বাবা যেমন ...

মত-মতান্তর ২১ জুন ২০২০, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:৫২

আঙ্গুলের ডগায় চুন৷ একটু পর পর জিহ্বায় দিচ্ছেন ৷ অবিরাম পান চাবিয়ে যাচ্ছেন ৷ ঘামছেন ৷ কারণ পানে কাঁচা সুপারি আর কড়া জর্দা৷ দিনে আব্বা পান খান ত্রিশের অধিক৷ তবু একেকটা পান মুখে দিয়ে তিনি এমন তৃপ্তি পান যেন একজনম পর পান পেলেন৷ ঘাড়ে ঝুলানো গামছা৷
কাছে গিয়ে বললাম, আব্বা সমস্যা হয়ে গেছে৷
উনি পান চাবানো বাদ দিয়ে বললেন, কার সমস্যা? কি হইছে জলদি বল ৷
বললাম , আমার সমস্যা ৷
উনি ফের আয়েশ করে জিহ্বায় চুন লাগালেন ৷ যেন কোনো কিছুই হয়নি৷ পানের পিক ফেলে আরেক দফা জিহ্বায় চুন লাগিয়ে জমির আইল থেকে উঠে দাঁড়ালেন ৷
বললেন, তুই বাড়ি যা৷ আমি দেখতেছি৷
বললাম, ওরা যদি আমাকে... কথা শেষ না হতেই বললেন, আরে আমি আছিনা! আমি থাকতে ভয় কি!

বাড়ি চলে এলাম৷ বাবা আমার সামনে যে কোনো বিপদে এমন আচরণ করেন যেন আমি ঘাবড়ে না যাই৷
নিশ্চিন্তে থাকি ৷ অথচ প্রকৃৃতপক্ষে উনার উপর বেশ ধকল যায়৷ তখন বুঝতাম না৷ এখন বুঝি ৷

বাবা গোসল করছেন পুকুরে৷ শরীরে সাবান মাখছেন ৷ দৌড়ে গিয়ে বললাম, বাবা বিরাট গন্ডগোল লেগেছে ৷ অমুকে আমাকে...

বাবা পুকুরে ডুব দিতে দিতে বললেন, বাড়ি যা৷ দেখতেছি৷

অনেকদিন পর শুনেছিলাম, বাবা বেশ অনুরোধ করে আমার শত্রুপক্ষকে থামিয়েছিলেন৷
অথচ আমার সামনে এমন করেন যেন কোনো কিছুই জটিল না৷
এখন বুঝি ৷ সব বাবারাই বুঝি এমন৷ সন্তানকে মানসিক দুঃশ্চিন্তা থেকে রেহাই দিতে নিজেরা হাসিখুশি থাকার অভিনয় করেন৷ সন্তানকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে সব কিছু, সকল বিপদ নিজেদের কাধে নেন অনায়াসে৷

আরেক বাবার গল্প বলি ৷ আমার এক বন্ধুর পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল ডাক্তাররা৷
বন্ধু তার বাবাকে বলল, আব্বা ডাক্তার কি বলছে?
তিনি বললেন, আরে কিছু না৷ কয়েকদিন ওষুধ খাইলেই ঠিক হয়ে যাবি৷ বন্ধুর মুখে হাসি ফুটলো৷
পরে বন্ধুর বাবার সঙ্গে ডাক্তারের রুমে গেলাম৷ উনি ডাক্তারকে দেখা মাত্রই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন ৷
"ডাক্তার দরকার হয় আমার পা দুইখান কাটেন৷ পোলার পায়ে লাগান ৷ তবু আমার পোলারে ভাল করেন, দোহাই লাগে আপনার৷"

অবাক হলাম, এই বাবাই কিনা একটু আগে সন্তানকে অভয় দিয়ে আসলেন হাসি মুখে কিছুক্ষণ আগে!

যতদূর জানি বন্ধুর সেই বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই৷ তবে তার আগে বাড়ির ভিটে পর্যন্ত বিক্রি করেছেন ছেলের চিকিৎসায়৷ নিয়েছিলেন ভারতে৷ বন্ধুটা এখন চাকরি করে৷ পা দুটাই ভাল তার৷

শেষ করি সদ্য বাবা হওয়া এক বাবার গল্পে৷

সারারাত জেগে তিনি কাজ করেন এক কারখানায়৷
সকালে তার ছেলের ঘুম ভাঙলে ছেলেকে নিয়ে বাড়ির নিচে হাঁটেন৷ ছেলেকে আদর করেন৷ আবার ছেলেকে ঘুম পারান গান গেয়ে৷ অথচ সে বাবাটার চোখ তখনো ক্লান্ত সারারাত না ঘুমিয়ে৷ লাল টকটকে হয়ে গেছে চোখ ৷ রোজ তার এমনটাই হয়৷ তার কাছে ছেলের সুখ আগে৷

প্রতিটা সন্তান নিজের অজান্তেই হয়তো অনুভব করে - বাবার মত কেউ একজন সবসময় থাকুক যিনি যতবড় সমস্যাই হোক না কেন হাসি মুখে কাছে এসে বলবে- আরে ভয় কিসের? আমি আছি না!

আমি সব বাবাদের দেখি ৷ পরখ করি৷ অবাক হই৷ বাবারা তাদের সন্তানকে নিরাপদ রাখতে কত ত্যাগই না করেন ৷ আহা!

-ইমরান আলী

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

আহসান উল হক খান চৌধু

২০২০-০৬-২১ ২১:৪৩:০০

বাবার তুলনা বাবাই। পৃথিবীর সব বাবার মঙ্গল কামনা করছি।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ

১৫ নভেম্বর ২০২০

বাসে সিরিজ আগুন

উদ্বেগের বৃহস্পতিবার, জনমনে নানা প্রশ্ন

১৩ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status