চলচ্চিত্র পরিচালনায় নারীদের আগ্রহ বাড়ছে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা

মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন | ২০১৪-০৩-০৮ ৮:১৫
চলচ্চিত্র পরিচালনায় নারীদের আগ্রহ বাড়ছে। আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগে যেটা ছিল নিছক স্বপ্ন দেখার বিষয়, এখন সেটা রীতিমতো বাস্তব। দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ। ১৯৭০ সালে রেবেকা নামে এক সাহসী নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু ঘর সংসার অভিনয়, নাচ-গানের বাইরে একজন নারী নির্মাতাও হতে পারেন চলচ্চিত্রের মতো বিশাল মাধ্যমে ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ’। ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ নামে একটি ছবি বানিয়ে রেবেকা যে যাত্রার সূচনা করেছিলেন, আজ তা অগ্রযাত্রায় রূপ নিয়েছে। নারীরা এখন নিয়মিত চলচ্চিত্র পরিচালনা করছেন। এসব সাহসী নারীকে ছবি নির্মাণে উৎসাহ দেয়ার জন্য তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ঘোষণা দিয়েছেন, সরকারি অনুদানে চলচ্চিত্র নির্মাণে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ফলে আগ্রহ বেড়ে গেছে নারীদের। সমপ্রতি দু’জন অতি পরিচিত নারী চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি থেকে সহযোগী সদস্যপদ লাভ করেছেন। এরা হলেন চ্যানেল আই’র জনপ্রিয় উপস্থাপক ফারজানা ব্রাউনিয়া এবং কবি নির্মলেন্দু গুণের কন্যা নাট্যনির্মাতা মৃত্তিকা গুণ। সহসাই তারা তাদের প্রথম পরিচালিত ছবির কাজ শুরু করবেন। এর আগে আরও তিনজন নাট্যনির্মাতা চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তাদের পরিচালিত প্রথম ছবির কাজ শেষ করে এনেছেন। এরা হলেন নাট্যনির্মাতা গীতালী হাসান ও শান্তি চৌধুরী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী আফসানা মিমি। গীতালী হাসান ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মাণ করছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গল্প ‘অতৃপ্ত কামনা’ অবলম্বনে ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, শান্তি চৌধুরী নিজস্ব প্রযোজনায় নির্মাণ করছেন ‘মায়ানগর’ এবং আফসানা মিমি নির্মাণ করছেন ‘রান’। আগামীতে নারী নির্মাতাদের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। প্রথম নারী পরিচালক রেবেকা পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ ১৯৭০ সালের ৭ই মার্চ মুক্তি পায়। এরপর অপেক্ষা করতে হয় ১৬টি বছর। দীর্ঘ ১৬ বছর পর দ্বিতীয় নারী পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে বিখ্যাত অভিনেত্রী রোজীর। ১৯৮৬ সালে রোজী নির্মাণ করেন ‘আশা নিরাশা’ নামে একটি ছবি। এর দুই বছর পর ‘অর্পণ’ নামে একটি ছবি নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আরেক বিখ্যাত অভিনেত্রী সুজাতা। কিন্তু এ দু’জন একটির বেশি ছবি নির্মাণ করেননি। ১৯৯৯ সালে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন আরেক বিখ্যাত অভিনেত্রী সুচন্দা। তিনি প্রথমে নির্মাণ করেন ‘সুবজ কোট কালো চশমা’। এরপর নির্মাণ করেন জহির রায়হানের কালজয়ী সৃষ্টি ‘হাজার বছর ধরে’ নিয়ে একটি চলচ্চিত্র, যা অনেক শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। ২০০২ সালে অসংখ্য তথ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন নারগিস আক্তার। তার পরিচালিত ‘মেঘলা আকাশ’ ব্যাপক সাড়া ফেলে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য মুম্বই থেকে ঢাকায় আসেন বিখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমী ও আইয়ুব খান। মরণব্যাধি এইডস নিয়ে নির্মিত ‘মেঘলা আকাশ’ বেশ কিছু শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। প্রিয়দর্শিনী অভিনেত্রী মৌসুমী এই ছবির জন্য পান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেই থেকে নারগিস আক্তার নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চলেছেন। ইতিমধ্যে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘চার সতিনের ঘর’, ‘মেঘের কোলে রোদ’ এবং ‘অবুঝ বউ’। ‘মেঘের কোলে রোদ’ ছবিতে অভিনয় করে পপিও পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বর্তমানে নারগিস আক্তার নির্মাণ করছেন ‘পৌষ মাসের পিরিতি’, ‘শটকাটে বড়লোক’ এবং ‘যৈবতী কন্যার মন’। তার পরিচালিত ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ রয়েছে মুক্তির মিছিলে। ২০০৩ সালে জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মৌসুমীকে চলচ্চিত্র পরিচালক বানিয়ে চমক সৃষ্টি করে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি.। মৌসুমী নির্মাণ করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’। এটি সুস্থধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি.’র প্রথম একক প্রযোজনা। এরপর মৌসুমী আরেক পরিচালক গুলজারের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ছবি ‘মেহের নেগার’। বর্তমানে মৌসুমী ইমপ্রেস টেলিফিল্মের শততম ছবি পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০০৬ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মিষ্টি মেয়ে খ্যাত নায়িকা কবরী। তিনি নির্মাণ করেন এসিডদগ্ধ নারীদের নিয়ে চলচ্চিত্র ‘আয়না’। একই বছর সংবাদ পাঠিকা সামিয়া জামান আত্মপ্রকাশ করেন পরিচালক হিসেবে। নির্মাণ করেন ‘রানী কুঠির বাকি ইতিহাস’। এরপর তিনি নির্মাণ করেন ‘আকাশ কতো দূরে’ নামে একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেনের কন্যা রুবাইয়াৎ হোসেন পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘মেহেরজান’। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ভারত থেকে ঢাকায় আসেন জয়া বচ্চন ও ভিক্টর ব্যানার্জি। বর্তমানে রুবাইয়াৎ হোসেন নতুন একটি ছবির কাজ শুরু করেছেন। সর্বশেষ নারী পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি নির্মাণ করেই বাজিমাত করেছেন শিল্পনির্দেশক ও নাট্যনির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মিত তার পরিচালিত প্রথম ছবির ‘উত্তরের সুর’ ২০১২ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ৪টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছে। শাহনেওয়াজ কাকলী নিজেও পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ কাহিনীকারের পুরস্কার। সাফল্য এবং স্বীকৃতিই এখন নারী পরিচালকদের প্রধান উৎসাহ। এর সঙ্গে যদি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের পাশাপাশি অন্যান্য খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসে, সরকার যদি অনুদানের ক্ষেত্রে নারী পরিচালকদের জন্য আলাদা একটা কোটা করেন এবং নারী পরিচালকদের ছবি আয়করমুক্ত করেন, তাহলে চলচ্চিত্র নির্মাণে নারী পরিচালকদের অগ্রযাত্রা সমৃদ্ধ হবে। এবারের নারী দিবসে এটাই চলচ্চিত্র শিল্পের প্রত্যাশা।