'এখনই বাংলাদেশে ১০% মানুষের টেস্ট করালে ত্রিশ লাখের করোনা শনাক্ত হবে'

ডাঃ গোলাম হাসনাইন সোহান, সৌদি আরব

অনলাইন ৬ জুন ২০২০, শনিবার, ১০:০৫ | সর্বশেষ আপডেট: ১০:১৫

বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু ঢাকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখের বেশি থাকতে পারে বলে দাবি করেছে ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। ঢাকার জনসংখ্যা ২ কোটিরও বেশি। তাহলে ঢাকার ৩.৭৫% মানুষ আজ করোনা আক্রান্ত।
কিন্তু আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে সে অনুযায়ী এখন টেস্ট ও আক্রান্তের গড় ২০%। তাহলে চিত্রটা ভয়াবহ হবার সম্ভাবনাই বেশী। আর এখন সবাই ঢাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। তাহলে পুরো দেশের চিত্র কেমন হতে পারে?

আচ্ছা দেখা যাক বাস্তব অবস্থাটা কি হতে পারে? গত এক মাসের তথ্য যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই-

৬ই মে ২০২০ তারিখে দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী ছিল ১১,৭১৯ জন।

৫ই জুন ২০২০ তারিখে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০,৩৯১ জনে।
তাহলে গত এক মাসে করোনা আক্রান্ত রোগী বেড়েছে ৪৮,৬৭২ জন। গড়ে প্রতিদিন ১,৬২২ জন!

যেখানে এক মাস আগে সর্বমোট টেস্ট এর সংখ্যা ছিল ৯৯,৬৪৬ টি। গতকাল পর্যন্ত টেস্ট হয়েছে ৩,৮৪,৮৬৩ টি।
তাহলে এক মাসে সর্বমোট টেস্ট হয়েছে ২,৮৫,২১৭ টি। গড়ে ৯,৫০৭ টি টেস্ট।
প্রতিদিন গড়ে ৯৫০৭ টেস্ট এর বিপরীতে আক্রান্তের সংখ্যা ১,৬২২ জন। যা গড়ে ১৭% এর মত।

এখন এক দিনের চিত্র যদি দেখি-

গতকাল (৫ই জুন ২০২০) টেস্ট হয়েছে ১৪,০৮৮ টি ও করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৮২৮ জন। যা গড়ে ২০% এর মত।
এক মাস আগে (৬ই মে ২০২০) টেস্ট হয়েছিল ৬,২৪১ টি আক্রান্ত হয়েছিল ৭৯০ জন। গড়ে ৭.৯%।

তাহলে এক মাসে টেস্ট এর বিপরীতে শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৯% থেকে ২০% এ।

তাহলে যদি আমরা এক দিনে ১,০০,০০০ টেস্ট করতে পারতাম, কমপক্ষে ২০,০০০ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা যেত। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব না। আমাদের টেস্ট এর ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু করোনা রোগ তো আর বসে নেই। করোনা তার মত করে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

অন্য একটি তথ্য নিয়ে কথা বলি।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫০ লাখ এর বেশি। তাহলে আমরা যদি দিনে ২০,০০০ করেও টেস্ট করি, দেড় কোটি টেস্ট করতে সময় লাগবে ৭৫০ দিন বা ২ বছর এর মত। (সম্পূর্ণ জনসংখ্যার ১০%)।
ততোদিন কি করোনা বসে থাকবে? প্রতিদিন ২০% হারে যদি করোনা শনাক্ত হয়, আজকেই যদি ১০% জনগণের করোনা টেস্ট করা যায় তাহলে চিত্র হবে এমন- ৩,০০০,০০০ বা ত্রিশ লাখের মত মানুষ করোনায় শনাক্ত হবে। আমরা সবাই জানি এই তথ্য, কিন্তু মানতে চাই না। ভয়ানক চিত্র তাই না?

আর আমরা শুধু ১০% জনগণ নিয়ে হিসাব করেছি। যা দেড় কোটির মত। অন্যান্য দেশে লক ডাউন ফর্মুলা মেনে চলার পরেও চিত্র ভয়াবহ। আর আমরা লক ডাউন না মেনেই কিভাবে আশা করি, আমাদের আক্রান্তের হার কমে যাবে। প্রতিদিন বাসে, রেস্টুরেন্টে, হাট বাজারে, বিভিন্ন মানুষের সমাগম, আসলে আমাদের ভয়াবহ চিত্রই স্মরণ করে দেয়।

