মন্ত্রী নন তবুও আলোচনায়

দীন ইসলাম | ২০১৪-০১-২৯ ১১:০৪
সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়াকে নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে এখনও নানা আলোচনা চলছে। ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে নিয়ে কথা বলার পর দিলীপ বড়ুয়াকে নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল আরও বেড়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, সাম্যবাদী দলের নেতা দিলীপ বড়ুয়া। যাকে আমি অনেক দিন থেকেই চিনি। শুনেছি তিনিও নাকি অনেক অর্থের মালিক। তার সাবেক কর্মস্থল শিল্প মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিলীপ বড়ুয়ার সব কাজের দেখভাল করতেন সাম্যবাদী দলের ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্য সাইমুম হক আবদার। তরুণ এ ছেলেটির দেশের বাড়ি উত্তরাঞ্চলের একটি জেলায়। তার আগের অবস্থা ছিল দিন আনে দিন খায়। এখন অবস্থা পাল্টে গেছে। চলনে বলনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। কথাও বলেন বেশ গুছিয়ে। বসবাস করেন অভিজাত এলাকা ধানমন্ডিতে। তার আগের অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার এক রাজনৈতিক সহকর্মী জানালেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে দিলীপ বড়ুয়া কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রতিদিনই ওই অফিসে ঢুঁ মারতেন সাইমুম। নেতার সঙ্গে আড্ডা মারতেন। ফুট ফরমাশ খাটতেন। আর সার আমদানিকারক, সারের ডিলার ও ঠিকাদারসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের ১৩টি সার কারখানার ১০টি থেকেই মাসে কয়েক কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হতো। কথিত রয়েছে, সাইমুমের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হতো। তার হাত ঘুরে তা অজানা জায়গায় চলে যেতো। যদিও সাইমুম সব সময় বলতেন, লিডারের কথার বাইরে এক চুলও নড়ি না। অর্থ কামাই দূরে থাক।  
সাইমুম হক আবদার কোথায়? সাম্যবাদী দল ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্য সাইমুম হক আবদার। ২০০৯ সালে দিলীপ বড়ুয়া শিল্পমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তার আনাগোনা শুরু। একই বছরের শেষ দিকে মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিন সকালে মন্ত্রীর সঙ্গে আসতেন। পলিটিক্যালি ব্যক্তি হিসেবে এপিএস বা অন্য পিওদের রুমে বসে থাকতেন। ধীরে ধীরে জাল বিস্তার শুরু করেন। ২০১০ সালের প্রথম দিকে বিসিআইসিতে সাইমুমের আনাগোনা শুরু। প্রথমে বিসিআইসি’র শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে খাতির জমানোর চেষ্টা করেন। মন্ত্রীর কথা বলে ছোটখাটো ঠিকাদারি কাজ করতে চাইতেন। ওই সব করতে গিয়েই বিভিন্ন সার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাতির হয়ে যায় তার। এছাড়া, সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে পাঁচ বছরে সারের ডিলার, সরবরাহকারী ও পরিবহন ঠিকাদারসহ অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাতির জমিয়ে তোলেন। এরপর মাসিক বা বাৎসরিক ভিত্তিতে মাসোহারা আদায় শুরু করেন। এ কারণে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে মন্ত্রীর মাসোহারা আদায়কারী (কালেক্টর) হিসেবেই জানতেন। এক পরিবহন ঠিকাদার ও একটি জেলার ডিলার জানালেন, শিল্পমন্ত্রী পদে দিলীপ বড়ুয়া নেই। এরপরও তার উৎপাতে থাকতে পারছি না। প্রতিদিনই ফোন করে বলছে, ভাই মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর চলতে পারছি না। কিছু টাকা দেন। এমনভাবে অনুনয় বিনয় করে বলেন কিছুই বলতে পারি না। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার সময়ে ১৩টি সার কারখানা চালু ছিল। এর মধ্যে ১০টি সার কারখানা থেকে মন্ত্রীর নাম বলে মাসোহারা তুলতেন সাইমুম। মাসের একটি নির্ধারিত তারিখে সার কারখানাগুলোতে ছুটে যেতেন তিনি। অর্থ ছাড়াও নানা লোভনীয় গিফট তোলার অভিযোগের তীরও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। 
সারের বরাদ্দ নিয়ে চাপাচাপি: দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রী থাকাকালে বিভিন্ন জেলায় সারের বরাদ্দ নিয়ে চলতো সীমাহীন চাপাচাপি। এর মধ্যে শরীয়তপুর ও খুলনাসহ পাঁচটি জেলার বরাদ্দ নিয়ে চাপাচাপি হতো সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন জেলার সারের ডিলারদের সঙ্গে সাবেক শিল্পমন্ত্রীর দলীয় নেতাদের ভাব জমে যায়। এটাকে পুঁজি করে বেশি সারের বরাদ্দ দেয়ার জন্য মন্ত্রীর দপ্তর থেকে চাপাচাপি করার অভিযোগ রয়েছে। কথামতো কোন জেলায় বেশি বরাদ্দ না দিলে বদলিসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।    
জিটুজি সার আমদানি নিয়ে কারসাজি: গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট পর্যায়ে সার আমদানি নিয়ে গত পাঁচ বছরে নানা কারসাজি হয়েছে। এমন প্রক্রিয়ায় আমদানি করা সার পরিমাণে বেশি এলেও তা হিসাবে দেখানো হতো না। কম এলে চিঠির পর চিঠি চালাচালি হতো। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পরিবহন কোম্পানিগুলো সার চুরির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাদের সঙ্গে রয়েছে বিসিআইসি’র একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাই জিটুজি সারের চালান আসার পর পরিবহন কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে দিলীপ বড়ুয়ার দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নেতাদের বিশেষ খাতির শুরু হয়ে যেতো। এরপর শিপিং এজেন্ট, সার্ভেয়ার ও মাঝির মিলিত মাপের পর পরিমাণ বেশি হলে এনিয়ে নানা দেন-দরবার শুরু হতো।    
