উত্তাপ নেই ভোটের মাঠে

স্টাফ রিপোর্টার | ২০১৩-১২-৩১ ২:০৬
জাতীয় নির্বাচনের আর চার দিন বাকি। কিন্তু নেই প্রচার- প্রচারণার উত্তাপ। ভোটের আমেজ নেই কোথাও। ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচনের আমেজ আগেই মিইয়ে যায়। যেসব আসনে নির্বাচন হবে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে লড়ছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। অনেক আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দাপটে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণাও চালাতে পারছেন না। তাদের এলাকা ছাড়া ও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দেয়া হচ্ছে। জাতীয় পার্টির কিছু প্রার্থী নির্বাচনে থেকে গেলেও তাদের অনেকে প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন না।  রাজশাহীতে ৬টি আসনের মধ্যে ৪টিতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের চার প্রার্থী। আর বাকি যে দুটিতে নির্বাচন হবে মূলত আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর। এতে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তাপ ছড়ালেও ভোটারদের তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। তবে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তে মাঠে নেমেছেন। তবে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে।  রাজশাহী-৩ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত তরুণ ছাত্রনেতা আয়েন উদ্দিন, কলস প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বর্তমান সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেরাজ উদ্দীন মোল্লা। এ আসনে জাপা প্রার্থী সাহাবুদ্দিন বাচ্চু কাগজে কলমে থাকলেও মাঠে তিনি থাকছেন না। অন্যদিকে রাজশাহী-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বর্তমান সরকারদলীয় সাংসদ শাহরিয়ার আলম নৌকা প্রতীক এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী রায়হানুল হক রায়হান প্রজাপতি মার্কা নিয়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন। লিফলেট বিতরণ, কর্মিসভা ও বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনার মধ্য দিয়ে চলছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিজ নিজ সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর দুইটি আসনে চারজন প্রার্থী প্রচারণায় নেমেছেন। এরা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ায় দুই আসনে আওয়ামী লীগ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। অন্যদিকে কোন পক্ষে না যেতে পেরে দলের একটা বড় অংশ প্রচারণা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। 
এদিকে প্রচারণা চালাতে গিয়ে স্বল্প সময়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে পারছেন না। কয়েকটি বাড়ি ঘুরে ও সভা-সমাবেশ করার মধ্য দিয়ে মূলত তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এছাড়া সভা-সমাবেশকে ঘিরে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ছোটখাট সংঘর্ষ ও উত্তেজনা এখন রাজশাহী-৩ ও ৬ আসনের নিত্যদিনের ঘটনা।
গতকাল সোমবার বিকালে চারঘাট উপজেলার হলদাগাছিতে নির্বাচনী সভা করতে গিয়ে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। এসময় উভয় পক্ষের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সিলেটে ভোটের আমেজ নেই: ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কোন আলোচনা নেই সিলেটে। নেই কোন তোড়জোরও। রাজনৈতিক ময়দানে নির্বাচনের কোন প্রস্তুতি নেই। নির্বাচনী এলাকায়ও নেই আগ্রহ। এই অবস্থায় অবশ্য প্রার্থীরা শেষ মূহূর্তে  ভোটারদের নির্বাচনমুখী করার শেষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সিলেট জেলায় রয়েছে ৬টি নির্বাচনী আসন। এই ৬ আসনের মধ্যে একক প্রার্থী হিসেবে ইতিমধ্যে নির্বাচিত হওয়ার পথে রয়েছেন সিলেট-১ আসনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সিলেট-৩ আসনে সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী কয়েস, সিলেট-৫ আসনে জাতীয় পার্টির সিলেট জেলা সভাপতি সেলিম উদ্দিন ও সিলেট-৬ আসনে শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এই চারটি আসনের ভোটাররা দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনী স্বাদ পাচ্ছেন না।
তবে, সিলেট-২ আসন ও সিলেট-৪ আসনে এবার ভোট হচ্ছে। এই দুই আসনেও নেই বিরোধী দলের কোন প্রার্থী। নিজ দল কিংবা জোটের প্রার্থীদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে দলের সমর্থিত প্রার্থীদের। সিলেট-২ আসনে (বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর) এবার মহাজোট থেকে প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ইয়াহিয়া চৌধুরী এহিয়া। বর্তমান সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী দলের সিদ্ধান্ত মেনে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। অন্যদিকে, এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদের সদ্য পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান। কিন্তু এই দুই প্রার্থী ভোরের মাঠ চাঙ্গা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও এই আসনের ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তেমন সাড়া নেই। কেবলমাত্র দলীয় নেতা-কর্মীরা নির্বাচন নিয়ে কিছুটা দৌড়ঝাঁপ করছেন। সিলেট-৪ আসনে (জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ) আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ। তিনি কয়েক বছর ধরে টানা ওই নির্বাচনী আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে নির্বাচন করছেন। এ কারণে এই আসনে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোন ঠাঁই নেই। এ আসনে এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদ। কিন্তু দলের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবেই নির্বাচনে নেমেছেন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার পর রোববার সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে ফারুক আহমদ অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশংকা করছেন তিনি। তবে, এক দলের দুই নেতা এই আসনে প্রার্থী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভোট নিয়ে কোন উৎসাহ ল্য করা যাচ্ছে না।
বরিশালের ৬টি আসনের মধ্যে তিনটি আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা জয়ের পথে। বাকি তিনটি আসনে নির্বাচন হলেও সেখানে কোন প্রচার- প্রচারণা নেই। এমনিতে জিতে যাবেন এমন অবস্থায় কে গাঁটের পয়সা খরচ করতে চায়। এমন ইলেকশন কস্মিনকালেও দেহিনি- মন্তব্য সত্তুর্ধ্ব বৃদ্ধ কলিমুল্লাহর। বরিশাল-১ আসনে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশাল-৫ এ শওকত হোসেন হিরণ এবং বরিশাল-৬ থেকে জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রত্না বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বরিশাল-২, ৩ ও ৪ আসনে নির্বাচন হচ্ছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কিংবা জাতীয় পার্টির সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির কিংবা বিএনএফ’র সঙ্গে। নেই মিছিল, মিটিং-সভা-সমাবেশ।  প্রার্থীদের বাড়িতেও নেই সমর্থকদের আনাগোনা। নেই পোস্টার। দেশের ইতিহাসে বিরল এক নির্বাচন এমনটাই মন্তব্য ভোটারদের। বরিশাল-২ আসনে বহু নাটকের পর আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি এড. তালুকদার মো. ইউনুছ। আওয়ামী লীগের অপর প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার শাহ আলম মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও নির্বাচনী মাঠে রয়ে গেছেন জাতীয় পার্টির নাসির উদ্দিন হাওলাদার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবিনা আক্তার। ইউনুছের নিশ্চিত বিজয় জেনে ইউনুছও নির্বাচনী মাঠে নেই, নেই অন্য প্রার্থীরাও। প্রথম প্রথম কয়েকদিন গণসংযোগ করে এখন বিশ্রামে আছেন সবাই। বরিশাল-৩ বাবুগঞ্জ-মুলাদী আসনটি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়েছে সাবেক এমপি জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপুকে। কিন্তু এ আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় নির্বাচন করতেই হচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টির টিপু সুলতানের সঙ্গে। এখানেও আয়েশেই আছেন জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু। বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগের পংকজ দেবনাথের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনএফ প্রার্থী আনজুমান সালাউদ্দিন। তবে তাদের প্রচার- প্রচারণা নিয়ে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই একই মঞ্চে দুই প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন।
খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৩টির নির্বাচন হবে। তবে নির্বাচনের তেমন কোন প্রচার-প্রচারণা না থাকায় ভোটাররা অনেকেই জানেন না কে কে প্রার্থী হয়েছে। ভোট ক্যাম্পেইনের জন্য কোন নেতা-কর্মীও বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে না। চোখে পড়ছে না কোন প্রার্থীর গণসংযোগ। নগরীর মোড়ে মোড়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নৌকা প্রতীকের কিছু পোস্টার শোভা পেলেও নেই তাদের কোন কর্মকাণ্ড। খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বটিয়াঘাটা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি পঞ্চানন বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান সংসদ সদস্য দাকোপ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ননী গোপাল মণ্ডল। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়। দুই উপজেলা জুড়ে চোখে পড়ার মতো কোন নির্বাচনী কর্মকাণ্ড দেখা যাচ্ছে না। হাটেবাজারে সরকারি দলের প্রার্থী ও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর হাতে গোনা কিছু পোস্টার দেখা যায়। তবে জাতীয় পার্টির কোন পোস্টার দেখা যায়নি। খুলনা-২ (সদর সোনাডাঙ্গা) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মহানগর সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মিজানুর রহমান মিজান। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সদ্য বহিষ্কৃত মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশিদা করিম। তিনি জাতীয় পার্টির (জেপি) মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উভয় প্রার্থীর কিছু পোস্টার ও প্রচার মাইক মাঝে মাঝে দেখা গেলেও সাধারণ জনগণ জানেন না কোন প্রার্থীর কি প্রতীক। কিছুটা প্রচার-প্রচারণা লক্ষ্য করা গেছে খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী) আসনে। এখান থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন শ্রম ও কর্ম সংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী একই দলের দৌলতপুর থানা সাধারণ সম্পাদক ও কেসিসি’র সাবেক প্যানেল মেয়র মনিরুজ্জামান খোকন। এ আসনে অপর প্রার্থী কেসিসি’র সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর শাহিদা বেগম। এখানে প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক প্যানেল মেয়রের পক্ষে নেতা-কর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মাঠে নেমেছে। যার ফলে অপর দুটি আসনের চেয়ে এ আসনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড কিছুটা দেখা যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে খুলনা-৪ (রূপসা-দিঘলীয়া- তেরখাদা) আসন থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা রশিদী সুজা, খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসন থেকে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা) আসন থেকে শেখ নুরুল হক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।