প্রণোদনার সীমিত অর্থের যথাযথ ব্যবহার সুনিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণশক্তি ফিরে আসবে

প্রভাস চন্দ্র দাস

মত-মতান্তর ২ জুন ২০২০, মঙ্গলবার

শতাব্দীর ভয়ংকর বৈশ্বিক মহামারীতে আমাদের জীবন ও জীবিকার দ্বিমুখী টানাপড়নে আমরা এখন বিপর্যস্ত। অব্যাহত লকডাউনের কারণে প্রায় স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মধ্য দিয়ে জীবিকার প্রয়োজনে লকডাউন কিছুটা শিথিল করায় হু-হু করে সংক্রমণ বেড়ে চলছে,যা ঠেকানো না গেলে মহাবিপর্যয় দেখা দিতে পারে। আবার এই কঠিন সঙ্কট মোকাবিলা করতে গিয়ে খাদ্য উৎপাদনের চাকা সচল রাখা না গেলে দেশে খাদ্যাভাবসহ নানা কৃত্রিম সঙ্কটের আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের লাগসই কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন এবং সঠিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাঙালির বহুকাঙ্খিত মুজিববর্ষে কোনভাবেই দুর্ভিক্ষের আঁচ লাগতে দেয়া যাবে না। দারিদ্র্য সীমার নীচে থাকা এবং সীমা পার হওয়া মিলিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন পেশায় সরাসরি সম্পৃক্ত, যাদের প্রায় সকলেই এখন কর্মহীন সময় কাটাচ্ছেন। শুরুতে নিজেদের সঞ্চিত পুঁজি দিয়ে দু-চারদিন চললেও এখন ত্রাণ সহায়তা ব্যতিরিকে দিন চলছে না তাঁদের। দেশের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে ক্ষুদ্র ঋণ সেবাগ্রহণ করে উৎপাদন এবং অনুৎপাদনশীল উভয় খাতেই বিনিয়োগ করে যথারীতি লেনদেনের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কিছুটা আলোর মুখ দেখেছিলেন।
উৎপাদনের সচল চাকার সাথে বহুমুখি ক্ষুদ্র ও এসএমই ঋণের যোগসূত্র গ্রামীণ অর্থনীতিকে বেশ চাঙ্গা করে তুলেছিল। দারিদ্র্য সীমা অতিক্রমের নানা মাপকাঠির প্রয়োগিক সুবিধা কতটুকু তাঁরা পেয়েছেন তার সঠিক হিসেব তাঁদের কাছে ছিল না কিন্ত দেশের এই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির মানুষের ৩ বেলা পেটভরে খেতে পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল, যা আজ হুমকীর মুখে পড়লো। দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী এই বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে গৃহীত ঋণের পুঁজি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পাছে ভয়, লকডাউন শিথিল বা উঠে গেলে ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাবেন কীভাবে, উপরন্তু পুঁজির অভাবে নতুন করে উৎপাদনমুখী কাজেও হাত দিতে পারবেন না। বেশিরভাগ ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে সময়ের জরুরি প্রয়োজনে সহজশর্তে প্রণোদনা দেয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে বরং আটকে যাওয়া ঋণ পুনরুদ্ধার করতে না পারলে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়বে। বৈশ্বিক বিপর্যয় মোকাবিলা করে আমাদের টিকে থাকতে হলে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনই হবে আমাদের প্রধান রক্ষাকবচ। তাই নিশ্চিত করতে হবে প্রান্তিক কৃষিজ উৎপাদকের হাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো। এজন্য দেশব্যপি ছড়িয়ে রয়েছে নির্ভরযোগ্য এসএমই ও ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষায়িত ৩টি ব্যাংক (পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক) এবং এনজিও’র প্রতিনিধিত্বকারী পিকেএসএফকে ৫০০ কোটি করে মোট ২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। যার মধ্যে ৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে এই টাকা বিতরণ করার সর্বাধিক সুযোগ রয়েছে। মাথাপিছু ন্যূন্যতম পরিমাণ ঋণ বিতরণ করলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০% উপকারভোগী এই সুফল পাবেন। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে এই আপদকালীন সময়ে বিশেষ করে কৃষিজ উৎপাদনের চাকা সচল রাখতে আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিকালে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রণোদনা’র টাকার যথাযথ ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ খেলাপীদের মধ্যে নিয়ম বহিঃর্ভূতভাবে প্রণোদনা প্রাপ্তির সুযোগ করে দিলে খাঁটি সেবাগ্রহীতাগণ বঞ্চিত হবেন। আবার ওভারলেপিং সমস্যাও সীমিত সম্পদের সুষম বন্টনে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। দক্ষ এবং সৎ ব্যবস্থাপনার অভাবে দুর্যোগ মুহূর্তে এ প্রণোদনা ঋণের সঠিক ব্যবহার সুনিশ্চিত করা না গেলে একদিকে কৃষিজ উৎপাদন সচল রাখার উদ্দেশ্য যেমন ব্যহত হতে পারে অপরদিকে সরকারি সহায়তা মনে করে সদস্যগণ ঋণ পরিশোধও বন্ধ করে দিতে পারেন, পূর্ব অভিজ্ঞতা তাই বলে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উপকারভোগীদের মধ্য থেকে ঋণপ্রাপ্তির যোগ্য সদস্য বাছাই করে (ডাটা বেজ) অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় কওে ওভারলেপিং বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শতভাগ উৎপাদনশীল কাজে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে প্রণোদনার টাকা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ এবং তদারকির মাধ্যমে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করা গেলে কোভিড-১৯ এর কারণে বিপর্যস্ত গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুনঃগতি সঞ্চার হবে।

প্রভাস চন্দ্র দাস
সিনিয়র কন্সালটেন্ট (ট্রেনিং এন্ড মনিটরিং), আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প।

আপনার মতামত দিন



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত