একাত্তর: আগে-পরে, ১১

১৬৫ আসন মুজিব ভাইয়ের কাছে বিস্ময়কর হলেও ছিল বাস্তবতা

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার

কর্মী অন্তঃপ্রাণ বঙ্গবন্ধুকে সকল কর্মীর কাছে শুধু ‘মুজিব ভাই’ হিসেবে স্থান দেয়নি সকলকে পেছনে ফেলে নেতৃত্বের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। পরবর্তীতে কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রণোদনায় একজন রাজনৈতিক কর্মী থেকে তিনি জাতির জনক হয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে ৬ দফা ঘোষণার সময় ছাত্রলীগ কার্যত দুই ধারায় বিভক্ত ছিল। একদল নির্বাচনের ৬ দফা ভিত্তিক ম্যান্ডেটে মুজিব ভাইয়ের হাতকে শক্তিশালী করা আর অন্য এক দল ভিন্ন পথে আন্দোলনকে নিয়ে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ম্যান্ডেটই দেশকে নিয়ে যায় স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পথে। ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারে নূরে আল সিদ্দিকী মানবজমিনকে বলেছেন সেইসব দিনের কথা।
আজ পড়ুন ১১ নং কিস্তি-
মুজিব ভাইয়ের সময়ে বা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হওয়ার আগে আওয়ামী লীগেও তার চেয়ে প্রবীণ ও বয়স্ক নেতা ছিলেন। সর্বজনাব আতাউর রহমান খান, জহিরউদ্দিন সাহেব, সালাম খান, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখের নাম অনায়াসে উল্লেখ করা যায়। তবে একটি মজার কথা হলো তারা কেউই সংগঠক হিসেবে শেখ মুজিবের কাছাকাছি ছিলেন না। এমনকি সার্বক্ষণিক রাজনীতিকও ছিলেন না। তাদের আইন পেশা ছিল রমরমা। সেই রমরমা আইন পেশা চালিয়ে সন্ধ্যার পরে ড্রয়িং রুমে তাদের রাজনীতি মূলত সীমাবদ্ধ ছিল। প্রায় সময় প্রান্তিক জনতা তো দূরে থাক দলের কর্মীরাও ওই সমস্ত নেতাদের সংস্পর্শে আসতে পারতেন না। ওই খেতাবি বা পোশাকি নেতাদের সঙ্গে সাধারণ কর্মীদের মারাত্মক দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ছয় দফা দেয়ার প্রাক্কালেও মুজিব ভাই ১১ নেতার একজন ছিলেন। শুধুমাত্র ৬ দফা কর্মসূচি প্রদানের জন্য নয়- তার কর্মীর সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যক্তি মুজিবের অকৃতিম সংযোগ তার হৃদয়ে সহমর্মিতা এক কথায় তার কর্মী অন্তঃপ্রাণই তাকে সকল কর্মীর কাছে ‘মুজিব ভাই’ হিসেবে শুধু স্থানই করে দেয়নি অন্যদের অনেক পেছনে ফেলে একক নেতৃত্বের শীর্ষ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি সত্যিই সৌভাগ্যবান। নিরপেক্ষভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্টতই বোঝা যাবে বুদ্ধিমত্তার জাহাজ না হলেও তিনি কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রণোদনায় একটি রাজনৈতিক কর্মী থেকে জাতির জনক হতে পেরেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সহমর্মিতা ঘোষণার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু বহিষ্কারই নয় তিনি কারারুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাই ভাষা আন্দোলনেও তিনি কারাবন্দি হিসেবে হাসপাতালের কেবিন থেকেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তবে ভাষা আন্দোলনের একক নেতৃত্বের কৃতজ্ঞ তাকে দেয়া হলে এটা ইতিহাসের প্রতি মারাত্মক অবিচার করা হবে। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি। তার নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই ছাত্রলীগ বা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এখনকার প্রচার-প্রচারণায় ছাত্রলীগের সেই ঐতিহাসিক অনিবার্য এবং অপ্রতিরোধ্য ভূমিকাকে যখন কৌশলে একদমই পাশ কাটানোর চেষ্টা হয় তখন ইতিহাস বিকৃতি তো বটেই বঙ্গবন্ধুর অবদানকেও খণ্ডিত করা হয়। এখন অনেকেই জীবিত আছেন তারা জীবন্ত সাক্ষী। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা। তবুও এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমণের যারা জাগ্রত সারথী তাদেরকে বেমালুম অস্বীকার করা হলে ইতিহাসকে নির্মমভাবে অবহেলা করা হবে। বঙ্গবন্ধুর শীর্ষস্থান অনস্বীকার্য কিন্তু আরো যাদের সক্রিয় অবদান ও রাজনৈতিক কৃতিত্বে স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার এবং স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যায় তাদের কারও কোনো মূল্যায়ন না করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে আসার পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের পরস্পরবিরোধী দুটি ধারা প্রকট রূপ ধারণ করে। একদল বিশ্বাস করতেন সত্তরের নির্বাচনে ৬ দফাভিত্তিক একটি ম্যান্ডেট নিতে পারলেই শুধু মুজিব ভাইয়ের হাত শক্তিশালীই হবে না দেশবাসীর কাছে এবং আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টিতে এটি একমাত্র উপাদান হবে। নির্বাচনের ম্যান্ডেট ছাড়া যেকোনো আন্দোলনের ডাক বিভিন্ন ধারা-উপধারার নিষ্ঠুর কষাঘাতে শুধু জর্জরিতই হবে না। সম্পূর্ণ বিপদগামী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও স্বাধীনতার প্রশ্নে