‘সাংবিধানিক সরকার হলেই তা গণতান্ত্রিক হয় না’

স্টাফ রিপোর্টার | ২০১৪-০২-০৬ ১০:২১
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, গণতান্ত্রিক সরকার সাংবিধানিক হতে পারে কিন্তু সাংবিধানিক সরকার হলেই তা গণতান্ত্রিক হয় না। নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র নিশ্চিত হয় না। সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর উপস্থাপনায় বাংলাভিশনের    
 টকশো ‘ফ্রন্টলাইন’-এ গতকাল সন্ধ্যায় তিনি এসব কথা বলেন। এতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মনিরুজ্জামান বলেন, দেশে একটা ‘অস্বস্তিকর শান্তি’ বিরাজ করছে। একটি ভাল নির্বাচন না হলে এ অবস্থা চলতে থাকবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনের নানা রকমফের সম্পর্কে আমরা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছি। জিম্বাবুয়ে, নেপাল ও মিয়ানমারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এসব দেশে সাংবিধানিক সরকার রয়েছে কিন্তু তা গণতান্ত্রিক নয়। গণতান্ত্রিক সরকার হতে হলে সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকতে হয়, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে হয়, নাগরিক সমাজের স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার থাকতে হয়। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে নানা রকম সমস্যায় পড়তে হবে আমাদের। তা হলো- ১. পূর্ণ কর্মক্ষম সরকার হয় না। কর আদায় থেকে শুরু করে জনসংশ্লিষ্ট অনেক সমঝোতামূলক কাজ করতে গিয়ে জনগণের আস্থা পায় না। ২. অনিশ্চয়তার কারণে বড় উদ্যোক্তারা মধ্যমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত হন না। ৩. আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী উন্নত পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়। যেমন, গত দুই বছরে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কোন রাষ্ট্রপ্রধান আমাদের দেশে আসেননি। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রধানকেও তারা রাষ্ট্রীয় কোন সফরে ডাকেননি। ৪. আন্তর্জাতিক ফোরামে পরিবেশসহ বিভিন্ন বড় বড় ইস্যুতে বড় গলায় কথা বললে তার গুরুত্ব থাকে না। এ সময় গণতন্ত্র মানে জোর করে ক্ষমতা দখল কিনা- এমন এক প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ প্রশ্নের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মানুষের মধ্যে ৫ই জানুয়ারির যে ট্রমা বা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা এখনও আছে। আপাতত একটা অস্বস্তিকর শান্তি বিরাজ করলেও তা স্বাভাবিক অবস্থা নয়। কিন্তু এই অবস্থায়ও আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত আরেকটি নির্বাচনে যাওয়ার কোন আকাঙ্ক্ষা সরকারের নেই। জনগণের আকাঙ্ক্ষাও দৃশ্যমান হচ্ছে না। পরোক্ষভাবে হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে না হলে এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে না। রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সেই সক্ষমতা নেই। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে শক্তি সঞ্চয়ের একটা চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু তারা ক্ষমতায় এলে যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে সে গ্যারান্টিও পাওয়া যাচ্ছে না। মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুজ্জামান বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে বিভিন্ন রাষ্ট্র নীতিগতভাবে স্বাগত জানাতে পারেনি। এভাবে চললে পাঁচ বছর ধরেই বাধার সম্মুখীন হবে সরকার। এভাবে সরকার পরিচালনা করা দুরূহ। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের সমান জায়গা দেয়া প্রয়োজন। সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। অথচ এগুলো বন্ধের কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ড. দেবপ্রিয় বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার আন্দোলনে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে। রাজপথে যতখানি সন্ত্রাসমূলক শব্দ হয়েছে ততখানি জনগণের স্লোগান হয়নি। অথচ এটাই বেশি দেখতে চাই আমরা। সকলের অংশগ্রহণে জনগণের মনোনীত প্রার্থীদের মাধ্যমে আবারও যেন নির্বাচন হয় সে আশা ব্যক্ত করে মনিরুজ্জামান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছয় মাসের মধ্যে আবার নির্বাচনের দাবিতে অনড়। অন্যান্য আন্তর্জাতিক মহলও দ্রুত নির্বাচন চায়। বিদেশীরা কি বললো তা বড় কথা নয় কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমরা চাই, আমার ভোট দেয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হোক। ৫ই জানুয়ারি যে সংখ্যক ভোট পড়েছে তা কোনভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ৮-১০% ভোটার ভোট দিয়েছেন। এই সরকার জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনের মাধ্যমে গঠিত হতে পারেনি। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার আগ্রহ আমারও আছে। জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা ধারণ করবে তো রাজনৈতিক দলগুলো। তারা যদি না করে তাহলে নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা বুদবুদের মতো শূন্যে মিশে যাবে। বিশিষ্ট নাগরিক ভূমিকার প্রশ্নে দেবপ্রিয় বলেন, ড. ইউনূসের ভাগ্য স্মরণ করা এখানে জরুরি। আসলে নাগরিক সমাজ বা পেশাজীবীদের কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি তখনই হবে যখন দেশে গণতান্ত্রিক অবস্থা থাকবে। রাষ্ট্র ও সরকারকে পেশাজীবীদের কথাগুলো ব্যবহার করার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রতিযোগী মনে করলে হবে না। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একপেশে ভূমিকা নানারকম সমস্যায় ফেলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক জরিপের প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, সঠিকভাবে এই জরিপের বিশ্লেষণ হচ্ছে না। সরকারের উপর আস্থা নেই অনেকের। অনেকেই আবার একটি ভোট চান দ্রুত।