সৈনিক নজরুল

| ২০১৪-০৫-২৫ ৮:৩৩
কুমিল্লায় নজরুল
জাহিদ হাসান, কুমিল্লা থেকে: জানা যায়, কুমিল্লা গোমতীর এপারে প্রমীলা ওপারে নার্গিস। কবি নজরুল ইসলামের হূদয়ের দুই সারথী। এ দু’জনকে ঘিরেই কবি নজরুলের প্রেম আর বিরহের অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত কেটেছে কুমিল্লা শহর ও মুরাদনগরের দৌলতপুরে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহুল স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লা শহর ও দৌলতপুর থেকে কবির অনেক স্মৃতিচিহ্ন এখন বিলুপ্তির পথে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, শহরের নজরুল এভিনিউ ও ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশে রানীর দীঘির পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে কবির দুটি স্মৃতিফলকের পাশে এখন রয়েছে ডাস্টবিন। এমনই ধৃষ্টতা ও চরম অযত্ন অবহেলায় কুমিল্লা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কবি কাজী নজরুলের স্মৃতি চিহ্নগুলো। জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা আসেন পাঁচবার। কবি কুমিল্লায় অবস্থান করেন প্রায় ১ বছর। কবির বিয়ে থেকে শুরু করে দু’দফায় গ্রেপ্তার হন এ জেলায়। প্রমীলা দেবীর বাড়ি, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে কবিতা গানের আসর, ঝাউতলায় গ্রেপ্তার হওয়া, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার, নানুয়া দীঘির পাড়, দারোগা বাড়ি, ইউছুফ স্কুল রোড, মহেশাঙ্গন, কুমিল্লা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন ও মাঠ, দক্ষিণ চর্থায় শচীন দেব বর্মনের বাড়ি, নবাব বাড়ি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি, নজরুল এভিনিউ, কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, রানীর দীঘির পাড়, রেল স্টেশন, কোতোয়ালি থানা, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং মুরাদনগরের দৌলতপুরসহ কুমিল্লা শহরের অসংখ্য স্থানে কবির স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে কবির প্রথম আগমন ঘটে জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে। এ গ্রামে আসেন কবির পূর্ব পরিচিত বন্ধু আলী আকবর খানের আমন্ত্রণে। এ সময় আলী আকবর খানের বোনের মেয়ে সৈয়দা নার্গিস আরা খানমের মাঝে তার মানসীর ছবি খুঁজে পান। দু’জন দু’জনার কাছাকাছি আসেন। এ প্রেম পল্লবিত হয়ে প্রণয়ে পরিণত হয়। কবি নার্গিসকে একই বছরের ১৭ই জুন বিয়ে করেন। যা ছিল তার জীবনের প্রথম বিয়ে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কবি বাসর রাতেই দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসেন। শহরে কবি ইন্দকুমার সেনের বাসায় অবস্থান করেন। দৌলতপুরে মামার বাড়িতে কবির সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে স্থায়ী না হলেও শহরে কবি ইন্দকুমার সেনের বাসায় অবস্থানকালে তার ভ্রাতৃজয়া গিরিলা দেবীর একমাত্র কন্যা আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলার (কবির দেয়া নাম) সঙ্গে পরিচয় প্রেম এবং তারপর ১৯২৪ সালের ২৫শে এপ্রিল শুক্রবার কলকাতার ৬নং হাজী লেনে তাদের বিয়ে হয়। কবি দ্বিতীয়বার কুমিল্লায় আসেন ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে। এ সময়ে তিনি বৃটিশবিরোধী গান গাওয়ার কারণে গ্রেপ্তার হন। ১৯২২ সালের ২৩শে নভেম্বর শহরের ঝাউতলা থেকে দ্বিতীয়বারের মতো গ্রেপ্তার হন কবি। সর্বশেষ কবি পঞ্চমবারের মতো কুমিল্লায় আসেন ১৯২৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরপরই। এ ছিল তার কুমিল্লায় শেষ আসা। কবি নজরুল আর নার্গিসের বিচ্ছেদ হলেও ১৫ বছর অপেক্ষার পর কলকাতা থেকে তার তালাকনামা এনে নার্গিস পরে কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন।

নামাপাড়ার বটতলা
খালিদ মাসুদ, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) থেকে: নামাপাড়ার বটতলা। এ বটের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন কিশোর নজরুল। ১৯১৪ সালে আসানসোল শহরের ওহেদ মিয়ার রুটির দোকানে চাকরি করতেন কবি। ওই সময় ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামের দারোগা কাজী রফিজ উল্লাহ কবিকে নিয়ে আসেন তার বাড়িতে। সেখানে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন দুই বছর। এ সময়ে কবি পড়তেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। কবি প্রথমে কাজী রফিজ উল্লাহ এবং পরে ত্রিশাল নামাপাড়ার বিচুনিয়া বেপারির বাড়িতে জায়গির থাকতেন। ১৯১৫ সালে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তিনি নবম শ্রেণীতে ওঠেন। এর কিছুদিন পর কবি কাউকে কিছু না জানিয়ে ত্রিশাল ছেড়ে চলে যান। কবি যখন ত্রিশালে ছিলেন, তখন তার সময় কাটতো নামাপাড়ার বটতলায়। আপন মনে সেখানে বসে কবি বাঁশি বাজাতেন। চঞ্চল সেই কিশোর নজরুলকে নিয়ে এখানকার মানুষ গর্ব করে। আজও নামাপাড়ার বটগাছ নজরুলের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নেই শুধু নজরুল।

সাংবাদিক যখন-
যুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সঙ্গে  থাকতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহররম, ফাতেহা-ই-দোয়াজদম। এই লেখাগুলো সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব কবিতা দু’টির প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এ থেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সঙ্গে  নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, আফজালুল হক প্রমুখের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতার দুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদার আড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায় অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশির ভাদুড়ি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সঙ্গে। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে  সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

কখন কোথায়
* ১৯২৮ সালের অক্টোবর মাস কবি যান সিলেটে। যোগ দেন সুর্মাভেলি ছাত্র সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়ে।
* ১৯২৯ সালে কবি যান চট্টগ্রামে। বেশ কিছু দিন সেখানে থাকেন। থাকেন হাবীবউল্লাহ বাহার ও সামসুন্নাহার মাহমুদের বাসায়। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি নোয়াখালী যান। সেখানে তাকে দেয়া হয় বিশাল সংবর্ধনা। কবিকে দেয়া হয় উপহার হিসেবে সোনার দোয়াত-কলম।
* ১৯২৯ সালে কলকাতায় ফিরে যান।
* ১৯৩২ সালে কবি আসেন সিরাজগঞ্জে। সেখানে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম তরুণদের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।
* ১৯৩৬ সালে কবি ফরিদপুর আসেন এবং মুসলিম ছাত্র-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।
* কবি এর আগে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল, মানিকগঞ্জের তেওতা ও কুমিল্লায়।

সৈনিক নজরুল
১৯১৭ সালের শেষ দিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯২০ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। রেজিমেন্টের এক পাঞ্জাবি মৌলভীর কাছে তিনি ফার্সি ভাষা শিখেন। এছাড়া সহসৈনিকদের সঙ্গে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে একই সঙ্গে। করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন তার মধ্যে রয়েছে- বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প- হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা- সমাধি ইত্যাদি। করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এই সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফার্সি কবি হাফিজের কিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায়, নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি করাচি সেনানিবাসেই। এক সময় রেজিমেন্টটির ইরাক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় তাদের আর যাওয়া হয়নি। যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এরপর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।