সবাই সকল ধরনের চিকিৎসা শেয়ার করেন। বিভিন্ন মেডিসিন কোম্পানি মেডিসিনের ট্রায়াল আসার সাথে সাথেই বাণিজ্যিক আকারে নামানোর প্রস্তুতি নিয়ে নেন। মেডিসিন বাজারজাত করার জন্য মাঠে নেমে পরেন। কিন্তু আমাদের যা সর্বপ্রথম দরকার, তা হল টেস্ট, টেস্ট, টেস্ট এবং এরপর ট্রেস করা অর্থাৎ রোগ ও রোগীর সম্পর্কে পুরো হিস্ট্রি বা আক্রান্তের তথ্য নেয়া। যা প্রকৃতপক্ষেই আমাদের করোনার বিস্তার লাভ থেকে বাঁচাতে পারে। এভাবে বিশ্বের কিছু কিছু দেশ ইতিমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখেছে।

আমরা এও জানি আক্রান্তের ৮০% মানুষ এমনিতেই ভাল হয়ে যাবে (যা ১০%, দেড় কোটির ) ২৪,০০,০০০ বা চব্বিশ লাখ এর মত। বাকী ৬ লাখ মানুষ (২০%) এর মাঝে, ২৫% বা এক-চতুর্থাংশ মানুষদেরও যদি ক্রিটিকাল বা হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাদের চিকিৎসা দেবার সামর্থ্য আমাদের দেশের কি আছে? যা ১,৫০,০০০ বা দেড় লাখের মত।

এতক্ষণ আমরা যে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আলোচনা করেছি তা শুধু বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার ১০% নিয়ে। আমি বাকি ৯০% এর হিসেব পাঠকদের উপরই ছেড়ে দিলাম।

অনেকেই সব খুলে দিয়ে হার্ড ইমিউনিটির কথা বলছেন। তবে মনে রাখতে হবে হার্ড ইমিউনিটির মত ভয়ঙ্কর পদক্ষেপে যেতে হলে দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০-৮০% এর আক্রান্ত হতে হবে। যা অনেক ভয়ানক। হার্ড ইমিউনিটি এ পর্যন্ত শুধু ভ্যাকসিন বা টিকা পেয়ে এবং দিয়েই করা হয়েছে। কখনোই আক্রান্তের হার দিয়ে করা হয়নি। যত ধরণের সংক্রমিত রোগ ছিল তা টিকা বা ভ্যাক্সিনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। ৯০% জনগণকে ভ্যাক্সিনের আওতায় আনার পরে হার্ড ইমিউনিটি পাওয়ায় সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আক্রান্তদের মাধ্যমে ব্যাপারটা এখনো হাইপোথিসিস। যা আসলেই সম্ভব কিনা কখনোই প্রমাণিত হয়নি। বিভিন্ন দেশ এই হার্ড ইমিউনিটির ধারণা বাতিল করে দিয়েছে। একমাত্র আমেরিকার নিউ ইয়র্কেই সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা, তবুও তা সেখানকার জনসংখ্যার ২০% এর মত। যা ৭০-৮০% এর অনেক কম। তাছাড়া ভাইরাস এর মিউটেশন বা পরিবর্তন হয়েই চলেছে। আমাদের মত এত জনবহুল জনসংখ্যার দেশে যদি মিউটেশন এ ভাইরাস পরিবর্তিত হয়ে দুর্বল হয়ে যায় তাহলে আমাদের ভাগ্য ভাল, নইলে বিপদের সম্ভাবনা অনেক।

যারাই সংক্রমণের স্বীকার হচ্ছেন, তাদের যদি ট্রেস করতে পারা যেত, তাহলে সংক্রমণের হার অনেক কমানো সম্ভব হত। অনেকের মনে এই প্রশ্ন আসতেই পারে, এই ভাইরাসটা ছড়াচ্ছে কিভাবে? প্রথমেই বুঝতে হবে এই ভাইরাস এর ইন্টিউবিসন এর সময় ২-১৪ দিন, এর মাঝে উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। তবে সংক্রমণ বন্ধ থাকবে না। আর ভাইরাসের এক্সপোজার ছাড়া এই ভাইরাস ছড়াতে পারে না। তাহলে সংক্রমিতদের হিস্ট্রি নিলেই তা বের করা সম্ভব।

আমরা অনেক মূল্যবান জীবনের বিনিময়ে এই অবস্থায় পৌঁছেছি। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে করুণ অবস্থা, তা বর্তমান চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। তবে আশার কথা এখনো যদি শক্তভাবে হাল ধরা যায়, আমরা হয়তো, আরও অনেক মূল্যবান জীবন বাঁচাতে পারবো।
-
অনুলিখন তারিক চয়ন

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Qamrul

২০২০-০৬-০৭ ০৮:৩৫:৪১

Situation is grave.

