প্রত্যাবাসনে ত্রিদেশীয় বৈঠক ২৪শে সেপ্টেম্বর থাকছেন জাতিসংঘ মহাসচিবও

মিজানুর রহমান

শেষের পাতা ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:০৩

ফাইল ছবি
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জট খুলতে আগামী ২৪শে সেপ্টেম্বর চীনের মধ্যস্থতায় ফের বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সাইড লাইনে অনুষ্ঠেয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ত্রিদেশীয় ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেঁরেজ। একাধিক দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্র মতে, বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ঢাকা ও নেপি’ডর কাছে প্রস্তাবিত তারিখের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে, ঢাকার তরফে তাৎক্ষণিক অনাপত্তি জ্ঞাপন করা হয়েছে। তবে মিয়ানমার কি জবাব দিয়েছে- সেটি এখনও জানা যায়নি। ঢাকার কর্মকর্তা বৈঠকটি সফলের বিষয়ে ব্যাপক আশাবাদী। এক কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে বলেন, ২০১৮ সালে নিউইয়র্কে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর মধ্যস্থতায় এমন বৈঠক হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবও।
’১৮ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের সেই বৈঠকের বিষয়ে ঢাকা ও নেপি’ড কোন আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ছিল না। তবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রচার হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল- প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে চীন তার বন্ধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সেই আলোচনার অংশ হিসাবেই নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বৈঠক। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি মতে, ওই বৈঠকে বাংলাদেশ জানিয়েছিল- যে কোন সময় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার সঙ্গে রাখাইনে প্রত্যাবাসনে ঢাকা প্রস্তুত রয়েছে। মিয়ানমারের মন্ত্রীও জানিয়েছিলেন- তারাও তাদের বাস্তুুচ্যুত নাগরিকদের গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছেন। কিন্তু কোন পক্ষই প্রত্যাবাসনের দিন-তারিখের বিষয়টি বৈঠকে প্রকাশ করেনি। পুঞ্জিভূত রোহিঙ্গা সংকটের উপযুক্ত সমাধানে চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে গেল বছরের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল- ২০১৮ সালের জুনে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের তৎকালীণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের মন্ত্রী চাও থিন সোয়েকে নিয়ে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ত্রি-দেশীয় বৈঠক করেছিলেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েং ই। সেই বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। এক বিবৃতিতে মন্ত্রী বলেছিলেন- চীন কোন অবস্থাতেই রাখাইন ইস্যুর আন্তর্জাতিকীকরণ হওয়াকে সমর্থন দেবে না। রাখাইন পরিস্থিতি আরও জটিল হোক বা খারাপের দিকে যাক- এমন কারও কোন পদক্ষেপে বেইজিং সায় দেবে না। ওয়েং ই বেইজিংয়ের ত্রি-দেশীয় প্রথম বৈঠকে যা বলেছিলেন পরবর্তীতে ঢাকা সফরকারী তার বিশেষ দূত এবং প্রতিনিধিরাও একই বার্তা দিয়েছেন। সেদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, চীনের একমাত্র এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক চাওয়া হচ্ছে তার দুই বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনায় বাস্তুচ্যুতদের নিজ ভূমে (রাখাইনে) ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা। এ জন্য বাস্তবতার নিরিখে দুই দেশের নিয়মিত যোগাযোগ ও ধারাবাহিক আলোচনার প্লাটফর্ম তৈরিতে সহায়তা করা। বাস্তুচ্যুতদের মাতৃভূমি রাখাইনে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করা ছাড়াও তাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়েও চীন সচেতন রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মিয়ানমারের কর্মকর্তারা যখন ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সন্ত্রাসী হামলার দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহারে সাঁড়াশি অপারেশন শুরু করেছিলেন এবং  বর্মী বর্বরতা থেকে প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল তখনও এতে বেইজিংয়ের সায় ছিল।

রাখাইনে মানবতার সংকট প্রশ্নে বিশ্ব সম্প্রদায় বিশেষত: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যখন একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের চেষ্টা করছিলো তখন চীন মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে এতে ভোটো দিয়ে প্রস্তাবটি আটকে দিয়েছিল। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় মিয়ানমারে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী। বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশেও চীনের বড় বিনিয়োগের অঙ্গীকার রয়েছে। বাংলাদেশ চীনা ঋণ সহায়তায় প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে পরিকল্পনা  নিয়েছে। পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই হচ্ছে চীনের দ্বিতীয় ঋণগ্রহীতা দেশ। ওই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাসড়ক, রেল, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি শোধানাগার প্রকল্প। ঢাকার কর্মকর্তারা এটা এখন বেশ জোরেশোরেই বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে (ভেটো) অবস্থান নিলেও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীনের আন্তরিকতার কমতি নেই।  বেইজিংয়ের উদ্যোগের প্রতি ঢাকার পূর্ণ আস্থা রয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, চীনের পরামর্শেই প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল ২০১৭ সালের নভেম্বরে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এটি বাস্তবায়নে মিয়ানমার তার কথা রাখেনি। চীনের মধ্যস্থতায় এ পর্যন্ত ৩ দফা পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ত্রি-দেশীয় বৈঠক হয়েছে। দু’দফা প্রত্যাবাসন চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। তারপরও চীনের নতুন উদ্যোগে আস্থা রাখছে ঢাকা।

ফের বৈঠকে বসতে সম্মতি দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, কেবল ত্রি-দেশীয় বৈঠকই নয়, আসন্ন ৭৪তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং সাইড লাইনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিস্তর আলোচনা করবে ঢাকা। মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১১ লাখের বেশী রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে সংকটে পড়েছে এটি এবার বিশ্ববাসীকে নতুন করে জানাবে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের শতাধিক সরকারী প্রতিনিধি জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। ওই দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কে আবদুল মোমেনসহ বেশ ক’জন মন্ত্রী এবং  পররাষ্ট্রসচিব ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা বিশ্বসভার মূল অধিবেশন এবং সাইড লাইনে বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশ নেবেন। সব খানেই প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি। সরকার প্রধানের সফরসঙ্গী হিসাবে প্রায় দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নিজ খরচে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন। শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসির সূযোগ রয়েছে। তারা যেখানে যে আয়োজনেই অংশ নেন না কেন, সবখানেই বাংলাদেশ বিশেষত: রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরবেন এবং এ থেকে ভুক্তভোগী হিসাবে বাংলাদেশের পরিত্রাণ চাইবেন।

হাসিনা-মোদি বৈঠকও ২৪শে সেপ্টেম্বর: এদিকে, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ দেয়া ছাড়াও সাইড লাইনে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক প্রায় চূড়ান্ত। তা হলো- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেঁরার সঙ্গে বৈঠক। সাইড লাইনে আরও ক’জন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের প্রস্তাব রয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ছাড়া অন্য সব বৈঠক হবে- এটি প্রায় নিশ্চিত। তবে সেই বৈঠকগুলোর দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতাদের সুবিধাজনক সময় এবং আমাদের সরকার প্রধানের অন্যান্য সুচি বিবেচনায় বৈঠকের সময়ক্ষণ শেষ মূহুর্তেও পরিবর্তন হয় বলে জানান কর্মকর্তারা।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Emon

২০১৯-০৯-১৭ ১৬:১২:২৬

চীন কখনও মিয়ানমারের ক্ষতি হতে দিবে না মিয়ানমারের স্বার্থ ঠিক রেখে যদি বাংলাদেশেকে রেহাই দেওয়া যায় তাহলে তা হয়ত করতে পারে কিন্ত মোট কথা হল চীনকে যতই আমরা বন্ধুর তালিকার শীর্ষে রাখি না কেন মগর মিয়ানমারকে রক্ষার জন্য চীন প্রয়োজনে আবার veto ব্যবহার করবেই। That’s all

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

তাজরীনে আগুনের ৮ বছর

১০৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য হয়েছে মাত্র ৮ জনের

২৯ নভেম্বর ২০২০

রোহিঙ্গা গণহত্যায় গাম্বিয়ার মামলা

ওআইসি তহবিলে ৫ লাখ ডলার দিলো বাংলাদেশ

২৯ নভেম্বর ২০২০

শেয়ার বাজারে আশার আলো

২৯ নভেম্বর ২০২০

২৫ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা

২৯ নভেম্বর ২০২০

আসছে ২৮শে ডিসেম্বর ২৫ পৌরসভায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত ...



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত



সিলেটে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে সমাবেশ

আচমকা উপস্থিত মেয়র আরিফ

DMCA.com Protection Status