একাত্তর: আগে-পরে, ১০

বঙ্গবন্ধু ছাড়া ফাইলের সময় সবাইকে তালাবদ্ধ রাখা হতো

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
জেলখানায় পরিদর্শনকে বলা হয় ফাইল। আর এই ফাইল চলে বছরের নানা সময়। কখনো আইজি  কখনো ডিআইজি, কখনো জেলার। আর এ সময় সকল সাধারণ থেকে রাজবন্দিকে রাখা হতো তালাবদ্ধ অবস্থায়। ব্যতিক্রম ছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেওয়ানি সেলে যেখানে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সে দরোজা তালা দেয়া হতো না কখনোই।
অন্যদিকে জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন অবাঙালি। স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীর ধারাবাহিক সাক্ষাতকারে আজ পড়ুন দশম কিস্তি :
জেলখানায় রাজনৈতিক বন্দিদের যিনি দেখাশুনা করতেন তিনি ডেপুটি জেলার তোফাজ্জল সাহেব। তবে রাজবন্দি সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল নাজির আহমদ। ভদ্রলোক অবাঙালি। অবস্থান ছিল হাবিলদার। জেলখানার পুলিশদের বলা হতো মিয়া সাহেব। হাবিলদার পদটি ছিল কেবলমাত্র মিয়া সাহেবদের একধাপ ওপরে। শুনেছি নাজির আহমদ চাকরি অবস্থায় সুবেদার মেজর হয়ে অবসরে গিয়েছিলেন। তিনি অবাঙালি ছিলেন। কেন জানি না তিনি বসের (বঙ্গবন্ধু) সবচাইতে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। রাজবন্দিদের চিঠিপত্র বা চিরকুট চালাচালি বন্ধ রাখা বা নজরদারি ছিল তার কর্মকাণ্ডের অংশ। কিন্তু মুজিব ভাইয়ের বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন এই নাজির আহমদ। আমার ধারণা, ভাবির কাছে অত্যন্ত জরুরি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনামূলক কাগজ মুজিব ভাই নাজির আহমদের মাধ্যমে পাঠাতেন। ভদ্রলোক ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারতেন। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যেত তিনি অবাঙালি। মুজিব ভাই আমাদের মতো অতটা তীব্রভাবে অবাঙালি বিদ্বেষী ছিলেন না। কিন্তু নাজির আহমদের ওপরে তার এতখানি আস্থা ও বিশ্বাস কিভাবে গড়ে উঠেছিল এটা আজও ভাবলে বিস্মিত হই। জেলের তখনকার জেলার এবং ডেপুটি জেলাররা প্রায় সবাই আমাদের সমবয়সী ছিলেন। ডেপুটি জেলার শামসুর রহমান সাহেব সাধারণ কয়েদিদের দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন। ভদ্রলোকের বাড়ি রাজশাহী। রাজশাহীর স্থানীয় ভাষায় এবং বাচনভঙ্গিতে তিনি কথা বলতেন এবং ভীষণ মিষ্টভাষী ছিলেন। রাতে জেল ঘুরে দেখার দায়িত্ব সাধারণত ডেপুটি জেলারদেরই থাকতো। সব কাজের মধ্যে শামসুর রহমান সাহেবের যেদিন নৈশ পরিদর্শনের দায়িত্ব থাকতো পরিদর্শন শেষে গৃহে বা কার্যালয়ে প্রত্যাবর্তন না করে তিনি আমার সেলের সামনে একটা চেয়ার পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতেন। সেলের বাইরে যে প্রাচীর থাকতো তার সঙ্গে থাকা বিরাট বহরটিকে প্রাচীরের বাইরে থাকতে বলতেন। অদ্ভুত মিষ্টভাষী শামসুর রহমান খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতেন। ভদ্রলোক এমএ পাস ছিলেন। লেখাপড়াও ভালো ছিল। গল্পে দু’জন এতই জমে যেতাম যে অনায়াসেই দু’তিন ঘণ্টা পার হয়ে যেত। আমি ১৪ শিখের ভেতরে অবরুদ্ধ মানুষ। আর ওনি উঠোনে বসা অবমুক্ত বিহঙ্গ। ইচ্ছে করলেই বা গল্প করতে মন না চাইলে ওনি স্বেচ্ছায় যখন তখন চলে যেতে পারতেন। আর আমি সেলের ভেতরে অবরুদ্ধ তো অবরুদ্ধই। বলতে দ্বিধা নেই অবরুদ্ধ আর মুক্ত মানুষের এই পার্থক্যটা আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দিত। কারাগারে আমাদের অবস্থান ছিল সম্মানিত (রাজবন্দি)। খাওয়া-দাওয়া রাজসিক ছিল বলাই চলে। বন্ধু শামসুর রহমান ছাড়া অন্য ডেপুটি জেলাররা প্রায়শই আমাদেরকে স্যার বলে সম্বোধন করতেন। এতে আমাদের কোনো ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ছিল না। বিষয়টি অনেকখানি প্রাপ্যই মনে হতো। কথাটি এজন্য উল্লেখ করলাম মুজিব ভাইয়ের কাছে এই ডেপুটি জেলার সাহেবরা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে প্রায়ই আসতেন। মুজিব ভাই দেওয়ানির বারান্দায় একটি ইজি চেয়ারে বসে থাকাকালীন অবস্থায় ওনারা আসলে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতেন। আশপাশে থাকা চেয়ারে তাদের বসিয়ে তারপর নিজে বসতেন। বিষয়টি আমার কাছে খুবই দৃষ্টিকটু লাগতো। কেন জানি না মনে হতো মুজিব ভাই যদি ওদের দেখে ওঠে দাঁড়ান তাহলে আমাদেরতো ওরা কোনো পাত্তাই দেবে না। আমি অনেকবার বলেছি তারই পুনরাবৃত্তি করে বলছি, মুজিব ভাইয়ের কাছে শুধু স্নেহ সান্নিধ্য নয়, কথা বলার অধিকারটাও মাত্রাতিরিক্তই ছিল। হুট করে একদিন প্রতিবাদ করে বলে বসলাম বস, ডেপুটি জেলার দেখলে আপনি ওঠে দাঁড়ান কেন? ওনি ধমক দিলেন রাগও হলেন এই কথাগুলো শুনে। ইজি চেয়ারে বসা অবস্থায় তার সামনে একটি চেয়ারে আমাকে বসতে বলতেন এবং খুবই শান্তভাবে আমাকে বললেন, অন্যকে সম্মান করলে নিজের সম্মান খাট হয় না বরং বাড়ে। ওদের কাছে আমি শুধু একটি রাজনীতিক বা রাজবন্দি নই। আমার কাছে ওরা অনেক কিছু শিখবার চাইতেও পারে? আমি নিঃশব্দে কথাটি হজম করেছিলাম। তবে আজও অম্লান বদনে স্বীকার করি কথাটি আমার কাছে এতবড় শিক্ষণীয় ছিল যে, আমি আমার জীবনে সেই শিক্ষা প্রয়োগ করার প্রাণপণ চেষ্টা করি যদিও অস্বীকার করবো না, আমি ব্যক্তিজীবনে নিয়ন্ত্রণহীন বদরাগী লোক। এর জন্য অনেক কাফফারা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে দিতে হয়েছে। জেলখানায় মাসে একবার অথবা দু’বার ডিআইজি সাহেব পরিদর্শনে আসতেন। জেলের পরিভাষায় ওটাকে ফাইল বলা হতো। বঙ্গবন্ধু ছাড়া আমাদেরকে ফাইলের সময় সেলে আটকে