রিসেট

ফ্যাক্টর বস্তির ভোট

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি (রবিবার), ২০২০ Archive 2018Source: নূরেআলম জিকু
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ১ ও ২, নিকেতন (আংশিক), বনানী, কাকলী, কড়াইল এবং চেয়ারম্যান বাড়ি। এই এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত ঢাকা উত্তর সিটির ১৯ নং ওয়ার্ড। প্রায় ৬ কিলোমিটার আয়তনের এই ওয়ার্ডে ভিআইপিদের আবাসস্থল। তবে এই অভিজাত এলাকায় রয়েছে কড়াইল বস্তি, টিএন্ডটি কলোনি ও আদর্শনগরের মানুষের জীবন ব্যবস্থা। প্রায় ৮ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এ ওয়ার্ডটিতে। ভোটার সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। তবে বস্তিগুলোতে ভোট রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। কাউন্সিলর প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে মূল ফ্যাক্টর এই বস্তির ভোট। ঢাকার দুই সিটির সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড ধরা হয় এটিকে। তবে নানা সমস্যায় এখনো জর্জরিত ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। বিশেষ করে কড়াইল বস্তি, টিএন্ডটি কলোনি ও আদর্শনগরের মানুষের জীবন ব্যবস্থা অনেকটা শোচনীয়। এই ৩ স্থানে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। মাদক, সন্ত্রাস, ময়লা আবর্জনা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে মুক্তি মিলছে না বস্তিবাসীর। মাদকের ছোবলে আক্রান্ত এখানকার তরুণরা। কড়াইল বস্তিতে বিভিন্ন পেশার মানুষ বাস করছেন। তাদের ৯০ ভাগই নিম্নআয়ের মানুষ। নেই পর্যাপ্ত আলো, বাতাস কিংবা পানির ব্যবস্থা। বিশুদ্ধ পানির জন্য এখানে চলে এক প্রকার যুদ্ধ। বস্তির ঘরগুলোতে এলোমেলো বিদ্যুতের সংযোগ। নেই ডাস্টবিন। ফলে বস্তির সামনেই পড়ে আছে ময়লার স্তূপ। ময়লা আবর্জনার মধ্যেই খেলা করছে ছোট ছোট শিশুরা। তবে এখানকার ভোটারদের ভোটে কাউন্সিলরদের ভাগ্য বদল হয়। নির্বাচনে জয়লাভ করতে কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রধান লক্ষ্য থাকে বস্তির ভোটারদের উপর। সরজমিনে দেখা যায়, প্রচার প্রচারণার শুরু থেকেই ১৯নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের হাতে হাতে লিফলেট তুলে দিচ্ছেন তারা। ঘুরছেন ওয়ার্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। পুরো এলাকায় দলীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। এলাকার উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। ভোটাদের মন খুশি করতে প্রার্থীরা তাদের বুকে জড়িয়ে নিচ্ছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অফিসকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা উৎসবে মেতে উঠছে। বস্তির অলি-গলির চায়ের দোকানগুলোতে ভোটের প্রভাব দেখা গেছে। প্রচার প্রচারণার কমতি না থাকলেও ভোটের পরিবেশ নিয়ে এখনো শঙ্কা কাটেনি ভোটারদের মধ্যে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেয়ার নিশ্চয়তা চান। বিগত নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ লাইন থাকলেও ভোটাররা কেন্দ্রে ভোট দিতে পারেননি বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, এই ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের ভোট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক মেয়র আনিসুল হক এই ওয়ার্ডকে মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তার উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে পারবে এমন কাউন্সিলরকে ওয়ার্ডের দায়িত্ব দিতে চান। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মফিজুর রহমান, বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আছেন বনানী থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান আজাদ ও বিএনপির মনোনীত প্রার্থী গুলশান বিএনপির সভাপতি ফারুক হোসেন ভূঁইয়া।