নানা দল-উপদল, সংঘাত, প্রতিহিংসার ইত্যাদির নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হবে। কেউ কারো নির্দেশনা মানবে না। যে যার ইচ্ছেমতো আন্দোলনকে পরিচালিত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাবে তা হবে মারাত্মক এবং ভয়াবহ। আমি বহুবার মুজিব ভাইকে দৃঢ়তার সঙ্গে বোঝাতে চেষ্টা করেছি নির্বাচন এবং নির্বাচনের ম্যান্ডেট ছাড়া তার যেকোনো আহ্বান ব্যর্থতার বেলাভূমিতে গুমরে কাঁদবে। কেন জানি না হয়তো ’৫৪-এর নির্বাচনের ফলাফল আমাকে প্রভাবান্বিত করেছিল। আমি সত্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পেছনে মুজিব ভাইয়ের কাছে প্রচণ্ডভাবে পীড়াপীড়ি করতাম। এটা আমার একটা একগুঁয়েমি বা জেদ ছিল। আমার এটি মনন বা মননশীলতা যাই বলা হোক না কেন আমি প্রচণ্ডভাবে বিশ্বাস করতাম ৬ দফা প্রদানের পর একটা সুনির্দিষ্ট আন্দোলনের ধারায় ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুকে আন্দোলনের যে শিখর চূড়ায় প্রতিস্থাপিত করেছে নির্বাচন হলে তিনি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেনই। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের কোনো নেতাই তার ধারে কাছে আসতে পারবে না। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা ছিল ১৬৭টি। জনাব নূরুল আমীন, রাজা ত্রিদিব রায় ছাড়া ১৬৫টি আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়ে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন এমনকি মুজিব ভাইও অনেক সময় আমাকে বলতেন মোহন মিয়া, মোসলেহ উদ্দিন দুদু মিয়া, রংপুরের জাদু মিয়াসহ ৭/৮টি আসন তার হাতছাড়া হয়ে যেতেও পারে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫১টি পেলেই তারপক্ষে সরকার গঠন করা সম্ভব হতো। সেই ক্ষেত্রে ১৬৫টি আসন মুজিব ভাইয়ের কাছেও বিস্ময়কর হলেও এটিই ছিল বাস্তবতা। সর্বদলীয় বিরোধী দলের আন্দোলনের এক পর্যায়ে নূরুল আমীন সাহেব নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই মুজিব ভাইও তার পরাজয় চাননি- এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ত্রিদিব রায়ের বিষয়টি আমার বাস্তব ধারণা ছিল না। রাজনীতিতে আমি একটি মুহূর্তের জন্যও কল্পনাবিলাসী ছিলাম না। কঠোর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সত্যের সাগরে অবগাহন করা আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। বক্তৃতায় আমি অনেকটাই রোমান্টিক হলেও হৃদয়ের নিভৃত অন্দরে আমি কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার মানসিকতাকে গঠন করতাম। এবং সেটাকে যেকোনো প্রতিকূলতার মুখে দ্বার করাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতাম। ষাট দশকের প্রথম দিকে সমস্ত বিশ্বজোড়া সমাজতন্ত্রের কালবৈশাখি ঝড়। সেখানে গণতন্ত্রের কথা মানেই প্রতিক্রিয়াশীলের দালাল। তখন থেকে আজ পর্যন্ত একটি মুহূর্তের জন্যও আমি গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকারের চূড়ান্ত বিশ্বাস থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হইনি। অনেক অপবাদ শুনেছি, অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু বিশ্বাসের প্রশ্নে কখনো কোনো ছাড় দেয়নি। আমার সভায় বক্তৃতার পূর্বে অনেক মুখরোচক স্লোগান দিয়ে আমাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হলেও আমি গণতন্ত্রের স্বপক্ষে ও সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে উচ্চকিত কণ্ঠে বক্তৃতা করতাম। আমার হৃদয় উদগত, উদ্বত, উদ্ধত পূর্ণায়ত পদ্মাটির মতো উচ্চকিত হতো। আমি উচ্ছ্বাসের, আবেগে আপ্লুত হৃদয়ে অনেকটা ঘোরের মধ্যে থাকতাম। পাগলের মতো যখন বক্তৃতা করতাম তখন একটা চরম উন্মাদনায় আমার অন্য ইন্দ্রিয়গুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যেত। এটা আমি হলফ করে বলতে পারি তখন আমি সম্বিৎহারা পাগল প্রায় থাকতাম।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

কারাবন্দি বাবাকে দেখে ফেরার পথে প্রাণ গেল ছেলের

আদালতের এজিপি ফেন্সিডিলসহ আটক

ফেনীতে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা খুন

বিএনপি নেতা কামরুল ঢালীর বিরদ্ধে দুদকে মামলা

সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত

পদ্মা সেতুর ৫৬ শতাংশ কাজ শেষ

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন ইয়াং হি লি

আইভীর সিটিস্ক্যান ও এমআরআই সম্পন্ন, রাতে প্রেস ব্রিফিং

‘যথাসময়ে সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেব’

পর্নো তারকা অলিভিয়ার মৃত্যু

বিরোধীদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আলোচনা শুরু করছে পাকিস্তান সরকার

অধিভুক্তদের ঢাবির পরিচয়পত্র নয়

ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সুপ্রিম কোর্ট

ময়মনসিংহে কলেজ ছাত্র নিহতের ঘটনায় মামলা

কাতার ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবে?

যুক্তরাষ্ট্রে অচলাবস্থার নেপথ্যে