একাত্তর: আগে-পরে, ১৩

তাজউদ্দীন ভাই নীরবে মঞ্চে অবস্থান নিলেন

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
ইডেন সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতা এমনকি সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাজউদ্দীন ভাই ছিলেন অন্তর্মুখিন মানুষ। তিনি সবকিছুর মধ্যে থেকেও নিজেকে আশ্চর্যজনকভাবে আড়াল করে রাখতেন। এমনকি ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় যেখানে মঞ্চের মাইকের মূল নিয়ন্ত্রণ তার কাছে থাকাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে বক্তৃতা শুরু করলে তিনি তখন নীরবে-নিভৃতে মঞ্চে অবস্থান নিলেন। ৭ই মার্চের ভাষণে আগে ও পরে নানা ঘটনার সাক্ষী নূরে আলম সিদ্দিকী।
মানবজমিনকে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের আজ পড়ুন ১৩তম কিস্তি:
মুজিব ভাই যখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তখন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ভাই। পরবর্তীকালে ইডেনের সম্মেলনে মুজিব ভাই মওলানা তর্কবাগীশ সাহেবের স্থলে সভাপতি হলে তাজউদ্দীন ভাইকে সাধারণ সম্পাদক করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এতটাই অন্তর্মুখিন ছিলেন যে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সময় কিছু পত্রিকা ব্যঙ্গোক্তি করে সংবাদ পরিবেশন করে জনৈক তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বিষয়টি পক্ষপাতদুষ্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করার উদগ্র প্রয়াস হলেও তাজউদ্দীন সাহেব নিতান্তই নির্বিকার ছিলেন। আমি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তাকে নির্বিকার চিত্তে মুখবুজে কাজ করতে দেখেছি। অনেকটা তিনি যেন দপ্তর সম্পাদক। কর্মসূচি প্রণয়ন, প্রেস রিলিজ প্রদান এইসব কাজে তিনি একাগ্রচিত্ত ছিলেন। এখানে মুজিব ভাইয়ের নির্দেশনার বাইরে তিনি কোনো কিছুই করতে চাইতেন না, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে যেখানে তার মতামত দেয়ার প্রয়োজন ছিল সাংবাদিকদের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও তিনি কোনো অবস্থাতেও মুখ খুলতেন না। তার এই উন্নাসিকতা সাংবাদিককরা কিভাবে নিতেন জানি না কিন্তু আমরা প্রচণ্ডভাবে বিরক্ত হতাম। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে আমাদের অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর চার খলিফার চালচলন কথাবার্তায় ফুটে উঠতো মুজিব ভাইয়ের পর মূল নেতৃত্ব ৪ খলিফারই। ওনি আন্দোলনের প্রতীক ও স্থপতি কিন্তু নিয়ন্ত্রকের আসনে চার খলিফা অধিষ্ঠিত। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রান্তিক জনতার চেতনার আঙ্গিকে এটিই ছিল বাস্তব। অনেকটা বয়সের কারণেও এই জনপ্রিয়তা আমাদেরকে বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শিক্ষা দেয়নি। আওয়ামী লীগের মতো বিশাল সংগঠনে সাধারণ সম্পাদকের একনিষ্ঠ আনুগত্য ছিল বিস্ময়কর। গোটা মার্চ মাসটি তিনি নিজেকে দাপ্তরিক কাজের মধ্যেই নিয়োজিত রেখেছিলেন। ১লা মার্চ থেকে ২৩শে মার্চ পর্যন্ত আমরা যখন বঙ্গবন্ধুর চার খলিফা হিসেবে সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্দান্ত প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, সারা বাংলাদেশ আমাদের বজ্র নিনাদে যখন প্রকম্পিত, সভা সমিতি মিছিলে আমাদের কণ্ঠের বজ্র নিনাদে উচ্চকিত, আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো যখন আমরা বিস্ফোরিত; সারা বাংলাদেশকে গণসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় প্রজ্জ্বলিত করতে আমরা যখন ভয়ঙ্করভাবে বিকশিত তখনও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সবকিছুর মধ্য থেকেও নিজেকে আশ্চর্যজনকভাবে আড়াল করে রাখতেন তাজউদ্দীন ভাই। বোধকরি এটা বঙ্গবন্ধুর কাছে তার বিশ্বস্ততার পাদপীঠ তৎকালীন সময়ে ভীষণ মজবুত করেছিল।
এখানে ৭ই মার্চের জনসভার কথাটি প্রাসঙ্গিকভাবে এসে যায়। মঞ্চের মাইকের নিয়ন্ত্রণ তার কাছেই থাকা স্বাভাবিক ছিল। কিছুটা জবরদখলের মতোই মাইকের পুরোটা নিয়ন্ত্রণ আমাদের চারজনের কাছেই ছিল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এসে বক্তৃতা শুরু করলেন তখন তাজউদ্দীন ভাই নীরবে নিভৃতে মঞ্চে অবস্থান নিলেন। কিন্তু বক্তৃতার আগে ও পরে মাইকের কাছাকাছি আসলেন না। বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরও আমরা অল্প কিছুক্ষণ মাইকে স্লোগান দিয়েছিলাম। অন্তর্মুখী নেতা তাজউদ্দীন আহমদ তীক্ষ্ণবুদ্ধির লোক ছিলেন বলেই আমার ধারণা। বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সংলাপ শেষে ৩২ নম্বরে ফিরে আসেন। তখন শেখ কামাল যে ঘরটিতে শুতেন সেখানে ওনি সরাসরি ঢুকে পরেন আমিও তাকে অনুসরণ করে ঢুকে পরলে মুজিব ভাই একটি রিভলভিং চেয়ারে বসে শরীরটা এলিয়ে দিলেন, বললেন, আলম আমি খুবই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। আমার পনের থেকে বিশ মিনিট বিশ্রাম প্রয়োজন। তুমি দরোজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও। তিনি বিশ মিনিটের মতো বিশ্রাম নিয়েছিলেন বটে কিন্তু তার আগে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তার সংলাপের কিছু বিষয় আমার কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি বললেন, ইয়াহিয়া খান আমাকে দেখে চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ম্যা আই হ্যাভ দি প্রিভিলেজড টু কনগ্র্যাচুলেট ফিউচার প্রাইম মিনিস্টার অব পাকিস্তান।’ মুজিব ভাইও ত্বরিত জবাব দিয়েছিলেন, ‘ইন দ্যাট কেস, আই উইল কনগ্র্যাচুলেট ইউ এজ এ প্রেসিডেন্ট আওয়ার পার্লামেন্টারি গভর্নমেন্ট।’ ওনি রিভলভিং চেয়ারে অর্ধশায়িত। আমি একটি হাতল ছাড়া চেয়ারে বসা। মুজিব ভাইয়ের কিছু উপস্থিত বুদ্ধির ক্ষিপ্রতা অবিশ্বাস্য। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন ঘর থেকে বেরিয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথা বলবা না। সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও জবাব দিবা না। সোজা তোমার হলে চলে যাবা। আমি খুব বুদ্ধিদীপ্ত না হলেও বিষয়টির যথার্থতা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। ৩২ নম্বরে তখন অসংখ্য ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মী গিজগিজ করছিলেন। তারা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রচারণা করছিলেন দুই প্রেসিডেন্ট (আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ) আন্দোলনের রূপরেখা ও নীলনকশা তৈরি করছেন। এই প্রচারণা আমাদের আধা ঘণ্টার অবস্থানে প্রচণ্ড গুরুত্ব এনে দেয়। ঘর হতে বের হওয়ার সাথে সাথে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা আমাকে জেঁকে ধরেন। আমার একই উত্তর। মুখ খোলা আমার জন্য নিষেধ। তাজউদ্দীন ভাই লাউঞ্জের একটি চেয়ারে বসা ছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি আমার কাছে এসে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি আলোচনা হলো আমাকেও কি বলবেন না।’ মনে কষ্ট হলেও আমি নিঃশব্দে আমার জিপে ওঠে জহুরুল হক হলে চলে এসেছিলাম। আমার অন্য তিন বন্ধুরা বসের সাথে আমার রুদ্ধদ্বার কক্ষে অবস্থানকালে কোথায় ছিলেন আমার আদৌ মনে নেই। এই সময়ের অনেক ঘটনা ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটা সর্বজনবিদিত রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে একটা অদ্ভুত মাদকতা, উন্মাদনা ও বিস্ময়কর শব্দচয়ন ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবে বলেই ওইদিন রেসকোর্সে তার ওপরে আল্লাহতাআলার অফুরন্ত রহমত বোধহয় বর্ষিত হয়েছে। খুব সংক্ষেপে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় স্বাধীনতার পূর্ব ও পরে তার অনেক ভাষণ দেশবাসী ও আমি শুনেছি কিন্তু ৭ই মার্চের ভাষণটি নিঃসন্দেহে ভিন্নমাত্রার ও বিস্ময়কর। এখানে বলা অযৌক্তিক হবে না ওই সভায় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই মাইকের সম্মুখে আসেনি বা আসার সাহস পাননি। যত কথা যত স্লোগান, যত খণ্ড বক্তৃতা সবকিছু উদগীরিত হয়েছিল চার খলিফার কণ্ঠ থেকে। আমার ও রবের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে একটা ঠাণ্ডা লড়াই থাকতো সবসময়। কিন্তু সেদিন কেন জানি না রব আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় হয়ে আমাকে মাইকের নিয়ন্ত্রণটি প্রায় ছেড়েই দেন। রবের এই আচরণটি আজও আমাকে বিস্ময়াবিভূত করে। যাই হোক ৭ই মার্চের লক্ষ লক্ষ উদ্বেলিত জনতা সেদিন শুধু বিমুগ্ধ চিত্তে অগ্নিঝরা ভাষণটি শ্রবণ করেনি, যে যার হৃদয়ের চাহিদা মতো মুক্তির উন্মাদনা প্রত্যয় ও প্রতীতি নিয়ে সভা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছে। সেদিন সকলেই ছিল উদ্বেলিত-উচ্ছ্বসিত-পরিতৃপ্ত। আবেগ উচ্ছ্বাস ভাষার আলঙ্করিক আবীর মিশিয়ে জীবনে অনেক বক্তৃতা আমিও করেছি। চোখের জলে বুক ভাসিয়েছি। উদ্বেলিত জনতাকেও অবিশ্রান্ত ধারায় কাঁদিয়েছি। কিন্তু ৭ই মার্চের বক্তৃতাটি আমার কাছে এখনও অদ্ভুত ও বিস্ময়কর মনে হয়। এর একটি শব্দও হেরফের করা যায়- বহুবার শোনার পরও তা মনে হয় না। সে যাই হোক মার্চের অগ্নিঝরা প্রতিটি দিনই ছিল একেকটি সোপান উত্তরণের কালজয়ী অধ্যায়।
এখানে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন মূলত পহেলা মার্চ থেকে পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত ওরা সৈন্য আনলো অস্ত্র আনলো আমরা এই দীর্ঘ সময় তাদের দিলাম কেন? অন্তত ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করতে পারতেন। আমাদের বিপ্লবী অংশের দাবিও ছিল তাই। ৩২ নম্বরের বাসায় আমার বিপ্লবী বন্ধুরা বঙ্গবন্ধুর ওপরে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিলেন ‘জনগণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রত্যাশা ঘোষণা দেয়ার দাবিতে।’ তবু আমি নিশ্চিত বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ এড়িয়ে ১৮ মিনিটের বক্তৃতায় যে শব্দ চয়ন, যে বজ্র নিষ্পেষিত গর্জন এবং দেহের ভাষা প্রয়োগে তিনি যে বার্তা সেদিন প্রদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাতে আমাদের বিপ্লবী বন্ধুরাও পরিতুষ্ট ছিলেন। আমার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীর অভিযোগ আমি কখনোই ঘাড়ে নেবো না। আমি মানুষকে যে কোন আক্রমণ মোকাবিলা করার মানসিকতা তৈরি করে রাখবো। যে কোন আক্রমণকে প্রতিহত করা শক্তি ও সাহস গড়ে তুলবো। কিন্তু চাইবো আক্রমণটা ওদের দিক থেকেই আসুক। ঘটনার সহস্র গতিধারা সত্ত্বেও অবিকল ওটাই ঘটেছে। নিরস্ত্র বাঙালি অকুতোভয়ে পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী ও হিংস্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অমিত বিক্রমে প্রতিহত করতে এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রতিটি পদে তাদেরকে পর্যুদস্ত ও পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে।
সংশোধনী: গতকাল প্রকাশিত ১২তম কিস্তিতে ভুলবশত পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সচেতন ছিল না এবং গোটা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধিকর্তা; ভূস্বামীদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছাপা হয়েছে। এ অংশে পূর্ব পাকিস্তানের স্থলে পশ্চিম পাকিস্তান।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

কলেজে এসকেলেটর বিলাস, ৪৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প

ইইউয়ে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ

ফাইনালে বাংলাদেশ হাথুরুকেও জবাব

আইভীর অবস্থা স্থিতিশীল, দেখতে গেলেন কাদের

শামীম ওসমানের বক্তব্যে তোলপাড় নানা প্রশ্ন

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘সভাপতি হলে তুই মাত করে দিবি’

চট্টগ্রামে বেপরোয়া অর্ধশত কিশোর গ্যাং

তুরাগতীরে লাখো মুসল্লির জুমার নামাজ আদায়

দু’দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা

পিয়াজের কেজি এখনো ৬৫-৭০ টাকা

নির্বাচন চাইলে সরকার আপিল বিভাগে যেতো

‘বাংলাদেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে’

‘শাসকগোষ্ঠীর নির্মম শিকলে বন্দি মানুষ’

ফেনীতে সাড়ে ১৩ হাজার ইয়াবাসহ আটক ১

ছেলেকে হত্যার পর মায়ের স্বীকারোক্তি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী নিখোঁজ