কড়াইল বস্তির বাসিন্দা হারুন মিয়া জানান, নির্বাচন এলে এলাকায় উৎসবমুখর দিন কাটে। সবাই ভোট চাইতে আসে। তবু আমরা সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। কখন আবার বস্তি উচ্ছেদ করে। কয়েকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। বস্তি ভাঙার পাঁয়তারা করছে অনেকে। এলাকার নেতারা বিভিন্নভাবে আমাদের শোষণ করে। এই বস্তিটা ঢাকার সবচাইতে বড়। এখানে বহু মানুষের বসবাস। ভোটার সংখ্যাও অনেক বেশি। ভোটের সময় সবাই অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখায়, ভোট শেষে খবরই রাখে না। পুরো বস্তিতে ময়লা আবর্জনায় ভরা। ডাস্টবিন নেই। এছাড়া মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত প্রভাবশালীরা। তাদের কথা না মেনে চললে বস্তি থেকে তাড়িয়ে দেয়। সেসব বিষয় চিন্তা করেই বস্তির ভোটাররা কাউন্সিলর ঠিক করবেন। বস্তির আরেক বাসিন্দা ময়ফুল বলেন, ভোট হবে শুনছি। ভোটের অবস্থা ভালো হলে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিবো। যারা আমাদের বিপদে পাশে থাকবে তাদেরকে ভোট দিবো। আমরা সবাই গরিব মানুষ। বাসাবাড়িতে কাজ করি, কেউ ফুটপাথে কাজ করে। তবে বেশিরভাগ মানুষ রিকশা চালিয়ে সংসার চালায়। ছেলেমেয়েদেরকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে পারে না। এখানে ১/২টা স্কুল থাকলেও বেশি পড়াতে পারে না। ছোট থাকতেই কাজ করে সংসার চালায়।
বনানী কাঁচাবাজার এলাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্দিষ্ট স্থানে ডাস্টবিন থাকলেও তা অনেক সময়ই ব্যবহারের অনুপযোগী। যথাসময়ে সিটি করপোরেশনের লোক ময়লা অপসারণ করে না। ফলে রাস্তার পাশে ময়লা জমে থাকে। আর পথচারীরা আমাদেরকে গালমন্দ করে। তবে আগে এখানে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য থাকলেও এখন নেই। বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে ব্যবসায়ীরা ভোট দিবেন। কাউন্সিলর প্রার্থী মফিজুর রহমান বলেন, এই ওয়ার্ডটি রাজধানীর একটি মডেল ওয়ার্ড হিসেবে রূপ নিতে ৮০ শতাংশের মতো কাজ হয়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে, যা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এলাকায় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মাদক নির্মূল। যা দূর করতে পেরে স্বস্তিতে আছি। এলাকার সব ক’টি পার্ক ও খেলার মাঠের আধুনিকায়ন কাজ করা হয়েছে। ফুটপাথ, ড্রেন এবং রাস্তার কাজও প্রায় সম্পন্ন। বস্তিতে ডাস্টবিন স্থাপনের জায়গা নেই। তবুও আমরা সিটি করপোরেশনের ভ্যানের মাধ্যমে বস্তি থেকে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ করছি। আবারো যদি আমি জনগণের সেবা করতে পারি তাহলে গুলশান বনানীর চেহারা বদলে যাবে।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ফারুক হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমার এলাকায় ২ ধরনের মানুষ বসবাস করছে। সবার ভোটকে আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। সোসাইটি ও বস্তিবাসীর মাঝে ভোট চাইছি। এখানকার মানুষ পরিবর্তন চায়। ভোটের পরিবেশ ভালো থাকলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো ইনশাআল্লাহ। ভোটারগণ আমাকে কাউন্সিলর নির্বাচিত করলে এলাকার উন্নয়নে সব সময় কাজ করে যাবো। এই ওয়ার্ডের লেকগুলোকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে বিনোদনের জায়গা করে দিবো। যাতে পানি পরিষ্কার থাকে। মশা বংশবিস্তার করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি থাকবে। বস্তির পাশে খেলার মাঠ তৈরি করবো। কড়াইল বস্তির নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিবো।