একাত্তর: আগে-পরে, ১২

দেশ স্বাধীন হয়েছিল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ওপর ভিত্তি করে

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
উত্তাল মার্চ। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে পঁচিশে মার্চের কাল রাত পর্যন্ত নানা ঘটনাপ্রবাহ। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বিজয় মুক্তি আন্দোলনকে নিয়ে যায় চূড়ান্ত লক্ষ্যে। কিন্তু নানা ঘটনাপ্রবাহ  এ সময় ছিল লক্ষ্যণীয়। ১লা মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। ২রা মার্চ ঢাকায় ছাত্রজনসমাবেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। অন্যদিকে ভুট্টোর একগুঁয়েমি আর ক্ষমতালিপ্সার কাছে নতিস্বীকার করে ইয়াহিয়া খান। ঢাকা আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করতে থাকে। সবকিছুর আড়ালে চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বাঙালি নিধনের প্রস্তুতি। একের পর এক এই ঘটনাপ্রবাহ একদিনে হয়নি। এর সূচনা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। সেইসব ঘটনাপ্রবাহ ফুটে ওঠেছে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রিয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর বয়ানে। আজ ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের ১২তম কিস্তি:
দেশ স্বাধীন করার আন্দোলনে দীর্ঘ সংগ্রামের উত্তাল পথ পরিক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের প্রাণের মুজিব ভাই। আর এই আন্দোলনে দক্ষ বাহিনী ছিল ছাত্রলীগ। স্বাধীনতা অর্জনে অব্যবহিত পরপরই জাতির জনক বাম ধারার রাজনৈতিক করাল গ্রাসের শিকারে পরিণত হন। বিষয়টি আমার কাছে হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো হয়েছিল বলেই তখন সারা বাংলায় আমি চারণের মতো ঘুরে বেরিয়ে এদেশের প্রান্তিক জনতাকে উদ্বেলিত করে বলতাম যে দেশ; সে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক পথ পরিক্রমণে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৫২-র মাকে নিজের মা বলে ডাকার অধিকার আদায়ে নিজের বুকের লাল রক্তে বাংলার শ্যামল মাটিকে রাঙিয়ে দিল। যে দেশের উজ্জীবিত জনতা ছাত্রলীগের আহ্বানে ’৫২-র আন্দোলনে উত্থাপ থেকে শক্তি সঞ্চয় করে ’৫৪-র নির্বাচনে অদ্ভূত অবিস্মরণীয় ঐক্যের মাধ্যমে দ্বি-জাতি তত্ত্বের রায় দিয়ে দিল পূর্ব-পাকিস্তানের নির্বাচনে। ’৫৪-র নির্বাচনে বিজয়ের দৃষ্টান্ত সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে শুধু অবিস্মরণীয় নয় একটি ব্যতিক্রমী বিরল ঘটনাও। পাকিস্তানি সমগ্র রাজনীতিতে বেসামরিক-সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল সারা দেশকে অধিকার বঞ্চিত রেখে একটি কুক্ষিগত কোটারির মাধ্যমে দেশকে ও দেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার বিবর্জিত একটি শ্বাসরুদ্ধকর প্রাচীরের অভ্যন্তরে গোটা দেশকে অবরুদ্ধ রাখা। এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই, পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সচেতন ছিল না। গোটা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি করায়ত্ত ছিল সামরিক ও বেসামরিক অধিকর্তা; ভূস্বামীদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান আজকের এই অভাগা বাংলাদেশের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত, এদেশের মানুষ শুধু অধিকার সচেতনই ছিল না, সারা ভারতের মধ্যে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রান্তিক জনতা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ’৪৬ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট প্রদান করেছিল। এই ম্যান্ডেট আদায়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব ছিল অগ্রদূতের মতো এবং তখনকার ছাত্রলীগ (নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, টাঙ্গাইলের শামসুল হক এদের অবদান অবিস্মরণীয়। নেতৃত্বের প্রথম সারিতে না থাকলেও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানও ভোলার মতো নয়। ১৯৪৬ সালের গণম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এবং যার নেতৃত্বে ম্যান্ডেট অর্জন সম্ভব হয়েছিল সেই সোহরাওয়ার্দীকেই প্রথম ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। অবিভক্ত বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রথমদিকে ঢাকায় আসতেই দেয়া হলো না। যখন আসতে দেয়া হলো তখন ষড়যন্ত্রের সকল যোগসূত্র পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। অবিভক্ত পাঞ্জাব ভারত-পাকিস্তানে বিভক্ত হলেও সরদার হায়াত খানের মুখ্যমন্ত্রীর পদবি অক্ষুণ্ন রইলো। কোনো আস্থা ভোটের প্রয়োজন হলো না। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানে আস্থা ভোট প্রয়োজন হয়েছিল। এই আস্থা ভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অনমনীয়। গণতন্ত্রের প্রতি একান্ত আনুগত্য ও রাজনৈতিক শটতা বিবর্জিত বিরল উন্নাসিকতা তাকে ঠেলে দেয় পরাজয়ের দিকে। সিলেটবাসী তার কাছে আস্থা ভোটের সময় একটি মন্ত্রিত্বের নিশ্চয়তা দাবি করলে প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, প্রয়োজনে একাধিক মন্ত্রী নিজ যোগ্যতায় সিলেট থেকে হতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রী বানাবার কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে আপনাদের ভোট আমি নেবো না। আজকের বিচারে এটা আদর্শ, উদ্ভাসিত একটি দৃপ্ত পদক্ষেপ নয়। বরং নিতান্ত বোকামি ও ভ্রান্ত পদক্ষেপ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদ দেয়ার রাজনৈতিক দাবা খেলায় ষড়যন্ত্রের প্রথম চালটি সফলভাবে দেয়া হলেও ওখান থেকেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির পদচারণা। অবশ্য মাত্র সাত বছরের মাথায় ১৯৫৪ সালে সফল ষড়যন্ত্রের পক্ষ বিদীর্ণ করে এদেশের রাজনীতিতে ’৫৪-এর নির্বাচনে পৃথিবীর ইতিহাসে অবিস্মরণীয় অসাধারণ বিজয় সাধিত হয় শেরেবাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। তখন শেরেবাংলার আসন ছিল এদেশের মানুষের হৃদয় সিংহাসনে। আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শুধু গণতন্ত্রের মানসপুত্র ছিলেন না ষড়যন্ত্রের যেকোনো পাস্তিল দুর্গকে ভেঙে ফেলতে পারতেন অনায়াসে। তার এই দক্ষতার জুড়ি মেলাভার। ’৫৪-র নির্বাচনের ভরাডুবির পরও ষড়যন্ত্রের রাজনৈতিক খেলা বন্ধ হয়নি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জনগণের রায়কে শেষ কথা মনে করবেন বলেই সব শর্তের বিনিময়ে ১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার লক্ষ্যে পাকিস্তানের কোটারি নেতৃত্বের অনেক অন্যায় দাবি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন সংঘটিত হতে দেয়া হয়নি এবং এর ফলে পরবর্তীতে সামরিক শাসন জারি হয়। তখনকার সেনাপ্রধান ছিলেন আইয়ুব খান। মজার কথা হলো, প্রান্তিক জনতার মৌলিক অধিকার হরণ করে ইস্কান্দার মির্জা কর্তৃক সামরিক শাসন জারির নেপথ্যের নায়ক আইয়ুব খান নিজেকে এতখানি গৌরবান্বিত ও সাফল্যমণ্ডিত মনে করলেন যে নিজেকে নিজেই ফিল্ড মার্শাল ঘোষণা দিলেন। এর প্রতি উত্তরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে আইয়ুব খানের উদ্দেশে বলেছিলেন, আপনিতো কোনো যুদ্ধ জয় করেননি শুধু মানুষের অধিকার হরণ করেছেন। কোন বিবেচনায় নিজেকে ফিল্ড মার্শাল ঘোষণা করলেন। সে যাই হোক নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, এক নাগারে দশ বছরেরও অধিক আইয়ুবের শাসনামল চলেছে অর্থাৎ জগদ্দল পাথরের মতো তার ক্ষমতা জাতির বুকের ওপর বসে থেকেছে। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের হামিদুর রহমান কমিশনের সুপারিশ বাতিল দাবির অন্তরালে মূলত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি ও মৌলিক গণতন্ত্র হরণের (আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি) প্রতিবাদে মানুষ পথে নামে। যদিও আন্দোলনটি আইয়ুব খানের শাসনে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারেনি। ছয় দফা সম্মিলিত ১১ দফা আন্দোলনের ২৪শে জানুয়ারি অভূতপূর্ব গণবিস্ফোরণে সমগ্র বাংলাদেশ বিষুবিয়াষের মতো জ্বলে ওঠে। আইয়ুব শাহীর পতন হয় কিন্তু ষড়যন্ত্র শেষ হয় না। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন তখনকার সামরিক প্রধান হয়ে। দেশ তখন এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে ইয়াহিয়া খানকে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েই নতুন সামরিক শাসকের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে হয়। ইয়াহিয়া খান ইতিহাসের একটি বিকৃত অভিশপ্ত ব্যক্তিত্ব। তবে আমি আজও উপলব্ধি করি নির্বাচন দেয়ার ব্যাপারে তিনি শুধু অঙ্গীকার পূরণ করেননি ক্ষমতা হস্তান্তরেও তিনি আগ্রহী ছিলেন। যদিও তাকে সামনে রেখেই নির্বাচন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পাকিস্তানের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ব্যভিচার এবং পূর্ব পাকিস্তানকে অবদমিত রাখার ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। তখন পাকিস্তানের মূল ক্ষমতা ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে। সারা পাকিস্তানে সংখ্যালগিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্লজ্জ লিপ্সা অভিলাষ রাজনীতিতে তাকে বেপরোয়া করে তোলে। পাকিস্তানের রাজনীতির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নিয়মিত শক্তি হলো পাঞ্জাব। অবিভক্ত ভারতের সিন্ধুর লারকানায় তার জন্ম হলেও তিনি পাঞ্জাবের সামরিক-অসামরিক শক্তিকে কর্তৃত্ব বা করায়ত্ত করার কারণেই ইয়াহিয়া খানের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সারা পাকিস্তানের সংখ্যাঘরিষ্ঠ দলের নেতৃত্বে (৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৫ আসনের অধিকর্তা) থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতেতো পারেননি বরং ৩রা মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন ১লা মার্চের এক ভাষণে ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করতে বাধ্য হন। মার্চ মাসে উত্থাল আন্দোলনের একপর্যায়ে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা চলাকালে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি কর্নওয়ালিসকে বঙ্গবন্ধুকে শপথ পড়ানোর লক্ষ্যে ঢাকায় নিয়ে আসেন। কিন্তু ভুট্টোর একগুঁয়েমি ও ক্ষমতা লিপ্সার কাছে তাকে নতি স্বীকার করতে হয়। অবশ্যই সকলের মনে আছে তখন আমি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ইয়াহিয়া খানের পহেলা মার্চের ভাষণের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের এক অধিবেশনে চার ছাত্র নেতার নেতৃত্বে যে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়- তার সকল সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগ সভাপতি। পূর্বাণীতে ১লা মার্চ বঙ্গবন্ধু সংসদীয় দল ও আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভা করেছিলেন। আমরা মিছিল নিয়ে পূর্বাণীতে গেলাম। আমাদের সাবেক ছাত্রনেতারা ক্রমে ক্রমে পূর্বাণীতে উপস্থিত হলেন। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক আমাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখতেন। যে সংগ্রাম পরিষদটি গঠিত হবে সেটা কি সর্বদলীয় না ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে হবে এই বিতর্ক তখন তুঙ্গে। যদিও শাহজাহান সিরাজ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন নীতিগতভাবে রব সাহেবের সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলেন। অন্যদিকে আবদুল কুদ্দুস মাখন তখন বরাবরই আমাদের সমমনা ছিলেন। আমার সঙ্গে শাহজাহান সিরাজের সম্পর্ক ছিল সহোদরপ্রতিম। ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ব্যাপারে সম্মত করাতে তাকে সক্ষম হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর কাঁধের কাছে গিয়ে আমি তাকে বলেছিলাম ‘বস, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে ডাকসুর ভিপি হিসেবে এর নেতৃত্ব রবের হাতে থাকবে। আর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে সেটি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তৎক্ষণিকভাবে মুজিব ভাই আমাকে নির্দেশ দিলেন পল্টন ময়দানে গিয়ে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংসদ পরিষদ ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে ঘোষণা করে দাও। আমারতো পোয়াবারো। এখানে জানিয়ে রাখা জরুরি যে, বেশ পূর্ব থেকেই আমাদেরকে জানানো হয়েছিল পহেলা মার্চে ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাটি কি হবে। মোটামুটিভাবে আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি ছিল। ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম। দুপুর বারোটার কাছাকাছি সময়ে ভাষণটি বেতারযোগে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ি। বাংলার প্রান্তিক জনতা এক বিস্ময়কর উন্মাদনায় উন্মত্ত ছিল।
পল্টন ময়দানে গিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করি এবং দ্বিতীয় দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র জনসভার ঘোষণা দেয়া হয়। ২রা মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাটি এতই বিস্তৃত কলেবরে ছিল যে, আজ প্রায় ৪৭ বছর পরও এত বড় সভা বিশ্ববিদ্যালয়তো দূরে থাক অন্য কোথাও সম্ভব হয়নি (৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানের সভাটি বাদে)। ওখানেই স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা প্রদর্শিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ নেতৃত্বে। গোটা মার্চ মাসের একেকটি রাজনৈতিক কর্মসূচির সোপান উত্তরণের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যয় ও প্রতীতিকে সুন্দর করা হয়। যার ফলে নিরীহ-নিরস্ত্র একটি জাতি ২৫শে মার্চের পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর হিংস্র হামলা প্রতিরোধ করতে পেরেছিল। এটি সমগ্র বিশ্বের সবচাইতে বিস্ময়কর একটি রাজনৈতিক ঘটনা।
১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে মাত্র ১৭ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল এবং মাও সেতুং-এর সময় ১৯৪৯ সালে চীনে লংমার্চে ২৩ ভাগের মতো মানুষ অংশ নিয়েছিল পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে। দেশ স্বাধীন হয়েছিল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ওপর ভিত্তি করে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার উত্তরকালে বাংলাদেশে সেই গণতন্ত্রই পথ হারিয়ে ফেলে। যে বাম ধারার চিন্তা চেতনাকে স্বাধীনতা পূর্বকালে আমরা সুবিধা করতে দেয়নি তারাই বঙ্গবন্ধুর ওপর জিনের মতো ভর করে একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি বাকশাল। পরিতাপের বিষয় হলো, রক্তস্রোত স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রেরতো কোনো উন্নতি হয়নি বরং পাকিস্তানের চেয়েও বেহাল অবস্থায় ইনসেনটিভ কেয়ারে আছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। তখন বিনা বিচারে কারারুদ্ধ হতাম কিন্তু এখনকার মতো রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন-গুম হতো না। তখনকার রাজনীতিতে শেষ কথা ছিল জনগণ। নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারিগর ছিল ছাত্রলীগ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

কারাবন্দি বাবাকে দেখে ফেরার পথে প্রাণ গেল ছেলের

আদালতের এজিপি ফেন্সিডিলসহ আটক

ফেনীতে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা খুন

বিএনপি নেতা কামরুল ঢালীর বিরদ্ধে দুদকে মামলা

সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত

পদ্মা সেতুর ৫৬ শতাংশ কাজ শেষ

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন ইয়াং হি লি

আইভীর সিটিস্ক্যান ও এমআরআই সম্পন্ন, রাতে প্রেস ব্রিফিং

‘যথাসময়ে সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেব’

পর্নো তারকা অলিভিয়ার মৃত্যু

বিরোধীদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আলোচনা শুরু করছে পাকিস্তান সরকার

অধিভুক্তদের ঢাবির পরিচয়পত্র নয়

ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সুপ্রিম কোর্ট

ময়মনসিংহে কলেজ ছাত্র নিহতের ঘটনায় মামলা

কাতার ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবে?

যুক্তরাষ্ট্রে অচলাবস্থার নেপথ্যে