কৃষি বাজেট: প্রকৃত অংশীদারীত্বের প্রেক্ষিত-শেষ ভালো

প্রফেসর ড. মো. সদরুল আমিন

মত-মতান্তর ১৬ জুন ২০২০, মঙ্গলবার

কেন কিভাবে ব্যয় হবে তা ভালভাবে জেনে বুঝে কোথা থেকে আয় সংগ্রহ হবে সে কাজ সম্পাদন করার হাতিয়ার এই বাজেট হল একটি ব্যয়-আয় খতিয়ান । স্থানীয় ব্যয় বুঝে জাতীয় আয়। প্রকৃত ভোক্তাজন সরকারকে বলবে আমদের জন্য এই ব্যয়টা করুন। সরকার তা যাচাই করে আয় সংগ্রহ করবে। বাজেট করার এই হলো সংক্ষিপ্ত দর্শনগত মেকানিজম। এখন আমরা দেখব এ কাজ আমরা কিভাবে সম্পাদন করছি। বর্তমান বছরের বাজেট করতে অফিস দীর্ঘসময় বন্ধ ও যৌক্তিক বিশেষজ্ঞ ইন্টারেকশন না হওয়ায় অগ্রাধিকারসহ সকল খাতের বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ করা যায়নি । কৃষি বাজেটের মূল ৪টি স্তম্ভ হল-১. কৃষক ও এলাকার চাহিদা ২. সরকারের লক্ষ্য ৩. পরিকল্পনা ৪. বাজেটকরণ।
এতে বুঝা যায় যে একটি বাজেটকরণ কাজ করার আগে প্রধান ৩টি কাজ করতে হয় যার মধ্যে প্রথমেই আসে কৃষক ও এলাকার চাহিদা যা বর্তমান করোনা বছরে করা সম্ভব হয় নি।
এজন্য বাজেটে ২টি পরিবর্তন যথা জন প্রশাসন খাতে মোটা বরাদ্দ ও কিছু থোক বরাদ্দ দেয়া ব্যতীত তেমন পরিবর্তন সাধারণ্যে দৃশ্যমান হয়নি। এই ২টি পরিবর্তন না করলে আগের বাজেট রেখে দিলেই হত। তবে জানা যায়নি এই ২টি টপ ডাউন পরিবর্তনের পক্ষে কে বা কারা সরকারকে চাপে ফেলেছিলেন। এব্যাপারটি একটু বিস্তারিত করার জন্যই এ লেখা।
এই লেখাটির রেফারেন্স হল ২টি পূর্বে প্রকাশিত লেখা। প্রথমটি ’ বাংলাদেশে কৃষি পরিকল্পনার প্রেক্ষিত, ১৭ জুন ১৯৮৯ এখনই সময়, পৃষ্ঠা ১৭-২৪ । দ্বিতীয়টি হল: স্থানীয় অংশীদারী কৃষি পরিকল্পনা কৃষি বিপ্লব আনতে পারে, ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ এখনই সময়, পৃষ্ঠা ২৭২-২৭৪। এই ২টি লেখার আপডেট সংশ্লেষণ সংযুক্ত হয়েছে দুরন্ত পাবলিকেশন এর ” গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ- নেত্রকোণার হাসি চাই না শীর্ষক ২০২০ সংকলনে। বর্তমান লেখাটির উদ্দেশ্য হল: বর্ণিত লেখা ২টির সংশ্লেষিত সার কথা ও কনক্লশনগুলো স্মরণ ও এর আলোকে বর্তমান করণীয় সিদ্ধান্ত নেয়া।
প্রথম লেখাটির সার কথা ছিল-শুরু ধর্মী নয়, শেষধর্মী পরিকল্পনা হবে, সব ভাল তার শেষ ভাল যার । কনক্লুশন ছিল- এগিকালচারাল প্ল্যানিং পারসপেকটিভ ইজ হাইলি ডিজঅরগানাইজড, আনডিসিপ্লিনড উইথ লুজলি ডিফাইনড অবজেকটিভস এনড আউটকামস। আপডেটেড স্কিলড প্ল্যানারস নিড টু বি ডেভেলপড ক্রিয়েটিং ইমপ্লিমেন্টেশন এনভায়রনমেন্ট। দেশ নিয়ে প্রায় তেত্রিশ বছর আগে বলা উপসংহারের বিষয়ে বলার সঠিকতা এখন পাঠকের বিবেচ্য। দ্বিতীয় লেখাটির শান ই নজুল ছিল- ’কৃষি ধর্ন্যা কৃষি মেধা জন্তুনাং জীবন কৃষি,-মহামুনি পরাশরের এই শ্লোক বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষির জন্য কতটুকু অভিযোজিত? বিখ্যাত পরাশর শ্লোকটি ছিল ’গ্রেইন্স কাম ফ্রম ক্রপস এন্ড ক্রপস নেভার কাম উইদাউট প্ল্যান্ড ফার্মিং, হেন্স এফর্ট শুড বি মেইড ফর এগ্রিকালচার লিভিং এভরিথিং এসাইড। শ্লোকটির বাংলা ভাবার্থ হল: মাঠশস্য থেকে দানাফসল আসে, এবং শস্য চাষ করা হলেই সেখান থেকে দানা পাওয়া যায়, তাই দানা পেতে হলে অন্য সবকিছু ব্যতিরেকে আমাদের নিজেদেরকে যথাযথভাবে শস্য চাষে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
