করেছে।

সরকার কয়েক সপ্তাহ আগে বহু গড়িমসির পর কিছু জায়গায় লকডাউন ঘোষণা করেছে। কিন্তু লকডাউনের পর যদি সেখানে প্রত্যেকের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, ব্যাপকভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে আক্রান্তদেরকে চিহ্নিত করে তাদেরকে আইসোলেশনে রাখার এবং সংক্রামণের ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ‘কোয়ারেন্টিন’-এর ব্যবস্থা করতো তাহলে হয়তো কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যেত। কিন্তু লকডাউনের ক্ষেত্রে সরকার কতটুকু সফল সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।  

এটি সুস্পষ্ট যে, করোনাভাইরাস বিস্তারের চেইন ছিন্ন করতে সরকারের চলমান কর্মকৌশল কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে পারেনি,  যার পরিণতির কথা অধ্যাপক আবদুল্লাহ লিখেছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে অনতিবিলম্বে প্রতিটি গ্রামে এবং  মহল্লায় সম্মিলিতভাবে করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করতে জনগণের মধ্যে তাগিদ সৃষ্টি করতে হবে। জনগণ, স্থানীয়  জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটিকে এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। ১৯৭১ সালের মতো এলাকায় এলাকায় এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।  মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের কার্যকর কৌশল হাতে নিতে হবে। তাহলেই আমরা করোনাভাইরাসের দুষ্ট থাবাকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবো।  
সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Akbar Ali

২০২০-০৮-০৫ ০৬:৪৭:২২

খুব সুন্দর কথা। করোনা সম্পর্কে মানুষের আচরণকে বেপরোয়া করে তুলতে পারে, দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা লোকজনের এমন দায়িত্বহীন কথা বলা ও কাজ করা পরিহার করতে হবে। কারণ আমরা এখনও জানি না করোনা দূর্যোগের শেষ কোথায়?

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

করোনায় শনাক্ত সাড়ে ৩ লাখ ছুঁই ছুঁই

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

গত ২৪ ঘণ্টায়  করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ...

পিয়াজ সিন্ডিকেটের ১৯ প্রতিষ্ঠান নজরদারিতে

এক সপ্তাহে কয়েকশ’ কোটি টাকার বাড়তি মুনাফা

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত