একাত্তর: আগে-পরে, ৯

মুজিব ভাইকে জেলখানায় ডিটেকটিভ বই পড়তে দেখেছি

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
জেলখানায় সময় কাটানো সত্যিই মুশকিলের বিষয় ছিল। বই-পত্রিকা পড়ে, হাঁটাহাঁটি করেও দিন কাটতো না। দুপুরে খাওয়া হলেই আসতো ঝিমুনি। মুজিব ভাই থাকতেন দেওয়ানিতে। দুপুর হলেই
মুজিব ভাই সেলের রুমে রুমে ঘুরে টহল দিতেন। আমাদের মধ্যে কেউ ঘুমাচ্ছি কিনা তাই তিনি লক্ষ্য রাখতেন।
কিন্তু কি আর করা, সময়তো কাটে না। যদিও কারাগারের লাইব্রেরি ছিল খুবই সমৃদ্ধ। বই পড়ে সন্ধ্যা-রাত কেটে যায়। দিনের বাকি সময় সবাই মিলে সময়টা কিভাবে কাটানো যায় তাই ছিল আমাদের ভাবনার বিষয়- এমন নানা ঘটনার সাক্ষী নূরে আলম সিদ্দিকীর ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারে আজ পড়ুন অষ্টম কিস্তি:
জেলখানায় মুজিব ভাইও খুব আমুদে ছিলেন। সব সময় খোশ মেজাজে থাকতেন। ইজি চেয়ারে অর্ধশায়িত অবস্থায় পাইপ খেতেন। আমাকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাতে হতো। তিনি প্রায়শ: ধমক দিতেন, মিনমিন করে পড়ো না, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জোরে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে পড়। একদম টেপ খেয়ে গেছো। মনে রঙ রস কিছুই নাই। অথচ আমি সত্যিকার অর্থেই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম। মন মরা ভাবটা আমার আদৌ ছিল না। জেলখানার লাইব্রেরিটা খুব সমৃদ্ধ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে অনেক সশস্ত্র বিপ্লবীদের বৃটিশ আমল থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হতো এবং সুকৌশলে তাদের বাম ধারার রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে তোলা হতো। জেলখানার লাইব্রেরিকে সমৃদ্ধ করার পেছনেও একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। ভারতীয় রাজনীতির কালমার্কস, এঙ্গেলস, ম্যাক্সিম গোর্কি, টলস্টয়, মাও সেতুং এর জীবন আলেখ্য থেকে অনেক দুষ্প্রাপ্য বই জেল লাইব্রেরিতে পাওয়া যেতো। জেলের বাইরে থাকলেও অনেক রাত পর্যন্ত বইপড়া এবং অনেক বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা আমার বদভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। জেলের বাইরে থাকাকালীন সিনেমা দেখাও আমার একটা মারাত্মক নেশা ছিল। কিন্তু কোন অবস্থাতেই ডিসি’র নিচে বেলকনি অথবা রিয়ার স্টলে আমি সিনেমা দেখিনি। অনেক সময় পয়সার অভাবে ডিসির টিকিট কাটা সংকুলান হতো না বলে সিনেমাটাই দেখা হতো না। বন্ধুরা আমার প্রতি খুব বিরক্ত হতো এবং আমাকে ছেড়ে তারা জোটবদ্ধ হয়ে সিনেমা দেখতে যেতো। ছোট্ট একটি সিনেমা হল নাম তার নাজ। ওখানে বেশির ভাগ ইংরেজি সিনেমা চলতো। ওখানে চুপিসারে একা একা সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসতাম।
এবার জেলখানার কথায় ফিরে আসি। জেলখানার কথা মানেই ঘুরেফিরে মুজিব ভাইয়ের কথা এসে যায়। আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলার পূর্বে ওনি যে দেওয়ানীতে থাকতেন ওখানে পুরনো বিশ অথবা নতুন বিশ যেখানেই থাকি না কেন বসের নিবিড় সান্নিধ্য আমাকে জেলখাটার নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে দেয়নি। নেতার বই পড়ার অনভ্যাস ঘুচানোর আমি অনেক চেষ্টা করে বকা খেয়েছি। রেগে গেলে বলতেন আমাকে আঁতেলগিরি দেখাও। তা সত্ত্বেও অনেক বইয়ের পাতা মুড়ে আমি তার টেবিলে রেখে আসতাম। আমার যতদূর মনে হয়, তিনি কখনও কখনও ডিটেকটিভ বই পড়তে পছন্দ করতেন। কারণ তার টেবিলে আমি অনেক সময় দস্যু মোহন, দস্যু বাহ্‌রাম ইত্যাদি ডিটেকটিভ বই দেখেছি। রাতে নিঃসঙ্গবোধ করলে হয়তো তিনি বই পড়তেন। দিনের বেলায় ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত খবরের কাগজ-পড়া, রাজনৈতিক আলোচনা করা। এই রাজনৈতিক আলোচনার প্রাক্কালে আমি অনেক সময় বই থেকে উদ্ধৃত দেয়ার উছিলায় কিছু কিছু পড়ে শোনাতাম। লক্ষ্য করতাম এই সময় তার অদ্ভুত সুন্দর গোঁফের নিচে একটি স্মিত হাসি। তবুও বাড়াবাড়ি করতাম না। কারণ, ধমক খেলে সমগ্র পরিবেশটি পণ্ড হয়ে যাবে। দুপুরে খাওয়ার পরে আমি চাইতাম বিশ সেলে বসে বই পড়তে পড়তে একটুখানি দিবানিদ্রার সুখ নিতে। এতে মুজিব ভাই ভীষণ রেগে যেতেন। কখনও কখনও স্বয়ং আমার সেলে ওঠে আমাকে বেত দিয়ে খোঁচা দিয়ে ঘুমের ঘোর কাটাতেন। তন্দ্রার ঘোর কাটাতেন। মোয়াজ্জেম ভাই থাকলে হাজতি হিসেবে বাকি ভাই, মেনন সাহেব, নূরুল ইসলাম সাহেব এমনকি বাবু চিত্তরঞ্জন সুতারকেও দুপুরে ঘুমাতে দিতেন না। এটা তার অদ্ভুত ধরনের খামখেয়ালিপনা বা ছেলেমানুষি ছিল। তিনি জানতেন আমরা কখন দিবানিদ্রার সুযোগ নিব। তখন তিনি পা টিপে টিপে সন্তর্পণে প্রতিটি সেলে যেতেন। হাতে একটি বেত রাখা তার শখের অংশ ছিল। কেউ দিবানিদ্রার সুযোগ নিতে চাইলে তাকে বেতের খোঁচা দিয়ে ওঠিয়ে প্রচণ্ড মজা পেতেন এবং হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলতেন ধরেছি ধরেছি, চোরা ধরেছি। প্রায় সময় গোপালগঞ্জের ভাষায় কথা বলতেন। দুপুরে ঘুমুতে না পারলেও তার এই কৌতূহলী উদ্দীপনা বা ছেলেমানুষি আমরা উপভোগ করতাম। মনেও কোনো রাগ বা ক্ষোভের সৃষ্টি হতো না। একদিন সাহস করে আমি বললাম না ঘুমালে দুপুরে করবোটা কি? রাতে তো বই পড়ি। বিকালে হাঁটি। সকালের দিকে বিভিন্ন ধরনের খবরের কাগজ পড়ি। রাজবন্দি সংক্রান্ত যেকোনো খবর কালি দিয়ে লেপ্টে দেয়া হতো। পড়ার কোনো অবস্থা থাকতো না। তবে মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে কোর্টে হাজিরা দিতে গেলে আমরা এসব খবরের কাগজ সংগ্রহ করে আনতাম। মুজিব ভাই এতে খুব খুশি হতেন এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। এটা পরে তাকে পড়ে শোনাতাম। এইসব মিলেও দুপুরটা কাটতে চাইতো না। এমনি দুপুর বেলাটা কেমন যেন একটা নিঃসঙ্গ লাগে কাজের মধ্যে ডুবে না থাকলে। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে এই নিঃসঙ্গতা খুবই কষ্টদায়ক ও মর্মান্তিক ছিল। আমি খুবই সাহস করে একদিন বসকে বললাম আমরা দুপুরে ব্রিজ খেললে সময়টা ভালো কাটবে। কথাটা বলে ফেললেও আমার মনের মধ্যে প্রচণ্ড ভয় কাজ করছিল। কি জানি কোনো ধমক খেতে হয় কিনা। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। নেতা অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বললেন, প্রস্তাবটি সানন্দ চিত্তে গৃহীত হলো। এটার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাস্তবায়িত করার নির্দেশ দেয়া হলো। ওনার একটা স্বভাবসুলভ ভঙ্গি ছিল সেটা সব সময় আমাদের মুগ্ধ করতো এই সমস্ত কথা বলার সময় মনে হতো তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করছেন। তার দেহের ভাষা বাচনভঙ্গি সবকিছু মিলিয়ে এই ধরনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় তাকে একজন ভিন্ন মুজিব ভাই মনে হতো। বাইরে থেকে তাকে যেমন রাশভারি মনে হতো। কারাগারের অভ্যন্তরে কখনোই তাকে তেমনটি মনে হয়নি। আমাদের সংগঠনের বাইরেও কারাগারে যারা তার সান্নিধ্যে এসেছে তারাও মুজিব ভাইয়ের স্নেহের প্রচণ্ড উত্তাপ হৃদয় ভরে অনুভব করেছেন। আজও ভাবি অন্যকে আপন করে নেয়ার তার যে অদ্ভুত ও দুর্বার সম্মোহনী শক্তি ছিল ব্যক্তি মুজিবকে সেটাই কালে কালে জাতির জনকে রূপান্তরিত করেছে। সত্যের খাতিরে কথাটি আবার উল্লেখ করতে হয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন