বিলেতের জার্নাল: শেষ গল্পের আগের গল্প

ডা: আলী জাহান

অনলাইন (৮ মাস আগে) মার্চ ২৫, ২০২০, বুধবার, ৬:৪৮ পূর্বাহ্ন | সর্বশেষ আপডেট: ৬:০০ পূর্বাহ্ন

শরীর আর মন ঠিক রাখার জন্য প্রতি সপ্তাহে একদিন ব্যাডমিন্টন খেলি। প্রতি মঙ্গলবার ইনডোর ব্যাডমিন্টন হয়। আমি সহ ৪ জন খেলোয়াড়। খেলাটি মঙ্গলবারে হয়ে থাকে। গত মঙ্গলবার অন্য সপ্তাহের মঙ্গলবারের মতো ছিল না। সে কথাই আপনাদের বলছি।

করিম সাহেব আমাকে ফোন করলেন। খেলা চলাকালীন অবস্থায় ফোন ধরি না। দুই গেমের মাঝখানে একটু বিশ্রামে ছিলাম।
ফোনটা তখনই আসলো। আমি বললাম, " একটু পরে ফোন করি? এখনো খেলা শেষ হয়নি।"

করিম সাহেব বললেন " আপনি এখন খেলছেন তা আমি জানি। তবে ফোনটি জরুরী। আপনার সাথে আমার এখনই কথা বলতে হবে।"

আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। সম্ভাব্য খারাপ সংবাদ শোনার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। গলাটা কিছুটা শুকিয়ে এসেছে। বুকে কি একটু পালপিটেশন হচ্ছে? বাকি খেলোয়াড়দের একটু ইশারা দিয়ে বললাম আপনারা খেলা শুরু করুন, আমাকে ফোনটা ধরতে হবে। সম্ভাব্য খারাপ খবর শোনার আগেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের একটি স্রোত নেমে গেল।

করিম সাহেব আমার বন্ধু। খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কয়েক বাসা পরেই উনার বাসা। একই কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা পাস করেছি। উনি আমার চেয়ে একবছরের জুনিয়ার। তবে সম্পর্কটা বন্ধুর মতো হয়ে গেছে। ব্রিটেনে অনেকদিন থেকে আছেন। স্ত্রী এবং ৩ সন্তান নিয়ে ভালোই আছেন। ভালো ব্যবসা আছে। লোকজনের বিপদাপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যেভাবেই পারেন বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। উনি জানেন আমি মঙ্গলবার ব্যাডমিন্টন খেলি। এরপরও যখন আমাকে ফোন করেছেন তখন বুঝতে হবে আমার জন্য কোন দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে।আমি এখন প্রস্তুত।

করিম সাহেবের গলার স্বর ওঠানামা করছে।ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ যেভাবে কথা বলে উনি সেভাবেই কথা বলছেন। উনি কয়েক মিনিট একটানা কথা বললেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন "এখন আমি কী করবো?"

করিম সাহেবের আরেক বন্ধু একটি কাজে শহরের বাইরে আছেন। বন্ধুর ছোট ছেলে স্কুলে যায় কিন্তু উনার স্ত্রী গাড়ী ড্রাইভ করতে পারেন না। সোমবার এবং মঙ্গলবার- এ দুটি দিন তিনি করিম সাহেবকে অনুরোধ করেছিলেন তার ছোট ছেলেটিকে স্কুলে নিয়ে যেতে এবং বাসায় দিয়ে আসতে। করিম সাহেব না করতে পারেননি। উনি তার বিজনেসে যান সন্ধ্যার পর। বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য রাজি হয়ে গেলেন।

সোমবার এবং মঙ্গলবার তিনি তাঁর বন্ধুর ছেলেকে নিজের গাড়ি (কার) দিয়ে স্কুলে দিয়েছেন এবং স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। কোন সমস্যা হয়নি। সমস্যা হয়েছে একটু আগে। করিম সাহেব ওনার বন্ধুর স্ত্রীর কাছ থেকে একটি টেক্সট মেসেজ পেয়েছেন। সেই টেক্সট মেসেজে কিছু দুঃসংবাদ ছিল। মেসেজ পড়ার পরই করিম সাহেব অস্থির হয়ে আমাকে ফোন করেছেন।

