অধিকতর সহযোগিতার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

কাউসার মুমিন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে | ২০১৪-১০-৩১ ১০:৪১
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বি-রাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী দিকগুলোর ওপর জোর দিয়ে দেশ দু’টির জনমানুষের সম-মূল্যবোধ ও যৌথ-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পারস্পরিক অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ। এ উদ্দেশ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বহুমাত্রিক, বিস্তৃত ও গভীর করার প্রত্যয় নিয়ে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে দুই দিনব্যাপী তৃতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপ। এদিকে সংলাপ শেষে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১২ সালে শুরু এই অংশীদারিত্ব সংলাপকে দেশ দুটির ‘দ্বিপক্ষীয়  সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ আলোচনার ক্ষেত্র’ বলে মন্তব্য করেছে। কিন্তু এরপরও তৃতীয় সংলাপে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিতর্কিত ইস্যু ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালে বাংলাদেশের দাবি- এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কোন সুরাহায় পৌঁছতে পারেনি উভয় পক্ষ। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, এর আগে ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সংলাপের পর থেকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বেশি  শক্তিশালী। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এ বছরের তৃতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপের মূল লক্ষ্য ছিল আগামীতে অধিকতর সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং বর্তমান শক্তিশালী সম্পর্ককে আরও বড় আকারে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা।
এদিকে তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব সংলাপ শেষে গতকালের যৌথ বিবৃতিতে লক্ষ্য করার মতো বিষয়, বিবৃতিতে উভয় দেশ পরস্পরকে ‘মডারেট’ ও ‘প্লুরালিস্টিক নেশন’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। একটি মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের গণতান্ত্রিক বিশ্বে বাংলাদেশ অনেকদিন ধরেই সুপরিচিত এবং  মুসলিম রাষ্ট্রেও গণতন্ত্র সফল হতে পারে এমন ধারণার প্রথম বাস্তবায়ন এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে দিয়েই সম্ভব বলেও এক সময় মনে করতে শুরু করেন অনেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। কিন্তু বিশেষ করে বিগত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে যেখানে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই হতাশ মনোভাব রয়েছে, সেখানে উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে বর্তমান বাংলাদেশকে ‘একটি প্লুরালিস্টিক নেশন’ বলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে বাংলাদেশ সরকার নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখতেই পারে।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্যরকম ভাষ্য রয়েছে। ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এমন এক সময় একটি প্লুরালিস্টিক নেশন বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে, যখন বিশেষ করে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বহুদলীয় প্রতিনিধিত্ব ও বহুমতের প্রতিফলন নেই বলে অনেকেই মনে করেন-এটা কি মার্কিন মনোভাবের কোন পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয়? এমন প্রশ্নের জবাবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মুখপাত্র রাইয়ান নর্টন এ প্রতিনিধিকে বলেন, ৫ই জানুয়ারির  নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কোন পরিবর্তন নেই। এ বিষয়ে পার্টনারশিপ ডায়ালগে কোন আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে রাইয়ান বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনায় এসেছে। মনে রাখতে হবে, যৌথ বিবৃতি হচ্ছে সংলাপে উভয়  দেশ যে সকল বিষয় নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছেছে তার প্রতিফলন। কিন্তু এর বাইরেও সংলাপে এমন অনেক বিষয়াদি থাকে যেগুলোতে উভয় দেশ মতৈক্যে পৌঁছুতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে নিঃসন্দেহে এমন একটি ইস্যু হলো ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ডায়ালগ দুটি রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতির ওপর জোর দেয়।’ এদিকে সংলাপোত্তর যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংলাপ ইত্যাদি বিষয়ের কোন প্রসঙ্গ না থাকলেও সম মূল্যবোধের ভিত্তিতে উভয় দেশের যুব সমাজের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা, বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সক্রিয় সুশীল সমাজের প্রয়োজনীয়তা, বাংলাদেশের সুশীল সমাজের কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি ও তাদের বাকস্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার ওপর সংলাপে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
দু’দিনব্যাপী এই সংলাপের প্রথমদিন গত ২৮শে  অক্টোবর উভয় দেশের নিজ নিজ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বিষয়াবলী নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ওয়ার্কিং গ্রুপ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিনের আলোচনায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, সুশাসন ও উন্নয়ন এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়াবলী স্থান পায়।  দ্বিতীয় দিন ২৯শে অক্টোবর সকালের প্লেনারি সেশনে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর পূর্বনির্ধারিত পর্যালোচনা করেন দেশ দুটির বিভিন্ন বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ। এ পর্যায়ে উভয় দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিগণ আলোচনায় যোগ দেন। সংলাপের এই অংশে লাগসই উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন, অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও গভীর, সম্প্রসারণ ও বহুমাত্রিক করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এবারের সংলাপে প্রথমবারের মতো ইবোলা ভাইরাস, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উভয় দেশ একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় সংলাপে পর্যালোচনায় বাংলাদেশ নেভীকে প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড কাটার জার্ভিস (সমুদ্র জয়) এর কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে বলা হয় বিগত ১৭ মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নিরাপত্তা সম্পর্ক অনেক শক্তিশালী হয়েছে। এরই আলোকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আগামী ২০১৫ সালে আরও একটি কোস্টগার্ড কাটার প্রদান করবে বলে ঘোষণা দেয়। পর্যালোচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত টিকফা চুক্তির কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বলা হয়, টিকফা চুক্তি ফল দিতে শুরু করেছে। এর আওতায় প্রথমবারের মতো পোশাক কারখানার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি আমদানিতে বাংলাদেশ শুল্ক ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্র নিরাপত্তা নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ পাচার ঠেকাতে বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করে এই সকল ইস্যুতে দেশ দু’টির পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয় সংলাপে। এ ছাড়া এন্টি মানি লন্ডারিং-এ দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ডিসেম্বরে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ যৌথভাবে সেমিনার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে বহুল আলোচিত জিএসপি সুবিধা ফেরত পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা মিলেনি সংলাপে, যদিও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার স্টেট ডিপার্টমেন্ট-এর হাতে নেই। তবে শিগগিরই যাতে বাংলাদেশ জিএসপি ফিরে পায় সে লক্ষ্যে উভয় দেশ ইতিপূর্বে ঘোষিত অ্যাকশন প্ল্যান মোতাবেক একত্রে কাজ অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া সংলাপের পর্যালোচনা পর্বে বাংলাদেশের শ্রমমান ও শ্রম নিরাপত্তা উন্নয়নে ইতিবাচক অর্জনের স্বীকৃতি মিলেছে। দু’দিনব্যাপী এই পার্টনারশিপ ডায়ালগে বাংলাদেশ পক্ষের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে স্টেট ডিপার্টমেন্টের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উয়েন্ডী শেরম্যান। স্টেট ডিপার্টমেন্টের সূত্রগুলো বলছে, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব সংলাপের পরিবেশ অত্যন্ত আন্তরিক ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এবারের সংলাপের মূল টার্গেট ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিকঠাক করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল সম্ভাবনার সকল ক্ষেত্রকে এক্সপ্লোর করা, সহযোগিতার বন্ধন সমপ্রসারণ করা। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ব্যাপক, গভীর ও বহুমুখী করে প্রকৃত অর্থে একে একটি ‘রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র’ সম্পর্কে উন্নীত করার মধ্যে দিয়েই এ অঞ্চলে  কৌশলগত মার্কিন স্বার্থ নিশ্চিত হতে পারে বলে মনে করেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতিনির্ধারক কর্মকর্তারা।