রাজশাহীতে নির্মিত দেশের প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি

আসলাম-উদ-দৌলা, রাজশাহী থেকে | ২০১৪-০২-২১ ৮:২৯
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী কলেজে স্থাপিত হয়েছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক পরও প্রথম শহীদ মিনারের স্বীকৃতি পায়নি রাজশাহীবাসী। মহান ভাষা আন্দোলনের অংশ নেয়ায় পুলিশের তালিকায় ৩১ নম্বর আসামি কাজী জিয়ারত হোসেনের মুখ থেকে জানা গেল এ কথা। হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন ভারতে। ’৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী কলেজ মেইন হোস্টেলের সামনে দেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের ছবিটিও তুলেছিলেন তিনি। মহান ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেও সেভাবে কোন পরিচিতি পাননি কাজী জিয়ারত হোসেন। এই নিয়ে তার মাঝে কোন ক্ষোভ নেই। তবে তার একটিই দাবি তাহলো দেশের প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
ভাষাসৈনিক কাজী জিয়ারত হোসেন বলেন, ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। পড়তেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে। ভাষা আন্দোলনের সময় পরীক্ষা লাটে উঠেছিল। ’৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের গেটের কাছে যে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল ইট আর কাদা দিয়ে সেই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সময় তিনিও ছিলেন। তৎকালীন হোস্টেল সুপার মল্লিক সাহেবের বাসায় গলির মধ্যে ওই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছিল। শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সময় চারদিক থেকে পুলিশ ঘিরে নিয়েছিল। সকালের দিকে পুলিশ সেটা ভেঙেও দিয়েছিল। এই ঘটনার পর কাজী জিয়ারত হোসেন সেখানে থেকে সরে পড়লেও অনেককেই পুলিশ সেই দিন গ্রেপ্তার করে। স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, ওই সময় অনেকের নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছিল। একজন পুলিশ তার বাবা কাজী মোহাম্মদ হোসেনকে (প্রয়াত) বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলের স্মৃতিস্তম্ভটি সরিয়ে দেন।’ এরপর তার বাবা তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেন। মাসখানেক তিনি ভারতে ছিলেন। ওই সময় পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। ভারত থেকে ফিরে এসে তিনি পরীক্ষা দেন এবং পাস করেন। তিনি বলেন, রাজশাহী কলেজ হোস্টেলে যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল,  সেই স্মৃতিস্তম্ভের ছবিটিও তিনি তুলেছিলেন। এসময় তিনি ক্যামেরা নিয়ে ঘুরতেন। ছবিটি মোতাহার হোসেনের স্টার স্টুডিও থেকে ওয়াস করা হয়েছিল এবং সেটা পরে এডভোটেক মহসীন প্রামাণিকের কাছে সংরক্ষিত ছিল। স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, শুধু ভাষা আন্দোলনে নয়, মুক্তিযুদ্ধসহ প্রগতিশীল সকল আন্দোলনে তিনি যুক্ত ছিলেন। আইয়ুব খানকে জুতা মারার কারণে তার বাড়ি আক্রান্ত হয়েছিল ওই ঘটনার পর অনেক নেতাকর্মী তার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেইসব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ৭৭ বছর বয়সী এ ভাষাসৈনিকের চোখেমুখে তারুণ্য ঠিকরে পড়ছিল। তিনি ৩ ছেলে ও ১ মেয়র জনক। তিনি বলেন, একুশের চেতনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে মহান একুশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় মর্যাদা বেড়েছে। অন্যদিকে দুঃখজনক হলেও অদ্যবধি রাষ্ট্র দেশের প্রথম শহীদ মিনারটির স্বীকৃতি প্রদান করতে পারেনি। শেষ বয়সে এসে তার একটিই দাবি রাজশাহী কলেজে দেশের প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ভাষা আন্দোলনের ছয় দশকেও রাজশাহীবাসী পায়নি প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের স্বীকৃতি। এ নিয়ে অনেকবার আন্দোলনও হয়েছে। এদিকে ভাষা আন্দোলনের ৬২ বছর পূর্তিতে রাজশাহীবাসীর পক্ষে আবারও সেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি তুললেন সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তিনি সরকারের কাছে এ শহীদ মিনারটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জোর দাবি জানান।