এরপর কি?

ইমরান আলী

মত-মতান্তর ২৫ মে ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:০০ পূর্বাহ্ন

ঈদের আগেরদিন সন্ধ্যা থেকেই সাজ সাজ রব চারিদিকে। অপেক্ষা সকালের। ছোট ছেলেমেয়েদের হইচই। পটকা ফুটানো। তাতে যোগ দেয় বড়রাও। পটকার আওয়াজে গৃহিণীরাও বেড়িয়ে আসেন বাইরে। আনন্দের ঢেউ খেলে যায় সবার চোখে মুখে। দিনমজুরের চোখে মুখে মুহূর্তের জন্য হাওয়া শত দুঃখ কষ্ট।
উপলক্ষ ঈদ। বাড়িতে ততক্ষণে পৌঁছে যায় কর্মস্থল থেকে ঈদের ছুটিতে ফেরা ছেলে মেয়েরা। সচ্ছলেরা ভিড় জমায় বড় মুদি দোকানে। ব্র্যান্ডের সেমাই, চিনি বা লাচ্ছার দিকে নজর। ঈদ কি কোন বিশেষ শ্রেণীর! মোটেও না। বাইরে খোলা স্থানে বিক্রি হওয়া সেমাই, চিনির দোকানেও ভিড় খেটে খাওয়া মানুষের। আমাদের গ্রামের সবাই নিশ্চিন্তে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঈদের জামায়াত ধরার কোন দুশ্চিন্তা নেই। মোজাম্মেল দীর্ঘ বছর ধরে ঈদ মাঠে কাজ করে  নিঃস্বার্থভাবে। নিজের সাংসারিক কাজ ফেলে মাইক নিয়ে ছুটে বেড়ায় সবার কল্যাণে। জানান দেয় কয়টায় জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে। তর সয় না তার নিজেরও। ভোর থেকেই সে মাঠে দাঁড়িয়ে মাইকে ডাকে। দেরি করবেন না। জলদি আসুন। নামাজ এখনি অনুষ্ঠিত হবে। তার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে আমাদের। মা বোনেরা সকালে সেমাই রান্না করেন। মুখে দিয়েই দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলি মাঠে। সঙ্গে প্রতিবেশীদের ঢল। চাচা, জ্যাঠাদের সঙ্গে গল্পে মশগুল হই। মাঠের কোণায় বসে ছোট ছোট দোকান। মোটা চানাচুর। পেঁয়াজু। বড়রাও ছোটদের মত আনন্দে মাতে। কিছুক্ষণ বাদে বাদে মোজাম্মেল ফের মাইকে ডাকে। এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করবেন না। নামাজ শুরু হবে এখুনি। দীর্ঘদিন প্যারালাইজড কিম্বা অসুস্থতায় ভোগা বৃদ্ধদেরকে নিয়ে আসে ঈদ মাঠে সন্তানেরা। পরনে সন্তানের দেয়া নতুন পাঞ্জাবী। ঈদ মাঠটাকে ঘিরে সবার নজর। আমাদের চাওয়া থাকে দিন যেন শেষ নাহয়। শেষ হলেইতো আনন্দ শেষ। নামাজ শেষে কবর জিয়ারত। ইতিমধ্যে স্বজন হারানোদের ভিড় জমে মাঠের পূর্বে কবরস্থানের দিকে। কবরবাসীর জন্য দোয়ায় সামিল সবাই। মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার পথ সামান্য হলেও ফিরতে সময় লাগে অনেক। এ বাড়ি ও বাড়ি ঢুঁ মারা। ভুলে যাই কে আপন কে পর। শত্রু মিত্র এক হওয়া। এ দৃশ্য শুধু কি এক গ্রামের? না। এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার পাঁচশো সত্তর বর্গকিলোমিটারের পুরো ভূখণ্ডের দৃশ্য এটি। এমন আনন্দ, এমন উৎসবে মাতে মুসল্লীগণ। মিলেমিশে থাকি। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও সামিল হয়।
কি থেকে কি হয়ে গেল! ছোট্ট একটি ভাইরাস। এ ভূখণ্ডে নিয়ে এলো নির্মম এক বাস্তবতা। তার আগে পুরো বিশ্বকেই সে কাবু করে ফেলল যেন। মৃত্যুর কাফেলাকে লম্বা করলো। থামেনি এখনো। কবে থামবে তা কেউ হলফ করে বলতে পারছেনা। গবেষণা চলে। ফল আসে। আশা দেখায়। অল্প পরেই নিরাশায় ডোবায়।
বহুল প্রতীক্ষিত ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি করতে মানা। হাত মেলানোর নেই সুযোগ।চারিদিকে কেমন যেন নিস্তব্ধতা! কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও অনেক জায়গায় মানা হচ্ছেনা। মোজাম্মলের কন্ঠটা যেন মিলিয়ে গেছে।
অনেক দেশেই চলছে লকডাউন। কোন দেশে শিথিল কিম্বা নতুন করে চালু। এদেশেও হলো তাই। কিন্তু তা যেন হ-য-ব-র-ল। কে মানছে কে মানছেনা তা নিয়ে গড়মিল। যান ও জনচলাচলে নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা গনজমায়েতে। কিন্তু কে শুনলো কার কথা! ফেরিঘাটে ভিড়। কৌশলে গ্রামে ফিরলো মানুষজন। কেউ ট্রাকে, কেউ পায়ে হেঁটে যার যার নিজ দায়িত্বে। উপায় নেই। ঢাকায় যে থাকবে খাবে কি ? কাজ কি? ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান অসংখ্য মানুষ।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত। কি হবে ঈদের পর? সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকির আশংকা তাদের মধ্যে। করোনা ছাড় দিতে নারাজ কাউকে। ইতিমধ্যে মারা গেছেন নানান পেশার মানুষ। করোনা পৌঁছে গেছে রাজদরবার থেকে অজোপাড়াগাঁয়ের উঠানেও। সাংবাদিক, পুলিশ, প্রকৌশলী, ডাক্তার, গারমেন্ট কর্মী, উচ্চ পদস্ত কোন স্তর বাদ নেই যেখানে করোনা ঢুঁ মারেনি। চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। সার্বিক দিক দিয়ে কখনো কখনো মনে হয় কোথায় যেন একটা গড়মিল। মৃত্যুর দরজা খোলা রেখে আমরা যেন চোখ বন্ধ করে ভাবছি কিছুই হবেনা। কিন্তু করোনাতো থেমে নেই। দেশে সর্বশেষ গত চব্বিশ ঘণ্টায়(গতকাল পর্যন্ত) রেকর্ড মৃত্যু ২৮ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩ হাজার ৭৩৭ জন। আর মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৮০ জনের। আজ দুপুরের পর এ সংখ্যা কততে ঠেকবে তা ভাবতে ভয় লাগে।
টেস্ট বাড়ছে। আক্রান্ত, মৃত্যু বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। দুশ্চিন্তার মাঝেই মুসল্লিগণ উদযাপন করছে পবিত্র ঈদ উল ফেতর। এ প্রতিবেদক বেড়িয়েছিলেন নামাজ পরবর্তী রাজধানীর কয়েকটি জায়গায়। চায়ের স্টলগুলোতে ভিড় জমে উঠেছে। মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই কারো। সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই।
আজকের এমন দিনে অনেকে বাড়ি গেলেও বড় অংশই যাননি বা যেতে পারেনি। থেকে গেছেন শহরে । চোখ ভারি করে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছেন ফোনে। মা’র চোখে পানি। সন্তানের চোখে পানি। এই যখন অবস্থা তখন গত রাতেও ভেসে এলো এক মহিলার করুণ সুর । তিনি বাসা বাড়িতে কাজ করতেন। কাজ হারিয়েছেন সম্প্রতি। সাহায্য চাইছেন। তার ঘরে কোন খাবার নেই। ঈদ দূরের কথা। আজকের ঈদের বিবর্ণ আনন্দ ছাপিয়ে একটাই প্রশ্ন এর পর কি হবে?

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

অধরা সুখ

২ ডিসেম্বর ২০২০

বাংলাদেশে টিকা আসবে কবে?

১ ডিসেম্বর ২০২০

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status