যে ছেলেটিকে করিম সাহেব স্কুলে দুইদিন থেকে আনা-নেয়া করেছেন, তার গায়ে জ্বর উঠেছিল সোমবার সকালে। হালকা জ্বর নিয়ে সে স্কুলে এসেছিল। বিকালে স্কুল থেকে ফেরত যাবার পর তার জ্বরের মাত্রা বেড়ে যায়। সঙ্গে কিছুটা কাশি। বিকেলে বিশেষ ব্যবস্থায় ছেলেটিকে ডাক্তার দেখানো হয়। কয়েক ঘন্টা পর মেসেজ এসেছে, ' ছেলেটি করোনা ভাইরাস কভিড ১৯ পজিটিভ'। ছেলেটির পুরো পরিবার আইসোলেশনে চলে গেছে। যেহেতু করিম সাহেবের গাড়ি করে ছেলেটিকে গত দুদিন আনা-নেয়া করা হয়েছে সেজন্য করিম সাহেব এখন উদ্বিগ্ন- তাকে কী করতে হবে?

করিম সাহেব ব্রিটেনের ইমারজেন্সি নাম্বার ১১১ বা ৯৯৯ এ ফোন করতে পারতেন। কিন্তু তাকে অপেক্ষা করতে হতো কয়েক ঘণ্টা। যেহেতু বিষয়টি ইমারজেন্সি নয় তাই অপেক্ষার প্রহর অনেক দীর্ঘ। ইমারজেন্সিতে ফোন করার আগেই তিনি আমাকে ফোন করেছেন। জানতে চাইছেন এখন কী করবেন। উনাকেও কি আইসোলেশনে যেতে হবে? সম্ভাবনা কতটুকু ভাইরাসে আক্রান্ত হবার? ঘরের বাদবাকি সদস্যদের কী হবে? উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রচুর।

ব্রিটেনের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার নাম এনএইচএস (NHS)। এনএইচএস এর পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে স্পষ্ট গাইডলাইন দেয়া আছে। ব্রিটেনের প্রতিটি নাগরিক সে গাইডলাইন ফলো করতে বাধ্য। আমি তাকে সেই গাইডলাইন পড়ে শোনালাম। গাইডলাইন অনুসারে করিম সাহেব, তার স্ত্রী এবং ৩ সন্তানকে (৬-১৬ বছর) দুই সপ্তাহের জন্য আইসোলেশনে থাকতে হবে। এর ভেতরে উনি সহ পরিবারের কেউই বাসার বাইরে আসতে পারবেন না। কোন আত্মীয়-স্বজন তাদের সাথে বাসার ভেতরে দেখা করতে পারবেন না। করিম সাহেবের কথায় জড়তা চলে আসে। উনি যে ভয় পেয়েছেন তা আমি ফোনে বুঝতে পারি। উনাকে বললাম ' গাইডলাইন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবার জন্য আপনি ১১১ এ ফোন করতে পারেন। অথবা এনএইচএস এর ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন।'

করিম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম উনার জ্বর বা কাশি এসেছে কিনা। উনি বললেন 'না'। পরিবারের বাকি সদস্যও জ্বর বা কাশিতে আক্রান্ত নন।

এনএইচএস এ করোনা ভাইরাসের রোগীদের জন্য একটি গাইডলাইন দেয়া আছে। এ গাইডলাইন অনুসারে একজন সুস্থ সবল মানুষ যদি হঠাৎ করে জ্বর এসেছে বলে মনে করেন (শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বা বেশি) অথবা হঠাৎ করে কাশি শুরু হয় ( প্রতি ঘন্টায় কমপক্ষে তিনটি কাশি এবং এরকমের ২৪ ঘন্টার ভেতরে ৩ ঘন্টার কাশি), তাহলে তার করোনা ভাইরাস হবার সম্ভাবনা প্রবল। এ দুই উপসর্গের একটি বা দুটি থাকলে আপনাকে হোম আইসোলেশনে থাকতে হবে। হোম আইসোলেশন অবস্থায় আপনাকে উপদেশ দেয়া হয়েছে যে আপনি প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে পারবেন। কোন অবস্থাতেই আপনি ডাক্তারের চেম্বার, ফার্মেসী বা হাসপাতালে যেতে পারবেন না। প্রয়োজনে ১১১ নাম্বারে আপনি স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে আলাপ করতে পারবেন। যদি আপনার এই দুটি উপসর্গ খুব খারাপের দিকে মোড় নেয় অথবা আপনি হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন তাহলে ১১১ নাম্বারে ফোন করলে আপনাকে নিদৃষ্ট হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি হওয়া লাগতে পারে। ১১১ নাম্বার থেকে আপনার পরবর্তী করণীয় জানিয়ে দেয়া হবে। আপনি কোন হাসপাতালে এবার ডাক্তারের চেম্বারে সরাসরি যেতে পারবেন না।

করিম সাহেবের কোন উপসর্গ নেই। কিন্তু এনএইচএস গাইডলাইন অনুসারে, করিম সাহেব যেহেতু একজন করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন তাই ১৪ দিনের হোম আইসোলেশন তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

গত চার দিন থেকে করিম সাহেব তার পরিবারসহ হোম আইসোলেশনে আছেন। কয়েক বাসা পরেই উনার বাসা। ইচ্ছে থাকলেও আমি তাকে দেখতে যেতে পারিনি। দেখতে যেতে পারছি না। একই পাড়ায় ওনার অনেক আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। কাউকেই তিনি বাসায় আসতে দিচ্ছেন না। কেউ কোন খাবার দিতে চাইলে বাসার বাইরে রেখে আসতে হচ্ছে। কথা বলতে হচ্ছে শুধুমাত্র টেলিফোনে। উনি খুব ভয় আছেন, তখন উনার গায়ে জ্বর উঠে অথবা শ্বাসকষ্ট শুরু হয় অথবা কাশি শুরু হয়। এক অব্যক্ত ব্যথা। ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল। পৃথিবীর কোন ভাষা এ অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করতে কি সক্ষম?

আমি দিনে কয়েকবার ফোন করি। তাঁর খবরাখবর জানার চেষ্টা করি। ঘরে পর্যাপ্ত খাবার আছে কিনা জিজ্ঞেস করি। কিছু কিনতে হবে কিনা জানার চেষ্টা করি। রোগের কোন উপসর্গ আসছে কিনা জিজ্ঞেস করি। সাহস দেবার চেষ্টা করি। বলি ' সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ভয়ের কারণ নেই।' আমার মনে হয় না করিম সাহেব আমার কথার উপর খুব একটা নির্ভর করতে পারেন। ফোনে কথা শুনেই আমি তা বুঝতে পারি। শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য বলি। কোন সমস্যা হলে আমাকে বা ১১১ নাম্বারে ফোন করতে বলি।

রোগীর সাথে সংস্পর্শের চতুর্থ দিন শনিবার। রাতে করিম সাহেবকে ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন ' সবাই ভালো আছে' বলেই উনি কাশতে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলাম জ্বর এসেছে কিনা। তিনি বললেন থার্মোমিটার খুঁজে পাচ্ছেন না। জ্বর এসেছে কিনা বলতে পারছেন না।


' আচ্ছা, আলী জাহান ভাই, সত্যি করে বলুন তো আমার করোনাভাইরাস হবার সম্ভাবনা কতটুকু? এ ভাইরাস আমাকে সংক্রমণ করলে আমার মারা যাবার সম্ভাবনা কতোটুকু?' প্রশ্ন শুনে আমি চমকে উঠি। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করি। উত্তরটা আমি প্রায় জানি। কিন্তু দিতে পারি না।



করোনা ভাইরাসের দুটি ডায়াগনোস্টিক উপসর্গ- কাশি এবং উচ্চ তাপমাত্রা- করিম সাহেবের শরীরে চলে এসেছে। উনার ঝুঁকি এখন প্রবল। আমি তাকে এ তথ্য দিই না। কারণ তাকে এমনিতেই দুই সপ্তাহ আইসোলেশনে থাকতেই হবে। উনার ভয় বাড়িয়ে লাভ নেই। উনাকে শান্ত রাখা দরকার।



আমি নিরব থাকি। রোগের উপসর্গের সাথে তার বর্তমান অবস্থা মেলাবার চেষ্টা করি। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারিনা। আমার জিহ্বা আড়ষ্ঠ হয়ে আসে। কন্ঠ ধরে আসে। অজুহাত দেখিয়ে ফোন রেখে দেই। উত্তরটা আমি জানি কিন্তু দিতে পারিনা।


করোনা ভাইরাসের কবলে ইটালিতে ১০০ জনে ৮ জন মৃত্যুবরণ করছে। ব্রিটেনে সংখ্যা এখন শতকরা প্রায় ৪।



করিম সাহেব জিজ্ঞেস করছিলেন উনার আক্রান্ত হবার এবং ভাইরাসে মারা যাবার সম্ভাবনা কতটুকু। উত্তরটি আমি জানি। হয়তো উনিও জানেন। উত্তর জানা সত্ত্বেও আমি তাকে ফোনে উত্তর দিই না। প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলি।

এসব পরিসংখ্যানের কথা বলতে গেলে আমার কান্না চলে আসে। ডাক্তারদের সহজে কাঁদতে নেই। ডাক্তারদের চোখের পানি দেখলে রোগীরা বেঁচে থাকার সাহস হারিয়ে ফেলে। আমাদের পেশা হলো মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা। আমরা আমাদের কান্না প্রকাশ করে মানুষের বেঁচে থাকার মনোবলকে দুর্বল করে দিতে পারি না। রোগীর সামনে না কাঁদলেও আমরা অনেকে একা একা কাঁদি। মাঝেমধ্যে আমিও কাঁদি।

আমরা মানব সভ্যতার এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের আগে কখনো এতো অসহায় ছিল কি না তা আমার জানা নেই। ডাক্তার হওয়া সত্বেও আমি নিজেই অসহায়। এখনো হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। রোগী দেখতে হচ্ছে। কপাল ভালো যে আমাকে করোনা রোগী সরাসরি দেখতে হয় না। তবে আমার অধীনে যে রোগী ভর্তি আছে তাদের যেকোন জনের যে কোন সময় করো না ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে যেতে পারে। খুব সহজে সে সংক্রমণটা আমার উপরে চলে আসতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বা হঠাৎ করে কাশি চলে আসতে পারে। আমি নিজেও হোম আইসোলেশনে চলে যেতে পারি। হয়ে যেতে পারি অদৃশ্য এবং নিঃশব্দ কভিড ১৯ এর শিকার।উপরের গল্পটা হয়ে যেতে পারে আমার বা করিম সাহেবের শেষ গল্পের আগের গল্প।


ফুটনোট-
১. গ্রেট ব্রিটেন এখন লকডাউনে চলে গেছে।

২. করিম সাহেবের তাপমাত্রা বাড়ছে। কাশিও বাড়ছে। তবে এখনো হোম আইসোলেশনে।

৩. ব্রিটেনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা NHS guidelines অনুসারে করোনা ভাইরাস ডায়াগনোসিস
করার জন্য দুটি core symptoms এর যেকোনো একটি বা দুটি থাকলে আপনাকে
বাসায় এক সপ্তাহ এবং বাকি পরিবার সদস্যদের দুই সপ্তাহ হোম আইসোলেশন থাকতে হবে।

৪. কোন করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসলে আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ হোম আইসোলেশনে থাকতে হবে।


লেখক: ব্রিটেনে কর্মরত বাংলাদেশী সাইকিয়াট্রিস্ট
(উপরের কাহিনী একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status