করোনা, কেয়া বাত!

পিয়াস সরকার

অনলাইন ৭ জুন ২০২০, রোববার, ১০:৫১ | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৫৭

করোনা আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্ব। হু হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। চীনের উহানে অচেনা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার প্রায় তিন মাস পরে ছড়ায় বাংলাদেশে। করোনার এই সময়ে চিকিৎসাসহ নানান ব্যবস্থার প্রশ্নে বাংলাদেশে নানা অসঙ্গতি ফুটে উঠছে দিনকে দিন। এরই মাঝে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু মন্তব্য নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘আমরা করোনা ভাইরাসের চেয়েও শক্তিশালী’ মন্তব্যটি নিয়ে সবথেকে বেশি সমালোচনা হতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্তের ঘোষণা আসে ৮ই মার্চ। সেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, বিশ্বে এখন চলছে করোনা ভাইরাস।
অনেক দেশই অর্থনৈতিকভাবেও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আমরা ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করছি। কোথাও যদি কোনো সমস্যা হয়, যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইনশা-আল্লাহ এই ধরণের সমস্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।

পরদিন গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকায় তিনটি হাসপাতাল আমরা রেডি করেছি। জেলা, উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টেলিভিশনে সবসময় সচেতনতামূলক বিষয় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের কারণে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এই রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, হ্যান্ডশেক করা থেকে বিরত থাকুন। হাঁচি, কাশি দেয়ার সময় হাতের বদলে বাহু ব্যবহার করুন। অহেতুক মাস্ক পরার দরকার নেই। কিন্তু সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। অনেকেই পাগল হয়ে মাস্ক কিনছে এটার দরকার নেই। শুধু যাদের সর্দি-কাশি আছে তাদের সাবধানে থাকতে হবে।

৯ই মার্চ তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সরকার করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের প্রস্তুতি অনেক ভালো। করোনা প্রতিরোধে বিমানবন্দরে সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

দেশের স্বাস্থ্যখাতকে অনেক শক্ত বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। ১০ই মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের আলোচনায় সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আজকে করোনা ভাইরাসের কারণে একটি দুঃসময় পার করছি। আমার বিশ্বাস দেশের স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসকরা অত্যান্ত শক্ত। দেশে পোলিও, ধনুষ্টংকার, কলেরা ও যক্ষ্মামুক্ত হয়েছে অনেক আগেই। সাহস ও ধৈর্য নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারলে ইনশা-আল্লাহ আমরা জয়ী হতে পারব।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন করোনা কোন মারাত্মক রোগ নয় বরং এটি সর্দি-জ্বরের মতো বলে মন্তব্য করেন। ১২ই মার্চ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পাঁচ দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক শেষে করোনা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যমকেও দায়ী করেন। তিনি বলেন, মিডিয়ার কারণে এই ইস্যুটা খুব প্যানিক তৈরি করেছে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একে মহামারী ঘোষণার কারণে হইচই হচ্ছে। লজিক্যালি দেখলে পার্সেন্টেজের হিসেবে খুব কম মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশরাই ভালো হয়ে যাচ্ছে। এটা সর্দি-জ্বরের মতো।

সেদিনই বাংলাদেশ সরকারের নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন, এই করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আমরা শতভাগ সক্ষম। আমাদের সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালগুলো করোনা-প্রতিরোধে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন কোনো ভাইরাস নিয়েই আমাদের চিন্তা নেই। কেননা জননেত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই আমরা সকল সমস্যার সমাধান খুঁজে পাব।

এই ১৩ই মার্চেই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জের কাজিপুর আরডি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক অনুষ্ঠানে বলেন, করোনা ভাইরাসে সারা দুনিয়া আক্রান্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু সরকারের সতর্ক অবস্থানের কারণে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এ রোগ ছড়ায়নি। করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব যেখানে হিমশিম খাচ্ছে তখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে দেশ এখন পর্যন্ত করোনা মুক্ত রয়েছে।

ওবায়দুল কাদের সরকারের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে আস্থা রাখুন সরকারের ওপর, আস্থা রাখুন প্রধানমন্ত্রীর ওপর। তিনি যথাসময়ে যথা সিদ্বান্ত নেবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। ১৪ই মার্চ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, আমরা একদিকে মুজিবর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছি অন্যদিকে করোনায় করণীয়  সম্পর্কে সতর্ক করার বিষয়টি দেখছি।

পরদিন ১৫ই মার্চ ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগ সম্পাদক মণ্ডলীর বৈঠকে বলেন, করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে দেশে ফেরাদের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এসব দেশ থেকে বিমানযোগে যাত্রী অবতরণ বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রয়োজনে চীনের মতো আধুনিক মানের হাসপাতাল নির্মাণের কথা বলেন। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসে চিকিৎসা কিংবা নিয়ন্ত্রণে যত টাকা প্রয়োজন হবে তা দিতে প্রস্তুত সরকার। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি চীনের মতো বিশেষ কোন হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নেয় তাতেও অর্থায়ন করা হবে। ১৮ই মার্চ অর্থমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তিনি আরও বলেন, আপনাদের আরও আশ্বস্ত করতে পারি চিকিৎসার আর্থিক সক্ষমতা আমাদের আছে।

করোনা ভাইরাস এমন কোনো শত্রু শক্তি নয় যাকে পরাজিত করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের। ২১শে মার্চ আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের বিভিন্ন উপকরণ বিতরণের সময় তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস এমন কোনো শত্রু শক্তি নয় যাকে পরাজিত করা যাবে না। আমরা করোনা ভাইরাসের চেয়ে শক্তিশালী। জাতি হিসেবেও আমরা শক্তিশালী। কাজেই ভয়কে জয় করতে হবে। এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।

এদিকে করোনা আক্রান্তের সার্বিক বিষয় জানাতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ২৯শে মার্চ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বা পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্টের সংক্ষেপিত রুপ ‘পিপিই'কে ‘পিপিপি’ উচ্চারণ করে হাস্যরসের জন্ম দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ভুল বলেও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।

৬ই এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক বৈঠকে তিনি বলেন, ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান আমাকে করা হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে। যে সমস্ত সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে সেগুলো আমাদের নলেজে নাই। কখন ফ্যাক্টরি খোলা হবে, খোলা হবে কি না, মসজিদে কিভাবে নামাজ হবে সে বিষয়ে আলোচনা হয় তা আমরা জানিনা। কখন রাস্তা খুলে দেবে বা বন্ধ করবে এসবও আমরা জানি না। স্বাস্থ্য বিষয় ছাড়া কোনো বিষয়ের আলোচনা হয়নি।

৭ই মে ওবায়দুল কাদের সরকারি বাসভবনে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও জনগণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন যা দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসকে ভয়ানক রোগ বলতে নারাজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক। ১৩ই মে মহাখালীর বিসিপিএস মিলনায়তনে চিকিৎসক ও নার্সদের যোগদান অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এটা তেমন কোন ভয়ানক রোগ বলে আমি মনে করি না। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ভালো আছে। যেখানে এই একই সময় ইউরোপে ২০/৩০ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশে সেখানে মৃত্যু ও আক্রান্ত অনেক কম। বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ হচ্ছে এই ভাইরাস প্রতিরোধে অনেকে কাজ করছেন। প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আমরা আলাদা হাসপাতাল তৈরি করেছি যেখানে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা হয়।

করোনায় আয় হারিয়ে দিশেহারা মানুষ। যখন পথে পথে তাদের অসহায়ত্ব তখন ওবায়দুল কাদের ১৬ই মে বলেন, রাজধানীতে খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী অসহায় মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের ত্রাণ দেয়া হবে।

করোনায় হাসাপাতালের বেহাল দশা ফুটে উঠছে গণমাধ্যমে। আইসিইউ, ভেন্টিলেশনের অভাব। সেইসঙ্গে চিকিৎসকদের করোনা মোকাবিলায় নানা সারঞ্জামের ঘাটতির প্রসঙ্গও উঠে আসে। তখন ৩০শে মে ধানমন্ডিতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভালো বলেই মৃত্যুহার কম। সরকারের সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই এখনো আশেপাশের দেশ ও ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার অনেক কম।

আবার বিভিন্ন হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করেন ওবায়দুল কাদের। ৫ই জুন শুক্রবার তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আমি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার অনুরোধ করছি।

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত