এক শক্তিমান অভিনেতার বিদায়

স্টাফ রিপোর্টার | ২০১৫-০৩-২৫ ৯:০১
না ফেরার দেশে চলে গেলেন শক্তিমান অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা সিরাজুল ইসলাম। গতকাল সকাল নয়টায় তিনি রাজধানীর নিকেতনস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৮। তিনি স্ত্রী সৈয়দা মারুফা ইসলাম, এক ছেলে মোবাশ্বেরুল ইসলাম, দুই মেয়ে ফাহমিদা ইসলাম ও নাহিদা ইসলামসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। গতকাল বাদ আছর নিকেতন জামে মসজিদে জানাজার পর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। সিরাজুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ই মে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায়। ছোটবেলা থেকেই জন্মস্থানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘রাঙ্গাদীঘি’র পাড়ে বসে কবিতা লিখতেন সিরাজুল ইসলাম। তখনকার কবিতাগুলোর বিষয়বস্তু কি ছিল তা পুরোপুরি মনে না করতে পারলেও এটুকু বলা যায়, প্রকৃতি নিয়ে তখন তার কবিতা চর্চাটা বেশি ছিল। পাশাপাশি অভিনয়টাও ছিল তার দখলে। স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নাটক মঞ্চস্থ হতো। সে নাটকে সিরাজুল ইসলামের অভিনয় করা ছিল নিয়মিত। সে সময় তার স্কুলের বাংলার এক শিক্ষকই মূলত তাকে অভিনয়ে উৎসাহী করে তোলেন। তিনি সিরাজুল ইসলামকে অভিনয়ের সুযোগ করে দিতেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলো। তখন সিরাজুল ইসলাম নবম শ্রেণীর ছাত্র। বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে সিরাজুল ইসলামের বাবা সে সময় চলে আসেন ঢাকায়। বসবাস শুরু হয় বাংলাবাজারে। সেখানকার কিশোরীলাল জুবিলী স্কুলে ভর্তি হন সিরাজুল ইসলাম। শুরু হয় তার নতুন জীবন, ঢাকার জীবন, একেবারে অন্যরকম জীবনযাপন- পুরোপুরি হুগলী থেকে আলাদা। এখানে এসে মঞ্চে অভিনয়ে মনোযোগী হয়ে উঠেন তিনি। সিরাজুল ইসলাম যেসব স্থানে মঞ্চাভিনয় করতেন সেখানে বেতারের স্টাফ আর্টিস্ট রণেন কুশারীর যাতায়াত ছিল। তিনি একদিন সিরাজুল ইসলামের অভিনয় দেখে সরাসরি তাকে রেডিওতে অভিনয়ের কথা বলেন। রণেন কুশারী অনেকটা জোর করেই সিরাজুল ইসলামকে ধরে নিয়ে বেতারে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। শুরু হয় ক্যাজুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে বেতারে সিরাজুল ইসলামে যাত্রা। ‘রুপালি চাঁদ’ নাটকে একজন স্কুলশিক্ষকের চরিত্রে বেতারে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। এরপর মঞ্চ ও বেতারে সমানতালে ব্যস্ত সময় পার করেন। এর মধ্যে ম্যাট্রিক দেয়া হলো। পরিবারের প্রধান কর্তা সিরাজুল ইসলামের বাবাও মারা গেলেন। সিরাজুল ইসলাম বেতারে প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করলেন। তার প্রথম প্রযোজনা ছিল ‘বৃষ্টি’। এ নাটকটি নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ইংরেজি গল্পের অনুবাদ করে। ‘বৃষ্টি’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন খান আতাউর রহমান, ডা. সাঈদুন্নেসা হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন। এরপর এভাবেই চলতে থাকে তার জীবন। কায়দে আজম কলেজেও কেটেছে তার ছাত্রজীবন। কবি ফজল শাহাবুদ্দিন তার সেই ছাত্রজীবনেরই বন্ধু। ১৯৫৬ সালে তদানীন্তন পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্টে তার চাকরি হয়। যা পরবর্তীকালে নাম হয় ফিল্মস ডিভিশন এবং বর্তমানে ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন নামেই পরিচিত। ১৯৬৫ সালে এ সময়ের জনপ্রিয় নাট্যাভিনেতা আবুল হায়াতের ফুফাতো বোন মারুফা ইসলামের সঙ্গে সিরাজুল ইসলামের বিয়ে হয়। আবুল হায়াত তখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি অভিনয়েও বেশ ব্যস্ত। এমএ বারী নিবেদিত, ইস্টার্ন থিয়েটার্সের মালিক মাজীদ প্রযোজিত, মহীউদ্দিন পরিচালিত ‘রাজা এলো শহরে’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে সিরাজুল ইসলামের অভিষেক ঘটে। এ ছবিতে তিনি একজন প্রফেসরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রফেসর সালাউদ্দিন পরিচালিত ‘ধারাপাত’ ছবিতে অভিনয় করে চলচ্চিত্রে প্রথম পারিশ্রমিক পান সিরাজুল ইসলাম। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সে সময় তিনি ১১০০ টাকা পেয়েছিলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, যে কারণে বেতার থেকে ১৫ টাকার বেশি পাওয়া যেত না অভিনয় করে। চলচ্চিত্রে পরবর্তীকালে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে বেতার ও মঞ্চে খুব কমই সময় দিতে পেরেছেন সিরাজুল ইসলাম। পরিচালক মহীউদ্দিনের প্রায় সব ছবিতেই তিনি অভিনয় করেছেন। প্রায় তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সিরাজুল ইসলাম অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘নাচঘর’, ‘অনেক দিনের চেনা’, ‘শীত বিকেল’, ‘বন্ধন’, ‘ভাইয়া’, ‘রূপবান’, ‘উজালা’, ‘১৩নং ফেবু ওস্তাগার লেন’, ‘নয়নতারা’, ‘আলীবাবা’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’, ‘নিশি হলো ভোর’, ‘সপ্তডিঙ্গা’, ‘মোমের আলো’, ‘ময়নামতি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘জাহা বাজে শাহনাই’, ‘বিনিময়’, ‘ডুমুরের ফুল’ ইত্যাদি। ১৯৮৫ সালে ‘চন্দ্রনাথ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সিরাজুল ইসলাম। ১৯৮০ সালে সিরাজুল ইসলাম প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন জাফর। এ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন  শাবানা, বুলবুল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, গোলাম মুস্তাফা, রানী সরকার, সুমিতা দেবী, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। এ ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হওয়ার কারণে একই প্রযোজক তাকে দিয়ে ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন ‘সোনার হরিণ’ ছবিটি। সে সময়ের এমন কোন শিল্পী নেই যিনি এ ছবিতে কাজ করেননি। এ ছবিতেই প্রথম ও শেষবারের মতো একসঙ্গে অভিনয় করেন শাবানা, কবরী, ববিতা ও সুচরিতা। ছিলেন রাজ্জাক (দ্বৈত চরিত্রে), বুলবুল আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা ও সুমিতা দেবীর মতো শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী। এ ছবিটিও ব্যাপক ব্যবসা সফল হয়। ১৯৮২ সালে শুরু হয় শাবানাকে নিয়ে ‘পুতুলের বিয়ে’ ছবির নির্মাণ কাজ। বিপরীতে রাজ্জাক। কিন্তু অকস্মাৎ সিরাজুল ইসলামের মায়ের মৃত্যুতে সামগ্রিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। এ কারণে আর ‘পুতুলের বিয়ে’ শেষ হয়নি। সিরাজুল ইসলাম সর্বশেষ ‘আড়ং’ ছবিতে কাজ করেছেন।

শোক
আতাউর রহমান
খুবই খারাপ লাগছে কথাটা শুনে। সিরাজ ভাইয়ের মতো এমন একজন মানুষের চলে যাওয়া আমাদের সবার জন্য সত্যিই কষ্টের। তিনি অত্যন্ত গুণী একজন অভিনেতা ছিলেন। মঞ্চ, চলচ্চিত্র, টিভি নাটকে সবক্ষেত্রেই ছিল তার বিচরণ। শুধু তাই নয়, সেসব ক্ষেত্রে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষরও রেখে গেছেন। তার এই চলে যাওয়াটা সত্যিই আমাদের নাট্যাঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
আফরোজা বানু
রেডিও ও টেলিভিশন দুই মাধ্যমেই সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। একজন অভিনেতা হিসেবে যেমন অত্যন্ত ভাল, তেমনি মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। শুটিং সেটে যতক্ষণ থাকতেন সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। সিরাজ ভাই আজ নেই, এ কথাটি যেন মেনে নিতেই পারছি না। তবুও পৃথিবীর এই নিয়মের বাইরে তো আর যাওয়া সম্ভব না। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
তিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ ছিলেন। অহংকার বলে যে একটা ব্যাপার আছে সেটা তার মাঝে দেখিনি কখনও। আমাদের মাঝ থেকে সব গুণী মানুষ একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন। সিরাজ ভাইয়ের মতো বর্ষীয়ান অভিনেতার চলে যাওয়া ক্ষতিই বটে। এ ধরনের মানুষ আর আসবেন না। তার মতো  অভিনেতাকে আমরা আর পাবো না, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগছে। পরকালে সিরাজ ভাই শান্তিতে থাকুন এটাই কামনা করি।
মামুনুর রশীদ
সিরাজ ভাই যে আমাদের নাটক সিনেমা সর্বোপরি মিডিয়ার জন্য এক নক্ষত্র ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা আজ তাকে হারালাম। এভাবে সবাইকে যেতে হবে একদিন। তবে তার চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। একজন গুণী অভিনেতার চলে যাওয়া মানে একটা জায়গা শূন্য হয়ে যাওয়া। কখনও এ জায়গাটি হয়তো পূরণ হবে না। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
তারিক আনাম খান
সিরাজ ভাইয়ের অভিনয় দেখেছি। তার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও কম নেই। মাঝের লম্বা একটা সময় অসুস্থতার জন্য অভিনয় করতে পারেননি। গত বছর ফিরেছিলেনও। কিন্তু আজ যখন শুনলাম তিনি আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন, মানতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। অবশ্য স্বাভাবিক বয়সেই তার মৃত্যু হয়েছে। আমি তার আত্মার মাগফিরাত করি।
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত একজন মানুষ ছিলেন। কাছাকাছি না এলে বোঝা যেত না খুব সহজে মানুষকে কতটা আপন করে নিতেন সিরাজ ভাই। খুবই কষ্ট পাচ্ছি। তার চলে যাওয়ায় আমাদের জন্য অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। একজন গুণী মানুষের সঙ্গে যত দিন থাকা যায় ততদিনই তার কাছ থেকে শেখা যায়।