সার আমদানিতে বিশেষ কোম্পানি প্রীতি: সার আমদানির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কোম্পানিকে সব সময় কাজ দিতে বলতেন দিলীপ বড়ুয়া। কখনও সরাসরি এ বিষয়ে টেন্ডার কমিটির প্রধানকে বলতেন। আবার টেকনিক্যাল কমিটিকেও বিষয়টি বলতেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী এলাকার একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন সার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রোটন ট্রেডার্সে এক সময় এসে আড্ডা দিতেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। ওই প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সঙ্গে তার বেশ দহরম মহরম ছিল। বিসিআইসিতে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির অফিসে বসে দিনের পর দিন কাটাতেন। শিল্পমন্ত্রী হওয়ার পর কোম্পানিটির কপাল খুলে যায়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন থেকে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা পেয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে জোর জবরদস্তি কাজ করেছে।
যমুনা সার কারখানা থেকে উপঢৌকন ও পরে ফেরত: দেশের বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা সার কারখানা থেকে দামি গাড়ি ও এসি উপঢৌকন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। সূত্র জানায়, যমুনা সার কারখানায় ২০১১ সালের ২০শে এপ্রিল থেকে মাসব্যাপী ওভারহোলিং শুরু হয়। এই ওভারহোলিংয়ের খরচ ধরা হয় ২৭ কোটি টাকা। ওভারহোলিং চলার সময়ই ৩০শে এপ্রিল দিলীপ বড়ুয়া কারখানায় যান সিবিএ’র অভিষেক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান চলাকালে মঞ্চে মন্ত্রীর উপস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় নেতারা ওভারহোলিংয়ের নামে কারখানায়  কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ তোলেন। এরপরও ওই অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী এ বিষয়ে কোন একটি মন্তব্যও করেননি। এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, অনুষ্ঠানের পরপরই মন্ত্রীর জন্য ৯১ লাখ টাকা দামের একটি পাজেরো মিৎসুবিসি গাড়ি এবং দু’টি এসি পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকায়। এ নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর তিনি ওই উপঢৌকন ফেরত পাঠাতে অনেকটা বাধ্য হন।
ব্লিচিং প্ল্যান্ট স্থাপন প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি: সাবেক শিল্পমন্ত্রীর কারণেই কর্ণফুলী পেপার মিলে স্থাপিত নতুন ব্লিচিং টাওয়ার প্ল্যান্ট চালু প্রকল্প এখনও আলোর মুখ দেখেনি। কারণ দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পেপার মিলটির  ১৮০  কোটি টাকার আধুনিকায়ন (বিএমআরই) প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ স্থাপন ও গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যান্ট নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। প্ল্যান্টটি নির্মাণের ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এর আগে পরিকল্পনা কমিশনের ৪ সদস্যের একটি তদন্ত টিম প্ল্যান্ট পরিদর্শন করে। তদন্ত করে তারা দেখতে পায়, স্থাপনার ক্ষেত্রে নানা ত্রুটির কারণে নির্মাণকারী সংস্থা জাপানের মারুবিনি নবনির্মিত এই প্ল্যান্টটি মিল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে পারছে না। শুরুতে আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় ৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্ল্যান্টটি থেকে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ভাল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছিল না। এ কারণে নির্মাণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও প্ল্যান্টটি কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তরে ব্যর্থ হয়েছে নির্মাণকারী সংস্থা। মিলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসএস পাইপের স্থলে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যাপক কারচুপি, দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে নতুন নির্মিত ব্লিচিং টাওয়ার প্ল্যান্টটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। ২০০৭ সালে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখনও শেষ হয়নি। প্রকল্পের পুরো অর্থ গায়েব করার জন্য প্রকল্পটি নিয়ে নানা খেলা অব্যাহত রয়েছে।
দিলীপ বড়ুয়ার প্রতিক্রিয়া
শিল্পমন্ত্রী থাকাকালে দিলীপ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে সাইমুম হক আবদারের মাধ্যমে নানা লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আমি এসব কিছু জানি না। একথা বলেই ফোনের লাইন কেটে দেন। এরপর আর ফোনে তাকে পাওয়া যায়নি।