পরিবর্তন দ্য চেঞ্জ!

| ২০১৪-০৮-১২ ৭:৫১
টেবিলের ওপর পা তুলে প্লেটে চওমিন পেঁচাচ্ছি আর মুভি চ্যানেল ঘোরাচ্ছি। থেমে গেলাম এক চ্যানেলে। চলছে ছোটকালে দেখা ক্লাসিক অ্যাকশন মুভি ‘দ্য ডার্টি ডজেন!’ সেই জেমস কোবার্ন, টেলি স্যাভালাস, অ্যান্থনি কুইন-মধুমিতা হল- চওমিনে চোখ আটকে গেল। ম্‌-ম্‌-ম্‌- কোথায় যেন মিল পাচ্ছি? মধুমিতা চওমিন, চওমিন মধুমিতা- গট ইট! টাই টুং চাইনিজ রেস্তরাঁ। আরে? তখন তো মধুমিতা সিনেমা হলের পেটের সঙ্গে টাই টুং ছিল, এখন নেই। এই চেঞ্জ কেন মধুমিতার? ফর্কে পেঁচানো চওমিনটা সাবাড় করি। ঢাকার চাইনিজ রেস্তরাঁর পরিবর্তনটা দেখা প্রয়োজন।
ঢাকার প্রথম চাইনিজ রেস্টুরেন্টের নাম চৌ চিন চৌ। এটি সেই সময়ের গুলিস্তান সিনেমা হলের বিল্ডিংয়ে ছিল। চাইনিজ বা চীনাম্যানরা-ই এই রেস্টুরেন্ট নিয়ে আসে। চীনাম্যানরা মার্কেটিং জানে। তারা ঢাকার নামকরা সিনেমা হলগুলোর প্রত্যেকটির পেটে সেঁধিয়ে দিয়েছিল একটি করে চাইনিজ রেস্তরাঁ। অনেকটা স্কুল বাচ্চাদের পিঠে ব্যাগ অথবা ক্যাঙারুর পেটে থলে যেমন। গুলিস্তানে চৌ চিন চৌ, মধুমিতায় টাই টুং, বলাকায় ইফা, বাং চিং এমন আর কি। এর কারণও ছিল। তখন ফ্যামিলি হ্যাঙ আউট অথবা বিনোদন বলতে হলে গিয়ে সিনেমা দেখাটাই ছিল মেইন। উৎসবে গেলে মানুষ এক্সট্রা টাকা সাথে নিয়েই যেত। এখন যেমন মিনাবাজার-বাণিজ্য মেলায় গেলে আপনি নিয়ে যান। মর্নিং শো শেষে লাঞ্চ টাইম- আপনার ক্ষুধা লাগবে। স্পেশাল শো’র (দুপুর) আগেও খিদে, পরেও খিদে। ম্যাটিনি শো’র (বিকাল) আগে লাঞ্চের খিদে, পরে সন্ধ্যার খিদে। ইভিনিং শো’র (সন্ধ্যা) পরে ডিনারের খিদে। আর নাইট শো’র (রাত) আগে তো ডিনারের খিদে আছেই। কোন্‌ শো আপনি খিদে ছাড়া যাবেন? যাওয়ার দরকার নেই। আছে টাই টুং, বাং চিং, চৌ চিন চৌ!
সিনেমা হল ছাড়া ঢাকার প্রথমদিককার অন্যান্য চীনা রেস্তরাঁগুলো বেশির ভাগ-ই লনসহ দোতলা বাসা নিয়ে চালাতো চীনাম্যানরা। দোতলায় পুরো পরিবার থাকতো, নিচতলা রেস্টুরেন্ট। এমন দু’টো রেস্টুরেন্ট ছিল মগবাজারের ক্যান্টন আর মিরপুর রোডের (ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোডের কোণায়) কাউলুন রেস্তরাঁ। চীনারা কাজের লোক রাখতো না। গৃহকর্তা ম্যানেজার, ছেলেরা ওয়েটার, মেয়ে-ভাতিজীরা ডিশ ওয়াশার, মা-খালারা রাঁধুনী। কাঁচাবাজারে যেত মা অথবা খালা। কাউলুন রেস্তরাঁর মা নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে ছিলেন ভীষণ জনপ্রিয়-রীতিমত সুপারস্টার! স্কুলবয় আমি নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখি এলাহি কারবার। খাঁচার মুরগিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মুরগিঅলারা কাউলুনের মাকে ডাকছে-‘মাদাম, মাদাম!’ আর মাদাম দু’হাতে ৬টা করে জ্যান্ত মুরগির ঠ্যাঙের গোছা ধরে অনবরত মাথা ডান-বামে দোলাচ্ছেন। মানে-‘নো, নো, নো!’ নো মানে-‘যা দাম বলেছি তা-ই, এক পয়সা বেশি না।’ দামের দফা-রফা হলো। দূরে দাঁড়ানো এক ৫০ সি.সি. হোন্ডার দিকে এগিয়ে গেলেন ‘মাদাম’। সেখানে শর্টস আর সদরঘাটের স্যান্ডো গেঞ্জি পরা এক মোটকা ‘ব্রুস লী’ বসা। সম্ভবত মাদামের ছেলে। মাদাম গিয়ে বসলেন ৫০ সি.সি. হোন্ডার পেছনে। দুই হ্যান্ডেলে ৬টা-৬টা মোট ১২টা জ্যান্ত মুরগি ঝুলছে। হোন্ডা স্টার্ট নিয়ে ছুটে চলেছে কাউলুনের দিকে। মুরগিরা স্লোগান আর মিছিলে মুখরিত করে তুলছে রাজপথ!
