জাতীয় দুর্যোগ: কিছু পরামর্শ

এএমএম নাসির উদ্দিন

মত-মতান্তর ৪ এপ্রিল ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:০২

করোনা নিয়ে এত লেখালেখি, আলোচনা, পর্যালোচনা হয়েছে যে, এদেশের অনেকেই করোনা বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন দাবী করতে পারেন। এ নিয়ে লেখালেখি আর ভালো লাগেনা। তারপরেও যেহেতু কিছুদিন দেশের স্বাস্থ্য খাতের দেখভালের দায়িত্বে ছিলাম, এ খাত আমাকে ভাবায় অবিরত। বিশেষত বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে। করোনা মোকাবিলায় সরকার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছে সন্দেহ নেই। আমাদের বুঝতে হবে করোনা সরকারের একার বা কোন দলের সমস্যা নয়। এটা জাতীয় দুর্যোগ, সবাইকে নিয়ে জাতীয়ভাবে এটার মোকাবিলা করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের আদলে। কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
১.করোনা আক্রান্ত নন এমন রোগীকেও হাসপাতাল থেকে বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সর্দি, কাশি, জ্বর দেখলে ডাক্তার-নার্সসহ হাসপাতালের লোকজন পালিয়ে যাচ্ছে।
২.বেসরকারি অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বরের রোগীর চিকিৎসা দিতে অপারগতা জানাচ্ছে। অথচ ভারতের ভেলোরের CMC এর মত বিখ্যাত বেসরকারি হাসপাতাল দেশি, বিদেশি অন্যসব রোগী রিলিজ করে দিয়ে করোনা রোগী চিকিৎসায় কাজ করছে।
৩.করোনা আক্রান্তের লাশ দাফনে বিভিন্ন জায়গায় বাধা দেয়া হচ্ছে।
৪.করোনা রোগী চিকিৎসার ব্যবস্থা বিশেষত ঢাকার বাইরে অপর্যাপ্ত। সংক্রমণ ও রোগী বাড়লে সমস্যা অতি প্রকট ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
৫.সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ বাড়লে করোনা চিকিৎসায় প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের ঘাটতি প্রকট হতে পারে। ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, অ্যামেরিকা ইত্যাদি দেশে অনেকটা জ্যামিতিক হারে সংক্রমণ বাড়ছে।
৬.করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার প্রস্তুতিও প্রয়োজন।

৭.লকডাউনের সময়ে গরীবদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রয়োজন।

উপরোক্ত বিষয়সমূহ ঘিরে কিছু ত্বরিত ভাবনাঃ

১) করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্হা বা লকডাউনে গরীবদের সুরক্ষার বিষয় আমার এ পোস্টের মূল লক্ষ্য নয়। গরীবদের সুরক্ষা নিয়ে সরকার ও বেসরকারি খাত, বেশ কিছু NGO কাজ করছে।আমার উদ্দেশ্য, স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি নিয়ে কিছু সুপারিশ সবার সাথে শেয়ার করা।অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বিষয়ে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ Paul Krugman এর একটা কথাই শুধু উল্লেখ করতে চাই।তিনি করোনা পরবর্তী মার্কিন অর্থনীতিতে অবিসম্ভাব্য মন্দাকে আখ্যায়িত করেছেন "Medically induced Coma - Corona Coma" হিসেবে। বলেছেন এটা থেকে উত্তরণের জন্যে অর্থনীতিকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হবে।
২)সামনের দিনগুলোর জন্যে হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসার সুবিধা দ্রুত বাড়াতে হবে।অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলে। আকিজ গ্রুপের হাসপাতাল তৈরীর কাজ অজানা কারণে বন্ধ রয়েছে শুনেছি।বিভিন্ন দেশে পার্ক, এমনকি স্টেডিয়ামে অস্হায়ী হাসপাতাল তৈরী হচ্ছে। আবহাওয়া বিবেচনায় আমাদের দেশে খোলা মাঠে হাসপাতাল তৈরীর সুযোগ নেই। বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের ৪ টি কনভেনশন হল ও ট্রেড সেন্টার হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের জন্যে দিতে চেয়েছে যাতে ৫০০০ শয্যার ব্যবস্হা করা যাবে। বেড, যন্ত্রপাতি, ডাক্তার, নার্স ইত্যাদি সরকারকে ব্যবস্থা করতে হবে। এটা নিয়ে দ্রুত ভাবা প্রয়োজন। প্রথমেই ৫০০০ বেড না হলেও ৫০০ বেড নিয়ে অন্ততঃ শুরু করা যেতে পারে। পরে বেড বাড়ানো যাবে। সময় অতি দ্রুত চলে যাচ্ছে।চীন করোনা মোকাবিলায় অভিজ্ঞ দেশ এবং আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র । তারা ইতালিতে মেডিকেল টিম পাঠিয়েছে। আমরা মেডিকেল টিম চেয়ে চীনকে অনুরোধ জানাতে পারি। বসুন্ধরার হাসপাতালটার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করতে পারি।আমাদের স্বাস্হ্য কর্মীদের ট্রেনিংও হবে এতে। সরকারের উদ্যোগ এখানে জরুরি ।

২) সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে প্রায় ১৫০০ সদ্য পাশ করা স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক অনলাইনে সেবা দিচ্ছেন শুনেছি।এদেরকে এবং আরো এক হাজার নতুন পাশ করা ডাক্তার স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়ে অনলাইনে জরুরি প্রশিক্ষণ দান পূর্বক দেশের বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার জন্যে নিয়োগ করা যেতে পারে।তাদের কিছু সম্মানী এবং হাসপাতালের কাছেই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সরকারি খাতে এদের নিয়োগ বিবেচনার সুযোগ রাখা যায়। নার্সের জন্যেও একই ব্যবস্থা নেয়া যায়। PPE ইত্যাদির পর্যাপ্ত ব্যবস্হা করতে হবে।
৩) করোনা রোগী সনাক্ত হলে তাকে সরকারি দায়িত্বে নির্ধারিত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪) করোনা রোগী মারা গেলে দাফন সরকারি তত্ত্বাবধানে করতে হবে। এধরণের লাশের জন্যে বিভিন্ন স্হানে যথা জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কবরস্হান নির্ধারন করে দিতে হবে। প্রত্যেক লাশের নাম ঠিকানা সংরক্ষণ করা দরকার। লাশের ক্রমিক নম্বর কবরের বাইরে চিহ্নিত থাকতে হবে।
৫) মৃত ব্যক্তির মাধ্যমে যে করোনা ছড়ায়না সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা দরকার।
৬) পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী দেয়ার পরও যে স্বাস্থ্যকর্মী বা হাসপাতাল সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাবে তাদের চিহ্নিত করে রাখতে হবে।
৭) প্রতিস্ঠিত ও মান সম্পন্ন বেসরকারি হাসপাতাল গুলোর সাথে সরকারের জরুরি আলোচনার মাধ্যমে এদের ভূমিকা কি হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।
৮) প্রতিস্ঠিত কিছু বেসরকারি হাসপাতালকেও করোনা সনাক্তকরণ পরীক্ষার দায়িত্ব /অনুমতি দিতে হবে।

(সাবেক সচিব)

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

বাংলাদেশের জার্নাল

আরোপিত ও জন্মগত সম্পর্কের নির্মম পরিণতি!

৫ জুন ২০২০

এরপর কি?

২৫ মে ২০২০

তবুও ঈদ মোবারক

২৫ মে ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত