আমাদের সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধ

মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন | ২০১৪-০৩-২৬ ১১:১৫
আমাদের সিনেমায় মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার সংগ্রাম ফুটে উঠেছে বিভিন্নভাবে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্য, মুক্তদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্যচিত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় আন্তরিকতার অভাব ছিল না নির্মাতাদের। কেবল রাজনৈতিক মতবিরোধ আর সঠিক ইতিহাসসমৃদ্ধ কাহিনীর অভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা সমৃদ্ধ হতে পারেনি। তার পরও দেশপ্রেমী নির্মাতারা থেমে থাকেননি। যখনই সুযোগ পেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন। প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় সত্য কথা বলতে গিয়ে অনেক নির্মাতাকেই যথেষ্ট বিড়ম্বনার শিকারও হতে হয়েছে। তার পরও আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ৩ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে সিনেমার পর্দায়। বেশির ভাগ ছবিই প্রশংসিত হয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বীকৃতিও পেয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রায় ৩৫-এর কাছাকাছি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। এসব ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘ওরা ১১ জন’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘জয় বাংলা’, ‘বাঘা বাঙালি’, ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ‘সংগ্রাম’, ‘ধীরে বহে মেঘনা’, আমার জন্মভূমি’, ‘মেঘের অনেক রং’, ‘কলমিলতা’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘মুক্তির গান’, আগুনের পরশমণি’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘ধ্রুবতারা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘খেলাঘর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘মেহেরজান’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘খ-গল্প ৭১’, ‘৭১-এর যোদ্ধা’, ‘গেরিলা’, পিতা’, ‘রাবেয়া’, ‘জীবনঢুলী’ এবং মুক্তির মিছিলে রয়েছে ‘মুক্তি’ ও ‘অংকুশ’। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘স্লোগান’, ‘এখনো অনেক রাত’, ‘লাল সবুজ’, ‘কার হাসি কে হাসে’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র। আর এসবের সূচনা হয়েছিল শহীদ চলচ্চিত্রকার জহীর রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ দিয়ে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন নিয়ে নির্মিত এ কালজয়ী চলচ্চিত্রকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখে। একই ঘটনা নিয়ে বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফার উপন্যাস ‘ওংকার’ নিয়ে শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেন ‘বাঙলা’। এ ছাড়াও জহীর রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘এ স্টেট ইজ বর্ণ’, আলমগীর কবিরের ‘লিবারেশন ফাইটার্স’, ইনোসেন্ট মিলিনিয়াম’, আইএস জোহরের ‘জয় বাংলাদেশ’, শুকদেবের ‘নাইন মান্থ টু ফ্রিডম, গীতা মেহতার ‘ডেডলাইন বাংলাদেশ’ নামক মুক্তদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রগুলোও সারাবিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। জহীর রায়হান স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালের দলিলপত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নির্মাণ করতে করতে স্বাধীনতার দেড় মাস পর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলে এ ছবিটি আর আলোর মুখ দেখেনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্যচিত্রের তালিকাও বেশ লম্বা। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, একাত্তরের যিশু’, ‘আগামী’, ‘হুলিয়া’, ‘সূচনা’, ‘প্রত্যাবর্তন’, ‘ওরা আসছে’, ‘ধূসরযাত্রা’, ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা’, ‘দুরন্ত’, ‘বখাটে’, ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’, ‘শরৎ ৭১’, ‘আমি স্বাধীনতা এনেছি’, ‘অনেক কথার একটি কথা’, ‘অন্যযোদ্ধা’, ‘কাল রাত্রি’, ‘অস্তিত্বে আমাদের দেশ’, ‘শিলালিপি’, ‘রিফুইজি ৭১’, ‘দি কান্ট্রি অব ডিজস্টার’, ‘জয় বাংলা ও বহমান’ ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্র (৫টি ছবি- ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘ধ্রুবতারা) নির্মাণ করেছি আমি। ভবিষ্যতে আরও ছবি নির্মাণ করতে চাই। কিন্তু সঠিক ইতিহাসসমৃদ্ধ পা-ুলিপি এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে প্রতিমুহূর্তে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হই। তখন আগ্রহটা কমে যায়। আমি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য আলাদাভাবে সরকারি অনুদান, স্বনামধন্য লেখকদের এগিয়ে আসা এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ দূরে রাখার জন্য অনুরোধ জানাবো। এ তিনটি বিষয় এক হলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও বেশি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে। নতুন প্রজন্ম এবং বিশ্ব স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঠিক ইতিহাসটা জানতে পারবে। অনেক কম সময়ে সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের কৃতিত্ব সুস্থধারার চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা ইমপ্রেস টেলিফিল্মের। এই প্রযোজনা সংস্থা থেকে মাত্র দশ বছরে ৭টি মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণ হয়েছে। ছবিগুলো হচ্ছে- ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘ধ্রুবতারা’, ‘খেলাঘর’, ‘মেহের জান’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘গেরিলা’, ‘পিতা’ এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘বাঙলা’। ক্রয়সূত্রে হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ এবং তৌকির আহমেদের ‘জয়যাত্রা’ও এখন ইমপ্রেস টেলিফিল্মের। ইমপ্রেসের ব্যানারে মুক্তি পাবে ‘অংকুশ’ও ‘মুক্তি’। মুক্তিযুদ্ধের ১২টি চলচ্চিত্রের মালিক এখন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, আমাদের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। আমরা আরও মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাই। আমরা চাই, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক। বিশ্বের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা জানুক কতটা সংগ্রাম করে, কিভাবে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের জন্য ইমপ্রেস টেলিফিল্মের দরজা সব সময় খোলা। এবারের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আসন্ন ২৮শে মার্চ মুক্তি পাচ্ছে লন্ডন প্রবাসী বাঙালি পরিচালক মনসুর আলী পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের ছবি ’৭১-এর সংগ্রাম’। এ ছবিটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমাকে সমৃদ্ধ করবে বলে ছবির প্রযোজক পরিচালক আশাবাদ ব্যক্ত করেন।