লেখাটির মূল বার্তাটি ছিল ’ অংশীদারী কৃষি পরিকল্পনায় কৃষক অংশ নেয় তার উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে। এতে পণ্যের সঠিক উৎপাদনের হিসাব ও মূল্যায়ন হয়। কৃষির অংশীদারী কর্ম পরিকল্পনা দেশের জীবিকার স্বকীয়তা নিশ্চিত করে। দ্বিতীয় লেখাটির কনক্লুশন ছিল- লোকালাইজড প্ল্যানিং ইজ নাউ এন ইউনিভারসাল ডেভলপমেন্ট প্রসেস।
বর্তমান ২০-২১ বছরের বাজেটের কিছু অংশ তুলে ধরা যাক। একক মন্ত্রণালয় হিসাবে সর্বোচ্ছ বরাদ্দ অনুন্নয়ন জন প্রশাসন খাত-প্রায় ২০%। দ্বিতীয় সুদ পরিশোধ ১১%। এরপর সর্বমোট বরাদ্দের হিসাবে (লোন-প্রণোদনা-ভর্তুকি+ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা যোগ দিয়ে) ৮ নম্বরে কৃষি ৫.২%। গত বছরের বেতন ভাতার ইনক্রিমেন্ট ও টাকার অবমূল্যায়ন বিবেচনায় নিলে গত বছরের বাজেটের সাথে বিয়োগফল আসে। চলতি ২০-২১ কৃষি বাজেট হিসাবে মোট বরাদ্ধ ২৯,৯৮৩ কোটি টাকা (৫.২%)। ১. কৃষি ১৫,৪৩৭ কোটি টাকা। ২. কৃষি ভর্তুকি ও প্রণোদনা ৯,৫০১ কোটি টাকা। কৃষি ভর্তুকি ৯,৫০০ কোটি টাকা ৩. কৃষি খামার যন্ত্র ভর্তুকি ৩,১৯৮ কোটি টাকা। ৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের পুন:অর্থায়ন ফান্ড
(লোন প্যাকেজ) ৫,০০০ কোটি টাকা। ৫. বিদ্যমান বছরে ভর্তূকি অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা। এই বাজেটের সবচেয়ে গোঁজামিল হতে পারে বাজেটের কোন কোন আইটেম যোগ-বিয়োগ করে মোট বরাদ্দ নির্ণয় করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
বাজেট প্রকাশের এধরণের পরিসংখ্যান বিন্যাস সহজ বোধ্য নয়। তবে লোন-ভর্তূকি-প্রণোদনা-অতিরিক্ত ভর্তুকি-চক্র ফান্ড-রেভিনিউ এমনভাবে গুউটা গুউটা দেওয়া হয়েছে যে এটা সহজে কেউ ঘাটাঘাটি করবে না। তবে অনেকে এই ধারণা নিয়ে আগামীতে লোন-প্রণোদনা ছাড়া কেউ নিজের একটি পয়সাও বিনিয়োগ করার আগ্রহ দেখাবে না। এধরনের আর্থিক দৃষ্টিভংগি দেশের কৃষিতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই হলো বাজেটের ১. কৃষক ও এলাকার চাহিদা ২. সরকারের লক্ষ্য ৩. পরিকল্পনা শীর্ষক তিনটি স্তম্ভ বাদ দিয়ে সরাসরি অনুমিতি মৌখিক জেট গতির বাজেট করার শানে নজুল যা বাংলাদেশে এখন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।
সংক্ষেপে এই হলো কৃষি বাজেট নিয়ে দেশের পরিস্থিতি। এ অবস্থায় দেশের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে কৃষক সাধারণের স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন ও অংশীদারী ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান বাজেটের অরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে এতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.২%।অথচ কৃষি গ্রোথ রেট পড়ে আছে এ অর্ধেকেরও কমে। কৃষির গ্রোথ রেট কিভাবে বাড়বে তার কোন দিক নির্দেশনা বলা হয়নি। বর্তমান করোনা বছরে উদৃত্তের কবলে পড়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের ব্যাপারে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রীমহোদয় বিদেশীদের পরামর্শ দিচ্ছেন-আপনারা এদেরেকে বাংলাদেশে না পাঠিয়ে আপনাদের দেশে কৃষিকাজে লাগিয়ে দিন, অবশ্যই লাভবান হবেন। এটা ঠিক-সঠিক করতে পারলে তা হবে উত্তমের উত্তম । তাহলে নিজের দেশেও প্রায় ৩০% শ্রমিক উদৃত্ত ঠিকানা বিহীন হওয়ার পথের বেকারদের কৃষি খাতে উপযুক্ত উৎপাদনশীল কৃষি প্রোগ্রাম নিয়ে ’যদিবিহীন’ ভাবে তাদের ন্যূনতম কর্মসংস্থান করার বুদ্ধিও বাস্তবায়ন করার দায়ীত্ব গ্রহণ করুন।

লেখার শুরুতে ফিরে যাই। উল্লেখিত সার কথা ও কনক্লুশনে বলব- বাজেট শুরু ধর্মী নয়, শেষধর্মী হবে, সব ভাল তার শেষ ভাল যার । ভাল বাজেট পেঁয়াজের দাম বাড়াবে না, মৌকা বুঝে চাউলের দাম কমাবে না। কনক্লুশন ছিল- এগিকালচারাল প্ল্যানিং ..... উইথ লুজলি ডিফাইনড অবজেকটিভস এনড আউটকামস। লেখার তেত্রিশ বছর পরেও স্পষ্ট যে পেশাগত দায়ীত্ব বোধের উন্নতি ক্ষীণ। কৃষি পন্ডিত পরাশরের কৃষিকাজ এখন আমদানী এজেন্টের এলসি ফাইলে। অংশীদারীত্বের মেকানিজমে কৃষক অংশ নেয় তার উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে, আমলার লটারীতে নয়। জেট গতির অনুমিতির বাজেট উল্কার মত টপ ডাউন হয়ে ঝিলিক দিয়ে সেকেন্ডে মিলিয়ে যায়। কৃষির জগতে এগুলো চলেনা। এখনো বলা যায় কৃষির জন্য-বাজেটের জন্য- লোকালাইজড প্ল্যানিং ইজ দি ইউনিভারসাল ডেভলপমেন্ট প্রসেস। এর কোন বিকল্প নাই।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ

১৫ নভেম্বর ২০২০

বাসে সিরিজ আগুন

উদ্বেগের বৃহস্পতিবার, জনমনে নানা প্রশ্ন

১৩ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status