বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ

| ২০১৫-০৪-০৭ ১০:৩১
আপাতত বিএনপিকে স্তিমিত বা থামিয়ে দেয়া গেলেও বিরোধী জোটের মতপ্রকাশের কোন জায়গা না থাকায় একটি চরমপন্থি গ্রুপের উত্থান হতে পারে। আজকে হয়তোবা জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ একটি সহনশীল মুসলিম রাষ্ট্র। কিন্তু যদি ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের নামে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার নামে বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়া হয়, আইনের শাসনের বিলপ্তি ঘটে, বিচারপ্রার্থী যদি কোন বিচার না পায়, তাহলে সৃষ্টি হবে ডেসপারেট গ্রুপ। গ্রামের সাধারণ মানুষ বিএনপি করে না কিন্তু আওয়ামী লীগকেও পছন্দ করে না। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের আওয়ামী লীগ নেতাদের নানামুখী নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে এসব মানুষ। দেশ এখন যে অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে তাতে শেখ হাসিনার পক্ষেও সম্ভব নয় গ্রামের একজন রিকশা চালকের যুবতী মেয়ের নিশ্চয়তা দেয়া। কারণ প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের মাখামাখি চরমে পৌঁছে গেছে। উভয় পক্ষের অভিন্ন স্বার্থ। এসব কারণে সমাজে একটি বিরাট অসহনীয় গ্রুপ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এরা শুধু বিরোধী জোটের নয়, সরকার দলেরও আছে। এন্টি আওয়ামী লীগের একটি বড় গ্রুপ। যারা দীর্ঘদিন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এরা অবশ্য সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগের একগুঁয়ে মনোভাব ও স্বৈরাচারী আচরণের কারণে। ক্ষমতার দাপটে আওয়ামী লীগের বিভাজনটি দৃশ্যমান নয়। যে কারণে বেগম খালেদা জিয়া কেবল ২০ দলের নেত্রী নয়, তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন দল-মত-নির্বিশেষে সব বঞ্চিত নাগরিকের। একসময় যেমন খালেদার নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে যায় তার ছেলেরা। একইভাবে হাসিনাও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা তার ভাবাপন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ব্যাংকার ও বিশ্লেষক মামুন রশীদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অর্থনৈতিক রিপোর্টার হামিদ বিশ্বাস।
মামুন রশীদ বলেন, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ। কারণ ভারত বনাম পাকিস্তান পরস্পরবিরোধী অবস্থান, ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান, জাপান বনাম চীনের দ্বন্দ্ব, এশিয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান, আমাদের সমুদ্রসীমায় চীনের অধিকতর আগ্রাসী হস্তক্ষেপ। এগুলো এখন রাজনীতির অংশ। এখন ভারত চায় চীনকে খুশি রাখতে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। চীনের কোম্পানিগুলোকে কন্টাক্ট দিলে চীন রাজনৈতিকভাবে আমাদের সমর্থন দেবে। সে কারণে ‘চায়না ইজ এ বিগ ফ্যাক্ট ইন দি ওয়ার্ল্ড নাও’। এখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে অনেকটাই কুপোকাত করে ফেলেছে ইউরো পতন বা তেলের দাম কমানোর মাধ্যমে। কিন্তু চায়নাকে কতটুকু পারবে, যদি না পারে; যুক্তরাষ্ট্রের কথাইবা তারা শুনবে কেন? আবার ভারত মনে করে কোন সরকার তাকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেবে। এদিকে বিএনপি হলো ভারতবিরোধী। সমর্থক গোষ্ঠীদের অনেকে চাইবে না বিএনপি পুরোপরি ভারতের কাছে আওয়ামী লীগের মতো নতজানু হয়ে যাক। এই যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপড়েন। আবার বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটা ব্যাপক শান্তিপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে এ সরকারের আমলে। তারা এ শান্তিটা বিঘœ হোক চায় না। তারাও প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করছে ভারতের নতুন সরকারের ওপর। এদিকে রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে থমাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, বাংলাদেশে ইসলামপন্থি একটি দল সরকারের অংশ হলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ভাল হয়। থমাসের সে থিওরি আজও অব্যাহত রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শুধু মুসলমানই নয়, ধর্মপ্রাণ মুসলমান। এ ধর্মকে কেন্দ্র করে যে কোন সময় একটা নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সে কারণে সরকারের একটি ইসলামপন্থি দল অথবা ইসলাম ভাবাপন্ন সরকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে। একইভাবে ভারতের থিংট্যাঙ্ক, প্রণব মুখার্জি যাদের নিয়োগ দিয়েছেন তারা মনে করেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের জন্য ভাল হয়। এ দেশের হিন্দু ও তাদের আত্মীয়স্বজন যারা পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছেন, তাদের জন্যও ভাল হয়। প্রণব মুখার্জির এ থিওরি মোদি সরকার হয় ফলো করছে না কনভিন্সড।
মামুন রশীদ বলেন, রাষ্ট্র ও সরকার মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। আগে ছিল বাকশাল। বাকশাল হলো একদলীয় সরকার। আর বর্তমানে চলছে একদলীয় রাষ্ট্র। একদলীয় রাষ্ট্র অনেক বেশি ক্ষতিকর ও আগ্রাসী। এটির ফলাফল ভাল হয়েছে বলে ইতিহাস তা প্রমাণ করে না। এরশাদের মতো অতি সুবিধাবাদী বিরোধী দল, বিএনপির মতো অপরিণামদর্শী দল, দুর্বল প্রশাসন এবং সুবিধাবাদী বাহিনীর কারণে একদলীয় রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।