সাফল্য নেই তারপরও রিমেক ছবি

মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন | ২০১৪-০১-০৬ ৯:৫২
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রিমেক (পুনঃনির্মিত) ছবির সাফল্যের সমৃদ্ধ কোন ইতিহাস নেই। এ পর্যন্ত যতগুলো ছবি রিমেক হয়েছে তার মধ্যে হাতেগোনা দু-একটি ছাড়া বাকি সবই বড় রকমের ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে। সাফল্য পাওয়া ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ‘রঙিন রূপবান’ ও ‘রঙিন রাখাল বন্ধু’। এর বাইরে আর যত ছবি নির্মিত হয়েছে সেগুলো সাফল্যের মুখ দেখেনি। ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পা যখন সবচেয়ে সফল জুটি তখনই তাদের নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল রঙিন ‘মালকাবানু’। কিন্তু দর্শকরা ছবিটি গ্রহণ করেনি। এরপর ইলিয়াস কাঞ্চন ঘোষণা দিয়ে রিমেক ছবিতে অভিনয় না করার সিদ্ধান্ত নেন। অথচ শাবানা-জাভেদ অভিনীত ‘মালকাবানু’ সুপারডুপার হিট হয়েছিল। এরপর সালমান শাহ যখন জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে, সালমান-শাবনুর যখন দর্শক পছন্দের জুটি, ঠিক তখনই তাদের নিয়ে নির্মিত হয় ‘রঙিন সুজন সখি’। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কবরী-ফারুক জুটি খান আতার সুজন সখির ধারের কাছ দিয়েও যেতে পারেনি সালমান-শাবনুরের ‘সুজন সখি’। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে শাবনুরের জীবনে। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময় ওমর সানির সঙ্গে জুটি বেঁধে নির্মাণ করা হয় ‘রঙিন নয়নমণি’। কিন্তু ববিতা-ফারুক অভিনীত আমজাদ হোসেনের সাদা কালোয় নির্মিত নয়নমণির সাফল্যের ছিটেফোটাও এই ছবির ভাগ্যে জোটেনি। মৌসুমী-ওমর সানি যখন জনপ্রিয়তায় শীর্ষে, তখন তাদের নিয়ে নির্মাণ করা হয় ‘রঙিন রংবাজ’। কিন্তু নায়করাজ রাজ্জাকের ‘রংবাজ’-এর ধারের কাছেও ঘেষতে পারেনি এই ছবিটি। দর্শক ছবিটিকে গ্রহণ করেনি। এরপর ‘রঙিন সমাধি’। শাকিব খান যখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী তখন তাকে নিয়ে নির্মাণ করা হয় ‘রঙিন সমাধি’। সঙ্গে শাবনুর ও আমিন খান। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য নায়করাজ রাজ্জাককে নিয়ে দিলীপ বিশ্বাসের ‘সমাধি’ ছবিরই সমাধি রচনা করে ফেলে ছবিটি। সর্বশেষ ও জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে ‘দেবদাস’। চাষী নজরুল ইসলাম বুলবুল আহমেদ-কবরী, রহমান ও আনোয়ারাকে নিয়ে আশির দশকে শরৎ চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘দেবদাস’কে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। সেই চাষী নজরুল ইসলামই ২০১৩ সালে শাকিব খান, অপু বিশ্বাস, শহীদুজ্জামান সেলিম ও মওসুমীকে নিয়ে পুনরায় ‘দেবদাস’ বানিয়ে জীবনের সেরা ব্যর্থতার স্বাদ নিয়েছেন। রঙিন ‘দেবদাস’ দর্শকদের মন জয় করতে পারেনি। রিমেক ছবির জলজ্যান্ত ব্যর্থতার পরও অসীম সাহস নিয়ে জাকির হোসেন রাজু নির্মাণ করছেন ‘ময়নামতি’। রাজ্জাক-কবরীকে নিয়ে কাজী জহিরের অমর সৃষ্টি ‘ময়নামতির’র রিমেক করছেন রাজু। যদি এই ছবিটির ছায়া অবলম্বনে নব্বই দশকে ইফতেখার জাহান নির্মাণ করেছেন ‘প্রেমের সমাধী’, যাতে অভিনয় করেছিলেন শাবনাজ, বাপ্পারাজ এবং অমিত হাসান। এই ছবিটিও দর্শক দেখেনি। আরেকটু পিছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে রিমেক ছবি নির্মাণের ব্যর্থতা নায়করাজ রাজ্জাকেরও আছে। তিনি তারই সফল ছবি ‘সৎ ভাই’-এর রিমেক বানিয়েছিলেন ‘সন্তান যখন শত্রু’ এবং ‘বদনাম’-এর রিমেক ‘প্রেমের নাম বেদনা’। দুটি ছবিই সাফল্যের মুখ দেখেননি। ফলে এর থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্জাক পুত্র বাপ্পারাজ পিতার ‘বেঈমান’ রিমেক করতে রাজি হননি। তিনি নামটি শুধু নিয়ে পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবিটি নতুন গল্প নিয়ে নির্মাণ করবেন। কিন্তু এতো সব জ্বলন্ত উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও জাকির হোসেন রাজুর ‘ময়নামতি’র পাশাপাশি নতুন পরিচালক আতিক রহমান নির্মাণ করছেন শিবলি সাদিকের ‘অন্তরে অন্তরে’। এখানে সালমান-মৌসুমীর জায়গায় তিনি নিয়েছেন নীরব ও অমৃতা খানকে। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা এটাকে বেশ সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন। কারণ, কাজী জহির আর শিবলি সাদিকের মতো দিকপাল পরিচালকের ছবি পুনর্নির্মাণের মতো সাহস তারা দেখাচ্ছেন। হয়তো সফলও হতে পারেন। কিন্তু রিমেক ছবির ইতিহাসে আরও কিছু ঘটনা আছে, যেমন বাংলাদেশের সাড়া জাগানো ছবি ‘মনপুরা’ কলকাতায় রিমেক হয়েছে কিন্তু চলেনি। চলেনি জহিরুল হকের প্রাণ সজনীও। এটিও যৌথ প্রযোজনায় দুই বাংলা মিলে রিমেক করা হয়েছিল। তারপরও স্বপ্ন দেখতে নিষেধ নেই, আশা থাকতে পারে, আছে আত্মবিশ্বাস। এই তিনের সংমিশ্রণে জাকির হোসেন রাজু ও আতিক রহমান রিমেক ছবির ইতিহাস বদলেও দিতে পারেন। চলচ্চিত্র শিল্প নতুন বছরে এমন কিছু দেখার অপেক্ষাতেই রয়েছে।