কোভিড-১৯ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

মো. শহিদুল ইসলাম

মত-মতান্তর ১৮ এপ্রিল ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৪৯

বর্তমানে কোভিড-১৯ সারা পৃথিবীর মাথা ব্যাথার প্রধান কারণ। এটি এখন আর একক কোনো দেশের সমস্যা নয়। চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস এখন আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সুতরাং এর সমাধানও করতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে। অতি সম্প্রতি চিকিৎসা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং নাগরিক সমাজের শীর্ষ প্রতিনিধিরা ‘A Letter to G-20 Governments’ শিরোনামে একটি চিঠি লেখে। ওই চিঠিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোভিড-১৯ সংকট মোকাবেলা, স্বাস্থ্য বিপর্যয় রোধ ও আসন্ন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় খুব দ্রুত এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের জন্য বিশ্বনেতাদের কাছে আহ্বান জানানো হয়। এটা স্পষ্ট যে, এই সংকট মোকাবেলায় সবগুলো দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
 
১৭ই এপ্রিল পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২২,৪৮,৮৬৩ জন আর মৃত্যুবরণ করেছে ১,৫৪,১৪৫ জন।
প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৯ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই রোগ দিন দিন ভয়ানক হয়ে ওঠছে। পাশাপাশি করোনার কারণে অন্যান্য স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোও উপেক্ষিত হচ্ছে, একইসাথে সমাজ ও অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে।

পৃথিবীতে যখন বড় বড় বিপর্যয়গুলো আসে তখন বিশ্বনেতারাসহ আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক জোট, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর পূর্বে সুনামি, ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মহামন্দা, ইবোলাসহ অন্যান্য মহামারি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক এ সকল প্রতিষ্ঠান ও বড় দেশগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে দেখা গেছে। বিশ্বনেতাদের কাছে লেখা সেই চিঠিতে করোনা ও এর প্রেক্ষিতে তৈরী হতে যাওয়া অর্থনৈতিক মন্দা থেকে রক্ষা পেতে ‘আন্তর্জাতিক সহায়তা’ সমন্বয়ের জন্য একটি জি- ২০ টাস্কফোর্স এবং সেই সহায়তা কার্যকর করার জন্য ‘দাতাদের সম্মেলন’ আয়োজন করার আহ্বান করা হয়।

এক দশক আগের অর্থনৈতিক মন্দা সারা পৃথিবীব্যাপী বিপর্যয় তৈরী করেছিল। কিন্তু বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মূলধনের ঘাটতি পূরণ করার মাধ্যমে সেই সময়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। তবে করোনাকে কেন্দ্র করে যে অর্থনেতিক সংকট তৈরী হচ্ছে তার সমাধানের জন্য আগে প্রয়োজন স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধান। কোনো একটি দেশে এই রোগের অবসান ঘটলেই স্বাস্থ্য সংকটও শেষ হবে না। এই স্বাস্থ্যগত সমস্যার অবসান তখনই হবে যখন সবগুলো দেশ কোভিড-১৯ থেকে মুক্তি পাবে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

বর্তমানে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিশ্বের অভিজাত ও ধনী রাষ্ট্রগুলোসহ সব দেশই জটিল পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। কোভিড-১৯ যদি আফ্রিকা, এশিয়া, ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে এটা ক্রমাগত ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরী করবে। কারণ, এসব দেশে রোগ নির্ণয়ের উপকরণের স্বল্পতা রয়েছে। পাশাপাশি এ সব দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত নয় এবং সামাজিক দূরত্বও মেনে চলা প্রায় অসম্ভব।

চিকিৎসা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং নাগরিক সমাজের শীর্ষ প্রতিনিধিরা মনে করেন, এই সংকট অবসানের একমাত্র উপায় হলো যত দ্রুত সম্ভব জনস্বাস্থ্য, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোকে তহবিল প্রদান করা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই মানুষ ও বৈশ্বিক এই দুর্যোগের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। এজন্য বিশ্বনেতাদের অতি দ্রুত ৮ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন করার প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দেয়ার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চালিয়ে নেয়ার জন্য ১ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে। বাকী অর্থ রোগ নির্ণয় পদ্ধতি, চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিষেধক আবিষ্কার, উৎপাদন ও বিতরণের কাজ সমন্বয় করার জন্য ‘কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন’কে দিতে হবে। এই মহামারির অবসান এবং ভবিষ্যৎ বিপর্যয় রোধ করার জন্য রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিষেধকের ওপর সকল দেশের ন্যায্য প্রবেশাধিকার দিতে হবে।

এছাড়া ভেন্টিলেটর এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের (পিপিই) বৈশ্বিক প্রয়োজন মেটাতেও তহবিল সরবরাহ করতে হবে। বৈশ্বিকভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎপাদন ও ক্রয়ের জন্য অধিকতর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এই চিকিৎসা সরঞ্জামগুলোর ব্যবস্থা করা উচিত। প্রতিষেধক আবিষ্কারের পর গরিব দেশে সরবরারের জন্য ‘গাভি-দ্যা ভ্যাকসিন এ্যালায়েন্স’এর মত বিদ্যমান সংস্থাগুলোতে পর্যাপ্ত তহবিল দিতে হবে।

লন্ডনের ইমপারিয়াল কলেজের করা সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক গবেষণাতেও দেখানো হয়েছে করোনার কারণে এশিয়ায় ৯ লাখ এবং আফ্রিকায় ৩ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতিসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনির ঘাটতি রয়েছে। ফলে এ সকল দেশে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, কর্মী নিয়োগ এবং জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য কমপক্ষে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন।

উপরন্তু, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রায় ৩০ শতাংশ দেশে কোভিড-১৯ নিয়ে কোনো জাতীয় প্রস্তুতি এবং ‘রেসপন্স প্ল্যান’ নাই এবং অর্ধেকের মত দেশে কেবল একটি জাতীয় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশেই পর্যাপ্ত খাবার পানি, স্যানিটেশন ও মানসম্মত স্বাস্থ্যবিধির অভাব রয়েছে। এসব দেশে আশংকাজনক রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্র উন্নত দেশগুলোর তুলনায় খুবই কম ক্ষেত্র বিশেষে নেই বললেই চলে।  

স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো তাদের অর্থনীতিতে নিম্নমুখীতা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে। তবে, তারল্য সংকট যেনো ‘সলভেন্সি ক্রাইসিস’-এ রুপান্তর না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আরও সুসংহত রাজস্ব, আর্থিক এবং বাণিজ্য ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
কিছু দেশ ইতোমধ্যে আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে কিন্তু এটি আরো বেশী কর্যকর হবে যদি সবগুলো দেশই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পাশাপাশি বেকারত্ব হার বৃদ্ধি রোধ করা দরকার। ব্যাংকগুলোকে সরকারী ঋণের নিশ্চয়তা অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানি ও তাদের কর্মীদের প্রয়োজনীয় নগদ সহায়তা দিতে হবে।

দরিদ্র দেশগুলোর জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। আফ্রিকার বকেয়া ঋণের ৪৪ বিলিয়ন ডলারসহ এই বছর উন্নয়নশীল দেশের ঋণ পরিশোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ছাড় দেয়া উচিত। এর বাইরে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকে রক্ষার জন্য কমপক্ষে আরো ১৫০ বিলিয়ন ডলার নতুন তহবিলের প্রয়োজন।

বিশ্ব ব্যাংক তার সর্বোচ্চ সীমায় দেশগুলোর প্রতি সহায়তা বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেটা হয়তো পর্যাপ্ত হবে না। ২০০৯ সালে মহামন্দার সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের ব্যয় ১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই ধরনের পর্যাপ্ত সংস্থান এখন অনুমোদন দেয়া উচিত। আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিলও তার বিদ্যমান সকল সংস্থান বা রিসোর্স চলমান করবে বলে জানিয়েছে। আইএমএফকে এসডিআরে প্রায় ৫০০-৬০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া উচিত।

সময় খুব কম। যত দ্রুত সম্ভব উপরের বিষয়েগুলোর ব্যাপারে একমত হওয়া উচিত। জাতিসংঘ, জি-২০ দেশগুলোর সরকার, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংককে এই কাজগুলোর জন্য খুব দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। করোনা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলায় এ অংশীজনগুলোর সমন্বিত কর্যক্রম গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যদিও এগুলো অনেক টাকার ব্যাপার কিন্তু যদি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে সমস্যাগুলোর সমাধান না করা হয় তাহেল এর পরিণতিগুলি আরো ভয়াবহ হতে পারে।

(লেখাটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত ‘A Letter to G-20 Governments’ অবলম্বনে লেখা।)

লেখক: গবেষক ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, গবেষণা ও পলিসি, টিআইবি।

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

বাংলাদেশে টিকা আসবে কবে?

১ ডিসেম্বর ২০২০

ম্যারাডোনা ও বাংলাদেশ

২৬ নভেম্বর ২০২০

এমন মৃত্যু মানা যায় না

১৬ নভেম্বর ২০২০

ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ

১৫ নভেম্বর ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status