বুয়েটে জুনিয়রদের ভয়ঙ্কর রাত

মরিয়ম চম্পা

শেষের পাতা ১০ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:০৫

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দু’দিনের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয় বৃহস্পতিবার থেকে। সারা সপ্তাহ ক্লাস শেষে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার দু’দিন তাদের সাপ্তাহিক ছুটি। বুধবার সন্ধ্যা থেকে দু’দিনের জন্য ক্লাস-পরীক্ষার চাপ কমে যায়। কিন্তু এই বুধবার রাতই বিভিন্ন হলের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্ক হয়ে আসে। কারণ এই রাতেই হলের ছাত্রলীগ নেতা বা সিনিয়রদের কাছে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এ বিষয়ে শেরে বাংলা হলের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন, বুয়েটে মূলত সে সকল শিক্ষার্থীরাই চান্স পেয়ে থাকেন যাদের মাথা ঠান্ডা। কারণ মাথা গরম শিক্ষার্থী কখনোই ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো বিষয়ে পড়তে পারে না। আমাদের ক্লাসের পড়া থেকে শুরু করে জীবনের সব সিদ্ধান্তগুলোই ঠান্ডা মাথায় নিতে হয়।
সপ্তাহে ছুটির দুদিন শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটা ঈদের মতো। কারণ এই সময়টাতে আমরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাই। আর সাপ্তাহিক ছুটি মানে আমরা বুধবার রাত থেকে হিসাব করি। কিন্তু এই রাতটিই আমাদের কাছে ভয়ের এবং আতঙ্কের। কারণ হলের সিনিয়র ভাইয়েরা বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা এই রাতটিকে তাদের টর্চার বা র‌্যাগিংয়ের উপযুক্ত রাত হিসেবে ব্যবহার করে। এই রাতে তারা মদসহ যাবতীয় নেশা করে এক্সট্রা পেনিক হিসেবে জুনিয়রদের পিটিয়ে বাড়তি আনন্দ পায়।

একই হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমি যখন প্রথম বর্ষে তখন আমার ভাগ্যে এই ভয়ংকর বুধবার রাতটি একবার এসেছিল। হলের প্রতিটি রুমে মূলত চারজন করে শিক্ষার্থী থাকে। আমাদের রুমে বাকী দুজন রুম মেটের মাথা ঠান্ডা থাকলেও আমার আর আমার পাশের বেডের রুম মেট উত্তপ্ত মেজাজের। কোনো অন্যায় দেখলে মুখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। আমরা নিজেদের মতো করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতাম। কিন্তু এটার জন্য যে বড় ভাইদের ভয়ংকর র‌্যাগিংয়ের শিকার হব সেটা বুঝতে পারিনি।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কোনো এক বুধবার রাতে আমি আর আমার রুমমেটের ডাক আসে। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাম্প দিয়ে আমাদের পিঠে আর নিতম্বে এলোমেলো ভাবে পিটানো শুরু করে। এরপর আমাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। আমাদের দোষ ছিল একটাই আমরা তখন সমসাময়িক রাজনৈতিক কোনো একটা বিষয় নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।

তিতুমীর হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি এখনো রাতে ভালো ঘুমাতে পারিনা। প্রায় রাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। হলে আসার পর বড় ভাই এবং তাদের দলের নেতাদের সঙ্গে কেন রুমে গিয়ে দেখা করিনি। সালাম-আদাব দেইনি। অজান্তে কোনো এক বড় ভাইয়ের সামনে দিয়ে তার আগে হেঁটে গিয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার দোষ। হঠাৎ এক ছুটির দিন রাতে আমাকে ডাকা হয়। গণরুমে গিয়ে বড়ভাইদের সালাম দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি না করাতে মূলত আমাকে ডাকা হয়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে বললো, রাখি সাওয়ান্তের মতো নেচে দেখা। আমি লজ্জায় কেঁদে ফেলি। এসময় হঠাৎ একজন এসে আমাকে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। সেও জুনিয়র ছিল। উঠে দাঁড়ালাম। এরপরে কি হয়েছে মনে করতে চাই না।

