উৎসব: স্মৃতি ও বাস্তবতা

ড. মাহফুজ পারভেজ | ২০১৪-১০-০৫ ৮:০৬
স্মৃতিকে নানাভাবে দেখা যায়: বিস্মৃত উৎসব-আনন্দ-আয়োজনে, হারানো মায়ের মমতায়, অপসৃয়মান প্রদোষের রঙে, প্রেমিক ললাটের শ্বেতদ্যুতিতে, কখনও বুদ্ধিজীবীদের কবরে এবং জীবন-সঘন নগরে-নদীতে-জঙ্গমে-অভিজ্ঞতায়। স্মৃতি থেকে বাস্তবের বিন্যাসে যখন দেখি, উপরে বহুতলাচ্ছিদ আকাশ, নীচে পৃথিবীর ঘাসের স্মৃতিময় পারসিক গালিচা, তার ওপর জীবন বিছিয়ে একজন মুগ্ধ কবি অবশেষে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্বায়ন ও বেনেবাদকে এড়িয়ে শুয়ে থাকেন, তখন তাঁর বুকের ‘পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল’ [জীবনানন্দ], তা-ই তাঁকে নিয়ে চলে অস্তিত্বের প্রিয় সরণিতে। আমাদের অস্তিত্বের প্রিয় পথ চলে গেছে অম্লান স্মৃতির সরণিতে, ঈদ ও নানা উৎসবের উচ্ছল আয়োজনে। তরঙ্গায়িত পদ্মা-মেঘনা-শঙ্খের নীলাভ জলে ও বেদনায়-বিষণ্নতায় আমরা স্মরণ করি হারানো স্মৃতি ও উৎসব, যা তীব্র অব্যবস্থাপনা, যানজট, দুর্ভোগের কারণে ক্রমেই অপসৃয়মান। ফলে আজকে উৎসবের স্মৃতি বলতে ব্যস্ত জীবনের নানা যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবিই ভেসে আসে। নাড়া দেয় উৎসবের সঙ্গে জীবন, সমাজ, প্রকৃতি, পরিবেশ, ধর্ম ও সংস্কৃতির অনিন্দ্য মেলবন্ধনের আবহ। এমন একটি চিত্রকল্প উদ্ভাসিত হয়, যা এখন অতীতের গর্ভে বিলীন কল্পনা মাত্র। “...ভাদ্র মাসের ভোর বেলা। স্বর্গের ঊষা মর্ত্যে নামিয়া ঘরে ঘরে শান্তি বিলাইতেছে। তাহার অমিয় কিরণে মেদিনী-গগন হেমাভ বর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে। উত্তরবঙ্গের নিম্ন-সমতল গ্রামগুলো সোনার জলে ভাসিতেছে; কর্মজগতে জাগরণের সাড়া পড়িয়াছে; ছোট বড় মহাজনী নৌকাগুলো ধবল-পাখা বিস্তার করিয়া গন্তব্য পথে ঊষাযাত্রা করিয়াছে, পাখিকুল সুমধুর স্বরলহরী তুলিয়া জগৎপতির মঙ্গলগানে তান ধরিয়াছে; ধর্মশীল মুসলমানগণ প্রাভাতিক নামাজ অন্তে মসজিদ হইতে গৃহে ফিরিয়াছে, হিন্দু পল্লীর শঙ্খ-ঘণ্টার রোল থামিয়া গিয়াছে।” মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের এমন চিত্ররূপ বর্ণনা ও প্রাত্যহিক উৎসবময়তা রূপকল্প হাল আমলে অচিন্ত্যনীয়। প্রসঙ্গত, ‘আনোয়ারা’ হলো এমন একটি উপন্যাস, যার সম্পর্কে ড. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ) বলেছেন, “জনপ্রিয়তা দিয়ে যদি কোন বইয়ের বিচার করতে হয়, তাহলে মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত ‘আনোয়ারা’র দাবিই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। ১৯১১ থেকে ১৪ সালের মধ্যে এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪৯ সালে এ বইটির ত্রয়োবিংশতি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং এ যাবৎ ‘আনোয়ারা’র দেড়লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়েছে।” ১৯৫৬ সালে মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসানের মন্তব্যের পর দীর্ঘ বছর কেটেছে এবং ‘২০১৪ সালে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস প্রকাশের শতবর্ষও উদযাপিত হচ্ছে। এর বিক্রয়ও আগের সংখ্যাকে বহু গুণে অতিক্রম করেছে। কিন্তু ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের সেই জীবন, জগৎ, চরিত্র, প্রতিবেশ, আনন্দ, বেদনা, উৎসব ও উৎসবহীনতার চিত্রমালা একুশ শতকের বিশ্বায়ন প্রভাবিত সময় ও সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে।
২.    
এক দিকে এশিয়া, অন্যদিকে ইউরোপ, গ্রাহাম গ্রিনের ‘ইস্তামবুল ট্রেন’-এর বর্ণনায় ছিল- এক পা ইউরোপে, এক পা এশিয়ায়। কথাটা বোঝার চেষ্টা করেছিলাম, বুঝিনি, ভেবেছিলাম ওটা একটা মেটাফর, কথার কথা প্রতীক মাত্র। কিন্তু আমাদের হারানো স্মৃতির কথা ভেবে এক লহমায় পরিষ্কার হয়ে গেল। মানুষ তো আসলেই অতীতের গর্ভে লালিত ভবিষ্যতের সন্তান। মানববংশের এক পা অতীতে আর অন্য পা ভবিষ্যতের মৃত্তিকায়। যদিও ‘অস্তিত্বের অবহ-লঘুতা’ নামক কোন মিলান কুন্দেরীয় দর্শন জাগায় না, তথাপি বাংলাদেশের মানুষের সর্ব অস্তিত্বে-সর্বাঙ্গে পাওয়া যায় আদি ও অকৃত্রিম বাংলার নদী-জল-হাওয়া মাখা সুমৃত্তিকার ঘ্রাণ। প্রসঙ্গত মিলান কুন্দেরা সেই লেখক, যিনি এক সকালবেলায় গাড়ির পিছনে কিছু বই আর সামনে বউকে বসিয়ে জন্মশহর প্রাগ ছেড়ে প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। তুলনায় আটপৌরে সাধারণ মানুষ বুক পকেটে নদী আর নদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জনতা ও জনপদকে নিয়ে চলেছেন স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে ভবিষ্যতে। জীবনের পরমতম আত্মত্যাগের গৌরবময় মহিমায় উদ্ভাসিত হতে হতে মানুষ শত সঙ্কটেও উৎসবমুখর; নিজের ও সভ্যতার নির্মাতা। এ জন্যই সমগ্র মানবগোষ্ঠীর অমেয় স্মৃতি ও স্বপ্নের অপর নাম বাংলাদেশ। মানুষের মানবিক বীক্ষণে আমরা দেখি নদী ও প্রকৃতির যোজনায় প্রিয় স্বদেশের প্রত্নমায়াময়তা। বাংলাদেশকে বাস্তবতার মাটি থেকে উৎসারিত মানুষের চোখে ফ্যান্টাসির-অবাস্তব-ঝলমলে রূপকথার দেশ বলে মনে হয় না; মনে হয় সত্যিকারের কঠিন দুনিয়া, মানুষের মানচিত্র, আমাদের আবাস। একটি অচলায়তনের নিজস্ব ভূমিতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনসত্যের অভিঘাত থেকে উদ্ভূত যে সঙ্কট ও সঙ্কটমোচনের কথা মাঝে মাঝে মানুষ ভোলে যেতে চায় উৎসবমুখরতার আনন্দ ও প্রাপ্তির মাধ্যমে। জীবনসত্যের বয়ান কি ভয়ঙ্কর সেটা  জেনেও উৎসবের উজ্জ্বল আনন্দধ্বনি একমাত্র মানুষই উচ্চারণের সাহস দেখাতে পারে।
৩.
আসলেই স্মৃতির জাগরণ আর প্রতিশ্রুতির পুনরুচ্চারণেই যূথবদ্ধ-তারুণ্য-যৌবনের লেলিহানরূপ লাভ করে উৎসব। উদ্দাম বাতাসে রঙিন ফুল ও প্রজাপতির মেলায় উৎসব ছাড়া অন্য কোনভাবেই মানবসমাজই বাঁচে না। বাঙালি তো বাঁচেই না। হয়তো বারো মাসে তেরো পার্বণের ইমেজটি এদেশে হালে উপকথা বা অতিশয়োক্তিতে পরিণত হয়েছে; তথাপি অতি-অগ্রসর, অতি-যান্ত্রিক, ধনতন্ত্রের কিছু কিছু ক্ষয়িষ্ণু মানুষ ও সমাজের দেশ ছাড়া বিশ্বের সব দেশের মতোই বাংলাদেশেও  ঈদ, পূজা, ভালবাসা দিবস ইত্যাদি দ্বারা প্রবলভাবে উৎসবমুখর। তত্ত্বের ভাষা: বৃষ্টি, জল, চাষবাসের সঙ্গে শ্রমের সংযোগ যেখানে গভীর আর প্রত্যক্ষ, সেখানেই উৎসব। সেখানেই মানুষ মুখর, সেখানেই মানুষ মিশতে চায়, একের সঙ্গে অপরকে মেলাতে চায়। যদিও আমাদের প্রধান উৎসবগুলো ধর্মীয়, তবুও মানুষের সমপ্রদায়মুক্ত মনুষ্যতের টানে সমপ্রদায়-নিরপেক্ষ আবহ সে সব উৎসবের প্রধান চারিত্র্য। এজন্য উৎসব আমাদের দৈনন্দিন গ্লানি-যাতনা-অপ্রাপ্তিকে যেমন ভুলিয়ে দেয়, তেমনি দিনযাপনের পাতায় পাতায় সঞ্চারিত করে অন্য এক সুর-ব্যঞ্জনা। আমাদের সাদামাটা দিনগুলোর রঙ বদলায়। ভালবাসাকে ঘিরে অন্তরে-বাহিরে জেগে ওঠে এক মহাসমুদ্র। স্মৃতির জাগরণে যার উত্থান, প্রতিশ্রুতির পুনরুচ্চারণে যার পুনরাবৃত্তি। উৎসব তাই স্মৃতির জাগরণ, প্রতিশ্রুতিরও পুনরুচ্চারণ। উৎসবে আমরা হৃৎকমলের স্মৃতিমাখি, তারই প্রতিশ্রুতি পুনরুচ্চারণ করি স্মৃতি-সত্তার গভীর অন্তর্মূল থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে প্রবহমান ভালবাসা নামের যাপিত-জীবনের রোমাঞ্চকর একটি নদীতে ভাসতে ভাসতে।