আপনি হয়তো বলতে পারেন এখানে পরিবর্তনটা কোথায়? পরিবর্তনটা হচ্ছে-এই যে মাদাম নিজ হাতে কাঁচাবাজার করে হোন্ডায় ছুটে চলেছেন, ইনি হচ্ছেন একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টের মালিক। ইনি আমাদের চাইনিজ খাওয়া শিখিয়েছেন। এই মাদাম নিজে রেঁধেছেন। এই মাদাম বর্তমান বাংলাদেশের সেই মাদামদের মতো না, যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশাল বিশাল রেস্টুরেন্ট ফেঁদে বসেন শুধুমাত্র নিজের স্ট্যাটাস সিম্বলের জন্য, শুধুমাত্র স্বামীর কালো টাকা সাদা করার জন্য। জীবনে বাজার তো দূরের কথা, রেস্টুরেন্টের কিচেনেও ঢুঁ মারেন নি। দিনে দু-চার বিশ লাখ টাকা লসে এদের কিছুই আসে যায় না!
ঐতিহ্যবাহী বা সেকেলে চীনা রেস্তরাঁয় লাল রঙের অতি ব্যবহার কারো চোখ এড়ানোর কথা না। সাইন বোর্ডে লাল, পর্দায় লাল, টেবিল ক্লথগুলো লাল, আলো আঁধারীর আলোয় লালের আভা। চীনারা রেস্তরাঁয় তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয় যা অর্থপূর্ণ। লাল রঙের ব্যবহার, মধুর সফট জলতরঙ্গের মিউজিক এবং প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো-আঁধারীর আবহ। চীনারা মনে করে ‘লাল রঙ যেহেতু উত্তেজক, তাই এটা মানুষের অন্যান্য রিপুর সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রের রিপুকেও উত্তেজিত করে, ফলে খিদে চাগাড় দেয়। জলতরঙ্গের টুংটাং মিউজিক উত্তেজনাকে শান্ত এবং মিষ্টি-গতিশীল রাখে। আর অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো-আঁধারীর স্পট লাইটে সবাই ডিশ বা খাবারের প্রতি অতি মনোযোগী হয়। খাওয়া-দাওয়া চীনাদের কাছে উপাসনার মতো। চীনা খাবার সারা বিশ্বে স্বীকৃত খাবারের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
ক্যান্টন রেস্তরাঁর পরিবেশ ছিল এরকমই আলো-আঁধারী। এই আলো-আঁধারীতেই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন টেবিলে উচ্ছ্বল হাসি- আনন্দে খাবারে মশগুল থাকতো। এক সন্ধ্যায় কি প্রয়োজনে রেস্তরাঁর মূল লাইট অন করে দেয়া হলো। সব টেবিলের উচ্ছ্বলতা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। তারপর-ই সবার উচ্ছ্বল তালি।
এবার আসুন কল্পনার ‘পরিবর্তনে’। সময়ের প্রয়োজনেই আপনাকে এ ধরনের একটি আলো-আঁধারী ক্যান্টন রেস্টুরেন্টে জোড়ায় জোড়ায় বসার অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হবে। আমি নিশ্চিত অন্ধকারাচ্ছন্ন আলো- আঁধারীতে আপনি পরিবারের উচ্ছ্বল হাসি-আনন্দের বদলে যুগলবন্দি ফিসফিসানি সব অদ্ভুত আওয়াজ শুনবেন। আপনি পরিবারসহ রেস্টুরেন্টে ঢুকেছেন দাদুসহ। হঠাৎ প্রয়োজনে রেস্তরাঁর মূল লাইট অন করা হলো। আমি জানি উজ্জ্বল আলোয় সকলের হাত অত্যাধুনিক  মোবাইলফোনে আপনি যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখবেন, তাতে আরেকটু রসযোগ করে আপনাকে টিজ করার জন্য হয়তো হাওয়া থেকে ১৯৫৮ সালের ‘হাওড়া ব্রিজ’-এর সেই উত্তেজক গানটি ভেসে আসবে-‘মেরা নাম চিন চিন চু, চিন চিন চু বাবা চিন চিন চু, রাত চাঁদনী ম্যায় অউর তু-হ্যাল্লো মিস্টার হাউ ডু ইউ ডু!’
ভ্যাবাচাকা খাওয়া আপনি হয়তো বা উত্তরে বলতে যাবেন, ‘চিন চিন চু না, আমাদের প্রথম চাইনিজ রেস্তরাঁ ছিল চৌ চিন চৌ’, কিন্তু ততক্ষণে দেখবেন উজ্জ্বল আলোর এই অসহ্য দৃশ্য দেখে দাদু উল্টোদিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিয়ে আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছেন, ‘চে...ঞ্জ!’