সোহরাওয়াার্দী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় জুনিয়রদের দিয়ে জুনিয়রদের পিটানো হয়। কারণ, হলে আসার পরেই যে সকল জুনিয়ররা রাজনীতিতে যোগ দেয় তারা প্রথম দিকে একটু ভীতু প্রকৃতির থাকে। ভয় ভাঙ্গানো, হাত পাকানো এবং সাহস বাড়াতে তাদের দিয়ে জুনিয়রদের পিটানো হয়। এসময় বড় ভাইরা পাশ থেকে বলেন, ভালো করে হাত পাকা। ভবিষ্যতে কাউকে মারতে যেন হাত বা বুক না কাপে। আমরা আছি। চালিয়ে যা। এভাবে জুনিয়রদের দিয়ে জুনিয়রদের পেটানো হয়।
ড. এম. এ. রশীদ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসের হলগুলোতে জুনিয়রদের র‌্যাগিং-এর বিষয়টি খুবই কমন। আবাসিক হলে আছে অথচ ছোট বড় র‌্যাগিং এর শিকার হয় নি এমনটা নেই বললেই চলে। চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, বাজে গালি শোনা এগুলো নিত্য নৈমত্যিক। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে হলে ভিন্নমতাদর্শী বিকল্প কোনো ছাত্র সংগঠন নেই। ফলে একচোটিয়াভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন রাজত্ব করে যাচ্ছে। কাজেই হলে থেকে তাদের মতাদর্শের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কথা বলার দুঃসাহস দেখানো প্রায় অসম্ভব। যারা কোনো রকমের দলাদলি এড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করতে চায়, তারাই মূলত ছাত্রলীগ নেতাদের রোষানল এবং নির্যাতনের শিকার বেশি হন। কেউ নিয়মিত নামাজ-রোজা করলেই তাকে ‘শিবিরকর্মী’ ট্যাগ দেয়া হয়। সে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হলেও।

আহসান উল্লাহ হলের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, যখন প্রথম বর্ষে তখন বড় ভাইদের দ্বারা র‌্যাগিং এর শিকার হয়েছি। এখন সিনিয়র হয়েছি। কিন্তু কাউকে তো কখনো র‌্যাগিং করিনি। এটা সম্পূর্ণরূপে কুরুচিপূর্ণ একটি কাজ। এটা যারা করে তারা একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার জন্যই মূলত করে। বুয়েটে পড়ালেখার এতো চাপ থাকা সত্বেও তারা এসব করার সময় পায় কখন ভেবে পাই না।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০১৯-১০-০৯ ১৩:৪৪:০২

চেহারা মানুষের মত হলে সবাই মানুষ হয় না। স্বভাব যাদের পশুর মত তারাই পৈশাচিক আনন্দ পেতে চায়।

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

ক্যাসিনো কাণ্ড

২২ মামলার চার্জশিট শিগগিরই

২৮ অক্টোবর ২০২০

রায়হান হত্যা

অপরাধে সক্রিয় ছিল হাসান ও আশেক এলাহী

২৮ অক্টোবর ২০২০

ইরফানকাণ্ড

‘আল্লাহর মাইর দুনিয়ার বাইর’

২৮ অক্টোবর ২০২০

এমনটা হওয়ার কথাই ছিল। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। ভাবনারও কিছু নেই। কথায় বলে, ‘আল্লাহর ...

বাংলাদেশের ‘বাস্কেট কেস’ থেকে শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তর

২৮ অক্টোবর ২০২০

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ডলার হিসাবে জনপ্রতি আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে ...

ফরাসি পণ্য বর্জনের আহ্বান

ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা

২৮ অক্টোবর ২০২০

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে পুলিশ। ...

করোনায় আরো ২০ জনের মৃত্যু শনাক্ত ১৩৩৫

২৮ অক্টোবর ২০২০

গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর ...

১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

মৌলভীবাজারে সেচ পাম্প ক্রয়ে ৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি

২৭ অক্টোবর ২০২০

যে রাষ্ট্র প্রজার নাগরিকের নয়

২৭ অক্টোবর ২০২০

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদের স্মৃতি আমাদের মন থেকে কি কিছুটা (কিংবা অনেকটা) ফিকে হয়ে গেছে? ...

মহানবীর (দ.) ব্যঙ্গচিত্র ও বাকস্বাধীনতা

২৭ অক্টোবর ২০২০

বছর পঁচিশ আগে ইংল্যান্ডের ফুটবল দলের ম্যানেজার ছিলেন গ্লেন হডল। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় প্রতিবন্ধী ...



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত



করোনার ধাক্কায় চিড়েচ্যাপ্টা বিমান সংস্থাগুলো

ফ্লাইটে একজন মাত্র যাত্রী!

গ্রেপ্তার ২১, পালিয়েছে দুই মালিক

আশুলিয়ায় মিনি ক্যাসিনো