রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রয়োজন হতে পারে সামরিক হস্তক্ষেপ

অ্যান্ডার্স কর

অনলাইন ২৯ জুলাই ২০২০, বুধবার, ১০:২৪ | সর্বশেষ আপডেট: ৭:১২

ইয়েল ল’ স্কুল ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বার্মায় মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে বলে প্রমাণ পায়। এরপর ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশ, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে আশ্রয় নেয়। ৪ লাখ শিশু সহ লাখ লাখ রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসার আগে বার্মিজ সামরিক বাহিনী ২০১৬ সালে গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালানোর মহাযজ্ঞ আরম্ভ করে।
এই অন্যায়ের প্রতিকার দৃশ্যত কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থনৈতিক অবরোধ বার্মাকে আরও চীনের দিকে ঘেঁষতে বাধ্য করেছে। এখন পর্যন্ত ‘স্ট্যাটাস-কো’ বা বিদ্যমান অবস্থা হলো শিবিরে শরণার্থীরা গাদাগাদি করেই থাকুক, যার জন্য প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুনতে হচ্ছে ১০০ কোটি ডলার, আর বাংলাদেশকে ৩৬০ কোটি ডলার। দায়ীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বার্মা আরও মানবাধিকার লঙ্ঘণ করে চলছে।

সামরিক বল প্রয়োগের বিষয়টিকে অবাস্তবসম্মত হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সম্ভবত এমনটা অযৌক্তিক। অতীতে সামরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গণ-হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৯ সালে যখন কসোভোর আলবেনিয়ানদের গণহত্যা প্রতিরোধে ন্যাটো সার্বিয়ার বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। ৩ মাস পর সার্বিয়া ঠিকই ১৫ লাখ আলবেনিয়ানকে ফেরত নিতে সম্মত হয়। এখনও ৪ হাজার ন্যাটো সৈন্য কসোভোয় মোতায়েন আছে, যারা এই সংঘাতে বিবাদমান উভয় পক্ষের বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষিত করে চলেছে।
বলপ্রয়োগের কারণ
আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা যদি কিছুটা হলেও বজায় রাখতে হয়, তাহলে রাষ্ট্র-পর্যায়ে অন্যায়কারীরা যারা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ভয়ানকভাবে লঙ্ঘণ করে তাদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। কোনো দেশকে যদি গণহত্যা করে পার পেতে দেয়া হয়, তাহলে অন্যরা উৎসাহী হবে। আসবে আন্তর্জাতিক বিশৃঙ্খলা। বাস্তবিকভাবে চিন্তা করলেও চীন ও ইসলামি চরমপন্থার ক্রমবর্ধমান প্রসার রোধ করাটা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের আওতায় পড়ে। বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত লাগোয়া ৩০টি শরণার্থী ক্যাম্পে অন্তরীন রোহিঙ্গারা ক্রমেই ইসলামি উগ্রবাদীদের হাতে মৌলবাদে দীক্ষিত হচ্ছে। শিবিরগুলো সফর করেছেন এমন দু’টি সূত্র এমনটা জানিয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অন্তর্ভূক্তকরণ আবার বাংলাদেশের ব্যালট বক্সে প্রভাব ফেলবে, যা হয়তো মধ্যপন্থী আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন পাল্টে যেতে পারে।
রোহিঙ্গা ভোটাধিকার দিলে তারা ইসলামপন্থী বিএনপি বা দলটির ছোট মিত্র জামায়াতে ইসলামির প্রতি সমর্থন দেবে, এমন সম্ভাবনাই বেশি। বিএনপি চীন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ। জামায়াত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট। বিএনপি ২০২৩ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জিতলে ও শরণার্থী শিবির খুলে দিলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত, যাদের দিকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের শাসনাধীন বাংলাদেশ বেশি ঝুঁকে, তাদের জন্য দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
রক্ষা করার দায়িত্ব
এশিয়ায় গণতন্ত্র সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে। কেননা, চীনের সাথে যেসব দেশই ঘনিষ্ঠ হয়, তারা গণতন্ত্র থেকে আন্তর্জাতিক ধারাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। কাছে নিয়ে যায় এমন এক বিশ্বের দিকে যেখানে চীনের স্থায়ী উত্থানের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এই দেশগুলোর একটি মানবিক দায়িত্বও রয়েছে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের শিকার মানুষকে রক্ষা করার।
যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গাদের নিরাশ করেছে, তারপরও এমন আন্তর্জাতিক অবিচারকে সঠিক পথে আনার সময় চলে যায়নি। খুব কম দেশই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ সমাজে স্বাগত জানাবে। আর বাংলাদেশ সবচেয়ে কাছের দেশ বলে দেশটির ওপরই এককভাবে সব দায় বর্তানো উচিৎ নয়। বার্মার প্রতিবাদ সত্ত্বেও, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নয়। তারা বার্মার রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী।
অতএব, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে এমন একমাত্র বাস্তবসম্মত ও মানবিক প্রতিক্রিয়া হলো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা ভূখণ্ড ও বাড়িঘর স্ব-ইচ্ছা ও মর্যাদার ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার করা।
শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করেন ও রোহিঙ্গা শিবিরে গেছেন এমন একজন সামাজিক উদ্যোক্তা স্যামিয়ের মনসুর মনে করেন, এই পূর্বশর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন যে, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় বার্মায় ফেরাতে উৎসাহিত করতে হলে ‘নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও টেকসই গৃহায়ন’ প্রয়োজন হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রোহিঙ্গাদের জোর করে রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের জন্য নির্মিত ৩টি শিবিরে ফেরত পাঠানো উচিৎ হবে না। সর্বশেষ এ ধরণের একটি শিবির চীনা একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। এসব শিবির মূলত বন্দী শিবির; রোহিঙ্গাদের গ্রাম, জীবিকা ফিরিয়ে দেয়া নয়। বরং, চীন নির্মিত শিবিরটি নির্মান করা হয়েছে পুড়িয়ে দেয়া রোহিঙ্গা গ্রামের ধ্বংসাবশেষের ওপরে।
বার্মার সময়ক্ষেপন
যদিও বার্মা মুখে বলছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায়, দেশটি প্রতি বছর মাত্র ৩৯ হাজার শরণার্থী নিতে চায়। তাদেরকে পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতেও সরকার রাজি নয়। এমনটা বলছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান যিনি আগে বার্মায় ছিলেন। এই হারে ১১ লাখ শরণার্থীর সম্পূর্ণ প্রত্যাবসন শেষ হতে কমপক্ষে ২০ বছর সময় লাগবে।
প্রত্যাবসনের জন্য কয়েক দশক লাগবে বলে যা বলা হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অগ্রহণযোগ্য হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশ আরও যৌক্তিকভাবে দাবি করেছে ২ বছরের মধ্যে শরণার্থীদের সম্পূর্ণ ফিরিয়ে নিতে হবে। ২০১৮ সালে এ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন সুফিউর। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাড়িঘর পূর্ণগঠন ও তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে প্রদর্শনযোগ্য সদিচ্ছা না থাকলে খুব কম শরণার্থীই কক্সবাজার ছেড়ে যেতে চাইবেন।
মিত্রবাহিনীর হস্তক্ষেপ
রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন যদি বার্মার সরকার অব্যাহতভাবে প্রত্যাখ্যান করে, যেমনটা এতদিন ধরে দেশটি করেছে, তাহলে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর সুরক্ষায় প্রত্যাবাসন দ্রুত সম্পন্ন করা উচিৎ।
এ ধরণের বাহিনী স্থানীয় বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরও সুরক্ষা দেবে। সামরিক বলপ্রয়োগ সবসময়ই সর্বশেষ পন্থা হওয়া উচিৎ হলেও বাকি সব সমাধান ইতিমধ্যেই প্রয়োগ করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু যথেষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়নি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও, গণহত্যার বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিয়মনীতি যেভাবে বার্মা লঙ্ঘণ করে চলেছে, তা বিবেচনায় সামরিক বলপ্রয়োগকে এখন অবশ্যই একটি যৌক্তিক বিকল্প হিসেবে দেখা উচিৎ। কসোভোর সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে রাখাইনে পুনরাবৃত্তি সম্ভব।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রয়োজন মাফিক সামরিক চাপ ধারাবাহিকভাবে বাড়াতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত বার্মা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের নিজ গ্রামে ফিরতে বাধা দিয়ে যাবে। রোহিঙ্গাদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তাদের নিজ গ্রাম বা ভূখণ্ডেই হওয়া উচিৎ, যেখানে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া যাবে। শুধুমাত্র এর মাধ্যমেই উগ্রপন্থা প্রতিরোধ হবে। ঠেকানো সম্ভব হবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে দশকের পর দশক ধরে অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। বন্ধ করা যাবে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির লঙ্ঘণ, যা কিনা বৈশ্বিক শৃঙ্খলা কাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয়।

(অ্যান্ডার্স কর, পিএইচডি হলেন কর অ্যানালিটিক্স-এর অধ্যক্ষ। তিনি জার্নাল অব পলিটিক্যাল রিস্ক-এর প্রকাশক। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় তিনি বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন, বিশেষ করে এশিয়া ইস্যুতে। তার এই নিবন্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের ডান-ঘেঁষা বলে পরিচিত ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এ প্রকাশিত হয়েছে।)

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর

স্বর্ণের দাম কমলো

১২ আগস্ট ২০২০

ওয়ালটন পণ্য কিনে মিলিয়নিয়ার হওয়ার সুযোগ বাড়লো

১২ আগস্ট ২০২০

স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ওয়ালটনের ‘মিলিয়নিয়ার ও অসংখ্য লাখপতি’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন। এর আওতায় ...



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত



ফেসবুকে না লেখার শর্তে ‘মুক্তি’

কে এই আশরাফ মাহাদী?