রেখে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেয়া হতো। মুজিব ভাই দেওয়ানিতে সম্পূর্ণ অবমুক্ত থাকতেন। ইজি চেয়ারে স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি বসে থাকতেন। বছরে একবার আইজির পরিদর্শনকালেও এর কোনো ব্যতিক্রম হতো না। আইজি সাহেবের পরিদর্শনতো রাজসিক ব্যাপার; ডিআইজি সাহেবের পরিদর্শনও কম যেত না। বিরাট রাজছত্র তার মাথায় ধরে রাখতো। কয়েদি, মেট, মিয়া সাহেব, হাবিলদার, সুবেদার মেজর, ডেপুটি জেলার, জেলার তার পরিদর্শন সঙ্গী থাকতেন। সে এক এলাহী কারবার। এটাই বৃটিশ রেওয়াজ। যাই হোক আমরা লকাপটাকে ভীষণভাবে অপছন্দ করতাম এবং এটা বন্ধ করতে একটা আন্দোলনও চালু ছিল। একদিনের ফাইলের পূর্বে আমরা সেলে অবস্থানরত রাজনীতিবিদরা একটা ফন্দি করলাম এবং ওটাকে কার্যকরের দায়িত্বটাও আমার ঘাড়েই পড়লো। পরিদর্শনের সময় সেলে আটক অবস্থায় ১৪ শিকের সামনে একটা টেবিল রেখে আমি টেবিলে পা তুলে নাচাবো। আমার সামনে খবরের কাগজ থাকবে। ডিআইজি সাহেব পরিদর্শনে এসেছেন এটা যেন আমি জানিই না। ডিআইজি ওবায়দুল্লা সাহেব এসে যথারীতি আসসালামু ওয়ালাইকুম বললেন, আমি কাগজ পড়ার অভিনয় করে গম্ভীর গলায় ওয়ালাইকুম আসসালাম বললাম। কিন্তু কার্যত ওনাকে কোনো পাত্তাই দিলাম না। পরিদর্শন (ফাইল) শেষ হয়ে গেল। আমাদের সেলের লৌহদ্বারগুলো খুলে দেয়া হলো। আমি বীরদর্পে দেওয়ানিতে গিয়ে সবিস্তারে কিছুটা রঙ ছড়িয়ে সমগ্র ঘটনাটা বিবৃত করছিলাম মনে হচ্ছিল আমি যেন রাজ্য জয় করে এসেছি। ইতিমধ্যে অন্যান্য সহকর্মীও দেওয়ানিতে এসে গেছেন। এই অপকীর্তিতে তাদেরও তো স্বকীয় মদত ছিল। বুঝতে পারলাম ডিআইজি সাহেব আমাদের সেল থেকে বেরিয়ে বেদনাহত চিত্তে মুজিব ভাইয়ের কাছে ঘটনাটা বর্ণনা করেছেন। তাই ঘটনা বর্ণনায় আমার উচ্ছ্বাসকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। কিছুটা রূঢ় কণ্ঠে বললেন বেয়াদবির মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। বেয়াদবিতে নিজেকেই ছোট করা হয়। ডিআইজি সাহেব বয়সে তোমার অনেক বড়। তার সঙ্গে এই আচরণ করা প্রচণ্ড অভদ্রতা হয়েছে। পরিদর্শনের সময় সেলে বন্দি থাকার প্রতিবাদ করার আরো অনেক সম্মানজনক পথ খোলা ছিল। প্রয়োজনে পরিদর্শনের দিন প্রতীকী অনশন করতে পারতে। এমনকি ডিআইজি সাহেবকেও বলতে পারতো অবস্থার পরিবর্তন না হলে তোমরা মুখ ঢেকে শুয়ে থাকবে। তার সঙ্গে কোনো কথোপকথন হবে না। কিন্তু তার অবস্থান কর্মচারীদের সামনে টেবিলে পা তুলে দিয়ে থাকা তোমার হীনম্মন্যতার পরিচয় দিয়েছ। এটা ভবিষ্যতে আর কোনোদিন করবে না। দেখলাম যারা আমাকে উসকিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন, তারা আস্তে আস্তে কেটে পড়ছেন আমাকে তোপের মুখ থেকে রক্ষা করার কোনো রকম চেষ্টা না করেই।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন