খেতাবপ্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা লালু

এবিএম আতিকুর রহমান, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) থেকে

এক্সক্লুসিভ ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:৫৭

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৬৭৬ জন। খেতাবি বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বীরবিচ্ছু ও সর্বকনিষ্ঠ বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌর শহরের সুতি পলাশপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম লালু। তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা লালুর পিতা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, মাতার নাম আমিনা বেগম। তিনি ৩ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সাহসী ও দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন লালু। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গোপালপুরে পাকহানাদার বাহিনী ফায়ারিং শুরু করলে স্থানীয়রা প্রাণভয়ে এলাকা ছাড়া শুরু করলে কিশোর শহিদুল ইসলাম লালু স্বজনদের সঙ্গে পালিয়ে বর্তমান ধনবাড়ী উপজেলার কেরামজানী নামক স্থানে আশ্রয় নেন। লালুর সঙ্গে কেরামজানী বাজার ও স্কুল মাঠে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় ঘটে।
বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাবে লালু রাজি হলে মুক্তিযোদ্ধা দলের কমান্ডার কাজী হুমায়ুন আশরাফ বাঙ্গাল ও আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি তাকে কাছে ডেকে নিয়ে ঠিকানা জানতে চান। তারপর থেকেই তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফুটফরমাশ কাজে লেগে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চা-পানি খাওয়ানোর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে অস্ত্র পরিষ্কারের কাজও করতেন তিনি। এভাবেই অস্ত্র ধরা শিখেন কিশোর শহিদুল ইসলাম লালু। এক সপ্তাহ পর মুক্তিযোদ্ধা দলের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ভারত চলে যান। ভারতে গিয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করে অস্ত্র হিসেবে স্টেনগান ও গ্রেনেড পান। আর পোশাক হিসেবে পান হাফপ্যান্ট, গেঞ্জি ও মাথার ক্যাপ। প্রশিক্ষণের সময় ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণকালে ব্রিগেডিয়ার সামসিং শহিদুল ইসলামের নামের সঙ্গে লালু নামটি যুক্ত করে দেন। সেই থেকে শহিদুল ইসলামের নাম হয়ে যায় শহিদুল ইসলাম লালু। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তিনি লালু নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চলার সময় প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় হুইসেল বাজিয়ে সব মুক্তিযোদ্ধাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে পতাকা উঠাতেন ও নামাতেন তিনি। ভারতের তুরাতে লালু স্টেনগান ও গ্রেনেড বিষয়ে ভালো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অন্য মুক্তিযোদ্ধারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য টাঙ্গাইলের গোপালপুরের কেরামজানীতে আসেন। লালুকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল গোপালপুর থানার পাক হানাদারদের বাঙ্কার গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দেয়ার। বয়সে ছোট বলে সবার অলক্ষ্যে এ কাজ সহজে করা যাবে এবং ক্যাম্পের ভেতরে সহজে ঢুকতে পারবেন, শত্রু বলে সন্দেহ করবে না কেউ। সে জন্য লালুকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়। লালু ছোট হওয়ার কারণে সবার সন্দেহের বাইরে থেকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন। তিনি লুকিয়ে রাখা গ্রেনেডগুলো আনতে যান। সেখানে লালু কিছুটা বিপদের সম্মুখীনও হয়েছিলেন। গ্রেনেডগুলোর সেফটিপিন খুলে দ্রুত তিনি বাঙ্কারের দিকে ছুড়ে মারেন। প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয় লালুর ছুড়ে মারা গ্রেনেডগুলো। এতে তিনটি বাঙ্কারের সবাই মারা যায়। আর সেদিনই মুক্তিযোদ্ধারা গোপালপুর থানা সহজেই দখল করে নেন। লালু থানা থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরে আসেন।

সেদিন লালু ফিরে আসতে পারবেন সে ধারণা কমান্ডারদেরও ছিল না। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে শহিদুল ইসলাম লালু মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য ইতিহাস রচনা করেন। এছাড়া তিনি গোপালপুর, ভূঞাপুর, মধুপুর, ঘাটাইল ও নাগরপুরের কয়েকটি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। আর অধিকাংশ সময়ে পাকবাহিনীর নজরদারির কাজটি করতেন। তারা কোথায় অপারেশন পরিকল্পনা করে সব গোপন খবর জোগাড় করে লালু মুক্তিবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতেন। ছদ্মবেশ ধারণ করে অগ্রিম খবর সংগ্রহের ব্যাপারে শহিদুল ইসলাম লালু পারঙ্গম ছিলেন। অনেক সময় লালুর খবরের উপর ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী পরিকল্পনা তৈরি হতো। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যখন টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর সব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিলেন, তখন শহিদুল ইসলাম লালুও তার ব্যবহৃত স্টেনগানটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে শহিদুল ইসলাম লালুর পিঠ থাপড়ে বলেছিলেন, ‘সাবাশ বাংলার দামাল ছেলে।’ যখন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে লালুর বাঙ্কার ধ্বংসের কথা শুনলেন তখন বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন ‘বীরবিচ্ছু।’ সেই ছবি দিয়ে একটি পোস্টারও পরবর্তী সময়ে ছাপা হয়েছিল। শেখ রাসেল ও গোপালপুরের শহিদুল ইসলাম লালু একমঞ্চে বসেছিলেন। এই দৃশ্য পরবর্তী সময়ে বাঘা বাঙালি ছবিতে দেখানো হয়েছিল। এরপর শহিদুল ইসলাম লালু সশস্ত্রবাহিনী দিবস-২০০০, আজীবন সংবর্ধনা-২০০৩, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কর্তৃক পুরস্কার ও আর্থিক অনুদান, মিশরের রাষ্ট্রদূত কর্তৃক পুরস্কারসহ অনেক খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। তারপরও মানবেতর জীবনযাপন করে চার সন্তানের জনক বঙ্গবন্ধুর ‘বীরবিচ্ছু’ ও দেশের ‘সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক’ শহিদুল ইসলাম লালু ২০০৯ সালের ২৫শে মে ঢাকাস্থ মিরপুর বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এ বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ মিরপুরেই সমাহিত করা হয়।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোহাম্মদ আব্দুল আলীম

২০১৯-১২-২১ ২১:৩৪:৩১

আমি টাঙ্গাইলের বাসিন্দা হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা লালুকে নিয়ে গর্ববোধ করি এবং তাঁর আত্নার শান্তি কামনা করি। সেই সাথে দুঃখবোধ করি তাঁর অসহায় জীবন যাপনের জন্য। যে কোনো সরকারেরই উচিত ছিল তাঁর জীবনে সচ্ছলতা এনে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

মাস্ক ছাড়াই চলছে সবকিছু

২৮ নভেম্বর ২০২০

নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডে বাবা-মেয়ের মৃত্যু, শঙ্কায় মা

২৩ নভেম্বর ২০২০

নারায়ণগঞ্জে ঘরের ভেতর জমে থাকা গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়েছেন। এরমধ্যে হাসপাতালে ...

নয় দফা দাবি সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ কর্মকর্তাদের

২২ নভেম্বর ২০২০

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ নানা বৈষম্য দীর্ঘদিনের। এসব বৈষম্য নিরসনে বারবার দাবি জানানো হলেও ...



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত

DMCA.com Protection Status