আবদুল ওয়াদুদ

২০২০-০৬-০৬ ২৩:৪০:৫২

আপনার পরিসংখ্যানের হিসাব এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আপনি random test এর তত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে টেস্টটা selective। যাদের আলামত আছে কেবল তাদেরই টেস্ট করা হয়। কাজেই মোট টেস্টের সংখ্যার সাথে সংক্রামনের হারটা তো একটু বেশি হবেই।

আবুল কাসেম

২০২০-০৬-০৬ ১০:১২:৩৬

করোনা হলো এমন একটা ভাইরাস, যখন তার সংক্রমণের হিসাব মিলে যাবে, যার সাথে তার হিসাব মিলে যাবে সে তাকেই সংক্রমণ ঘটাবে। এখানে এপ্রশ্ন অবান্তর যে, করোনা যাকে সংক্রমণ করবে সে রাজা নাকি প্রজা। ধনী নাকি গরীব। চাকুরীজীবি নাকি ব্যবসায়ী। শিক্ষক নাকি ডাক্তার। বয়স্ক নাকি যুবক। নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে হিসাবে মিললে করোনা কাউকেই তোয়াক্কা করেনা। করোনার এই রূপ ও চরিত্র জানার পরে তাকে দমানো বা এড়ানো অসম্ভব হবে কেনো? যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুকে চিনতে পারলে, তার চরিত্র ও গতিবিধি বুঝতে পারলে তার আক্রমণ প্রতিহত করা অসম্ভব নয়। সকলেই জানেন, করোনার লক্ষ্য তার নিকটের সুস্থ কাউকে সংক্রমণ করা। এভাবে দেহ থেকে দেহান্তরে জ্যামিতিক হারে করোনার সংক্রমণ ঘটতে থাকে। তাই প্রশ্ন জাগে, বিদেশ থেকে আগতদের প্রথম দিন থেকেই দেশের মধ্যে অবস্থান করা মানুষদের নিকট থেকে আলাদা করে দূরে রাখা ছিলো যে কোনো মূল্যে অত্যাবশ্যক। সেটা শতভাগ সম্ভব হয়নি। প্রথম দিকে দু'চার জনের দেহে করোনা সনাক্তের পর ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সুস্থ ও সংক্রমিতদের একেবারে আলাদা করার প্রয়োজন ছিলো। সেটাও শতভাগ সম্ভব হয়নি। যেহেতু তার চরিত্র হলো নিকটে যাকে পাবে তাকেই সে সংক্রমিত করবে। সেহেতু, তার নিকট থেকে সুস্থ মানুষজনকে আলাদা করে দূরে রাখতে পারাটা করোনা যুদ্ধের একটা কৌশল। দ্বিতীয়ত, নির্বিশেষে সব মানুষের দ্রুত করোনা টেস্ট করার ব্যবস্থা করার প্রয়োজন ছিলো। রেপিড টেস্ট কিট এক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো। এরপর চিকিৎসার প্রয়োজনীয় যাবতীয় ব্যবস্থা করা অপরিহার্য ছিলো। উত্তাল ঊর্মিমালার মধ্যে সমুদ্রে পড়েও মানুষ খড়কুটো অবলম্বন করেও বাঁচতে চায়। আমরা উন্নয়নের মহসড়কে, একথা অবিশ্বাস্য নয়। তাহলে করোনা যুদ্ধে হেরে যেতে পারিনা। পারিনা। পারিনা।

akhtar

২০২০-০৬-০৬ ২৩:০৮:১৯

মতামতটি পর্যবেক্ষণের পর প্রকাশ করা হবে Nothing can be done and nothing will work . Bangladeshi people abandon their own parents in forrest , roadside, field if they think parent has covid-19 . Whereas attend janaja by million of some other person .

Saif

২০২০-০৬-০৬ ১০:০১:৩৯

Fabricated.

Manir

২০২০-০৬-০৬ ২২:৫৭:১৬

Thank you for country's COVID 19 projection and suggestion.

তপু

২০২০-০৬-০৬ ০৯:৪৮:৫৪

সবকিছু যে আপনার ধারণা মতো বা গণিতের হিসেবে চলবে সেটা কেন ভাবছেন?সবাই যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবে এই তত্ত্ব কোত্থেকে পেলেন? আমেরিকার নিউইয়র্কে মৃত্যুর ধ্বংসলীলা,অন্যান্য রাজ্যে কম কেন?চীনে একশ চল্লিশ কোটি মানুষ,আক্রান্ত ৮০হাজারের মতো,মৃত্যু সম্ভবত চার হাজার। আপনার হিসেবে ২০% হারে শনাক্ত ধরলে প্রায় তিন কোটি মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে গেছে,তাই না?

শরীফ

২০২০-০৬-০৬ ২২:৩৩:৩৫

অনেক দিন রুপ কাথার গল্প শুনি না । আপনি যে ভাবে বিশ্লেষন করে দেখালেন তাতে তো এত দিনে ২ লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার কথা ???

akhtar

২০২০-০৬-০৬ ২২:১৬:৩১

মতামতটি পর্যবেক্ষণের পর প্রকাশ করা হবে

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত