একাত্তর: আগে-পরে, ৮

মুজিব ভাই হেসে বললেন, আর ব্রিজ নয় এবার ৬ দফা

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
জেলখানায় মুজিব ভাই ছিলেন খুবই আমুদে লোক। সব সময় খোশমেজাজে থাকতেন। যদিও বাইরে থেকে রাশভারি মনে হতো। কিন্তু কারাগারের অভ্যন্তরে একেবারেই ভিন্ন মানুষ ছিলেন তিনি। সময় কাটাতে জেলখানায় তাস খেলার প্রস্তাব রাখলে সম্মতি দিলেন। খেলাও চলতে লাগলো।
খেলার মধ্যেই হঠাৎ একদিন মুজিব ভাই বলে বসলেন, আর ব্রিজ নয় এবার ৬ দফা। আমরা সকলেই সেদিন অবাক হয়েছিলাম। ধীরে ধীরে মুজিব ভাইয়ের সেই কথার মর্মার্থ আমরা উপলব্দি করতে পেরেছি। জেলখানার সেইসব দিনগুলোর নানা স্মরণীয় স্মৃতি নূরে আলম সিদ্দিকীর বয়ানে। আজ পড়ুন নবম কিস্তি:
জেলখানায় তাকে তাস খেলার প্ররোচনা দিলে তিনি সম্মত তো হলেনই, সে সঙ্গে পরদিন থেকেই তাস খেলা শুরু হলো। মুজিব ভাইকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করে সেনাছাউনিতে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিন-চার দিন প্রত্যহ আমরা তাস খেলেছি। এখানেও বিষয়টি ভীষণ মজার- আমি আর মুজিব ভাই, মোয়াজ্জেম ভাই, নূরুল ইসলাম ভাই ব্রিজে আমি মুজিব ভাইয়ের পার্টনার হয়ে একদিকে- অন্যদিকে মোয়াজ্জেম ভাইয়ের পার্টনার নূরুল ইসলাম ভাই। মুজিব ভাই খুব ভালো কার্ড পেতেন। খেলাটা প্রায় আমাদের দিকে থাকতো। তাস খেলায় জেতার একটা নেশা থাকে। নেশাটি খুবই মারাত্মক। মুজিব ভাইও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা খেলতাম। সেই ক্ষেত্রে মুজিব ভাই ডামি হয়ে যেতেন। এভাবে অনেকদিন খেলা চলেছে। প্রায় আমরা জিততাম। শতকরা আশি ভাগই আমাদের জয় হতো। আমি তো বটেই, মুজিব ভাইও খুব আনন্দ পেতেন। হঠাৎ একদিন বিস্ময়কর একটি ঘটনা ঘটলো। মুজিব ভাই তার স্বভাবসুলভ হাসি হেসে বললেন, আর ব্রিজ নয় এবার ৬ দফা। আমরা তো অবাক! তাসের মধ্যে আবার ৬ দফা আসে কোত্থেকে? আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, শোনো মিয়া, আমি ভালো তাস পেয়ে ডামি হয়ে থাকবো আর তুমি খেলে মজা নেবে তা হবে না; এখন থেকে যার যার তার তার। তখনও বিষয়টি দুর্বোধ্যই ছিল। উনি ভেঙে বললেন, এরপর থেকে ব্রে খেলা হবে। যার যার মাজার জোরে সে সে কুদবে। আমি তাস পাবো আর আলম পাকিস্তানিদের মতো ফাউ মাতব্বরি করবে, আমার তাস নিয়ে তা আর হবে না। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। তারপর থেকে ব্রে খেলা শুরু হলো। কাকতালীয় হলেও আশ্চর্যের বিষয়, ব্রে-তেও মুজিব ভাই খুব ভালো কার্ড পেতেন। খেলায় খুব পারদর্শী না হলেও কোনোভাবেই তাকে ব্রে করা যেতো না। আমি খুব চেষ্টা করে তাকে চেপে খেলতাম। কোনোভাবে যদি তাকে হারানো যায়। কিন্তু এতোই ভালো কার্ড পেতেন যে, তাকে হারানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতো। আমি এবং নূরুল ইসলাম ভাই একটু যোগসাজশ করতাম। কিন্তু মোয়াজ্জেম ভাইকে আমাদের দলে ভিড়াতে পারিনি। যোগসাজশের প্রস্তাবটি মোয়াজ্জেম ভাইকে করতেই সাহস পাইনি। কারণ নিশ্চিত ছিলাম, মোয়াজ্জেম ভাই অবশ্যই মুজিব ভাইকে জানিয়ে দেবেন। তখন তো আর দুর্ভোগের শেষ থাকবে না। খেলাতো বন্ধ হবেই আমাকে আরও কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। অনেক দিন আমরা ব্রে খেলেছি। জেলের নিঃসঙ্গ জীবনের যন্ত্রণা তো থাকতো না। আজকেও ওই স্মৃতি আমাকে শিহরিত করে, বিমুগ্ধ করে, সমস্ত অনুভূতিকে আপ্লুত করে।
জেলখানায় মুজিব ভাই যে দেওয়ানিতে থাকতেন তার সঙ্গে অ্যাটাস্ট টয়লেটটি সেনিটারি ছিল। তখনকার দিনে সন্দেহাতীতভাবে একটি মারাত্মক সুবিধা ছিল। তার মাথার ওপরে একটি ছোট্ট বৈদ্যুতিক পাখা ছিল। বাতাস দেয়ার ব্যাপারে পাখাটি খুবই কৃপণ ছিল। আমরা চারজন তাস খেললে বা অন্য রাজবন্দিরা দর্শক থাকলে খুবই কম বাতাস পেতাম। সে ফ্যান শুধু মুজিব ভাইকে বাতাস দেয়ার জন্য ঘুরতো। আজকের বিচিত্র অনুভূতিতে সেসব স্মৃতি কথা মনে পড়লে খুবই ভালো লাগে। নিজের অজান্তেই মনে হয় দিনগুলো সত্যিই মধুর ছিল। চিত্তের বিহ্বলতা এতই প্রবল হয় যে, কখনো কখনো ওই দিনগুলো ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পর দীর্ঘ উনিশ মাস আমি অবরুদ্ধ ছিলাম। কারাগারের নতুন সেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেবের আমলে তৈরি; সম্ভবত ওনারাই প্রথম অবস্থানকারী ছিলেন। সেখানেও রোজই ব্রিজ খেলা হতো। কিন্তু ১৯৬৬ সালের পর মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে খেলার যে মজা তার সঙ্গে তুলনা চলে না। তাস খেলার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার সে কি বাহার। খাওয়া-দাওয়ার প্রতি মুজিব ভাইরে তেমন আগ্রহ না থাকলেও তিনি খাওয়াতে পছন্দ করতেন। তার শয়নকক্ষ থেকে বিশ-বাইশ গজ দূরে তারই জন্য ছোট্ট একটি সংরক্ষিত রান্না ঘর ছিল। জেলখানার কয়েদিদের মধ্যে যে তার রান্না করতো সে অত্যন্ত দক্ষ ও মেধাবী ছিল। তার রান্না এতই সুস্বাধু ছিল, আজও যেন তা জিভে লেগে আছে। মুজিব ভাই প্রায় আমাকে সঙ্গে নিয়ে দেওয়ানিতে খেতেন। আবার কখনো কখনো আমার সেলে খাবার পাঠিয়ে দিতেন। সহবন্দি সবাইকেই হয়তো দিতেন কিন্তু আমার কোটা ছিল ভিন্ন। ভাবী যখন তখনকার রেক্স থেকে কাবাব আর পরোটা পাঠাতেন তখন আমার জন্য বিশেষ বরাদ্দ ছিল। কমপক্ষে বিশটি পরোটা ও দশটি কাবাব। আমি এতই খাদক ছিলাম যে আমাকে কারাগারের প্রদেয় বরাদ্দ খাবার সাবাড় করে সেই রুটি-কাবাব খেতাম। কাবাব পরোটা সাক্ষাৎকারের সময় ভাবী প্রচুর খাবার আনতেন। দু-তিনজন ফালতু মাথার ওপর ঝাঁকি নিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারগুলো দেওয়ানিতে পৌঁছে দিত। আমি তৃষিত চাতকের মতো চেয়ে থাকতাম কখন ভাবীসহ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকার শেষ করে বিশাল খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দেওয়ানিতে ফেরত আসবেন। গোপালগঞ্জের কই টক-মিষ্টিভাবে অদ্ভুত সুন্দর একটি রান্না ভাবী করে নিয়ে আসতেন। আমি খুশিতে আনন্দে লাফাতাম। মুজিব ভাই অবস্থাটি উপভোগ করতেন এবং আমার জন্য আলাদা করে খাওয়া লুকিয়ে রেখে পরে বণ্টন করতেন। একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটে তখন মোয়াজ্জেম ভাই আমাদের বিশ সেলের একটি কক্ষে থাকতেন আমি অন্যটিতে। বিকালে যখন খাওয়া আসে তখন মুজিব ভাই আমাকে ইশারা করেন, অনেক কাবাব-পরোটা এসেছে, তুই খেয়ে নে। পরে রাতে লকাপের পরে আমি বণ্টন করবো। আমি তো অর্ধেকের বেশি সাবাড় করেছি। অন্যদের ভাগে পড়েছে মাত্র একটি পরোটা অর্ধেক কাবাব। মোয়াজ্জেম ভাই অর্ধেক কাবাব ও একটি পরোটা থাকায় আমার জন্য খুব আপসোস করেছেন। উনার ধারণা হয়েছে, একটা পরোটা, অর্ধেক কাবাব আলম তো এক পলকেই খেয়ে ফেলবে। একবার ভেবেছিলেন তার অংশটুকু আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। পাছে মুজিব ভাই রাগ হয়ে যান এই ভয়ে তিনি পাঠাননি। যেহেতু সন্ধ্যার আগে আমি পেট পুরে খেয়েছি তাই আমাকে পাঠানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। পরদিন সকালে সেল থেকে বেরিয়ে মোয়াজ্জেম ভাই আমাকে জিজ্ঞাস করলেন ঐটুকু কাবাব আর পরোটাতে তোর কিছুই হয়নি। কাবাব ও পরোটা দুটোই খুব মজা ছিলো রে। আমি বিস্মিত ভাব দেখিয়ে ভুরু কুচকে বললাম, মোয়াজ্জেম ভাই, লকাপের পরে আমিতো কাবাব পরোটা পাইনি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মুজিব ভাইয়ের মেটের নামও ছিল ফরিদ। বাড়িও ফরিদপুর। খাওয়া নিয়ে মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমি যে খাই খাই করতাম এটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে ছিল। এটা কোনোক্রমেই মেট ফরিদ বরদাশত করতে পারতো না। মুখ ফুটে কিছু না বললেও আমার প্রতি তার খিটমিটে ভাবটা মুজিব ভাই ও মোয়াজ্জেম ভাই অনুধাবন করতে পারতেন। আমি যখন কাবাব পরোটা রাতে পাইনি বললাম, তখন মোয়াজ্জেম ভাই ভীষণভাবে ক্রোধান্বিত হয়ে দেওয়ানিতে বসের কাছে নিয়ে বললেন, মুজিব ভাই ফরিদকে এখনই তাড়িয়ে দিতে হবে। ও আলমের সঙ্গে কাল রাতে যেটা করেছে, এটা সহ্য করা যায় না। মুজিব ভাইতো বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পেয়েছেন তা সত্ত্বেও তিনি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন মোয়াজ্জেম কী হয়েছে। ফরিদ রেক্সের কাবাব-পরোটা আলমকে কাল রাতে দেয়নি। মুজিব ভাই বিষয়টি খুবই উপভোগ করছিলেন। কৌতুক করে বললেন, ঠিকই মোয়াজ্জেম ফরিদকে আর রাখা যাবে না। তারপরে সজোরে হাসি দিয়ে বললেন, ওকে রাতে দেবে কোত্থেকে বিকালেই তো অর্ধেক সাবাড় করেছে। অবশ্য আমিই বলেছিলাম ওকে জান ভরে খেতে। তবে ও যে অর্ধেক খেয়ে ফেলবে বুঝতে পারিনি। মোয়াজ্জেম ভাই সুচ ফোটানো বেলুনের মতো চুপসে গিয়েছিলেন। ভাগ্যচক্রে আমিও মোয়াজ্জেম ভাইয়ের হাতে মার খাওয়ার হাত থেকে সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

আইভীকে হাসপাতালে দেখে আসলেন ওবায়দুল

তিস্তা কূটনীতিতে চোখ ঢাকার

শাহজালালে বৈদেশিক মুদ্রাসহ দুই যাত্রী আটক

দারুণ শুরু বাংলাদেশের

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ফেলানী হত্যার রিট শুনানি ফের পেছালো

যশোরে বিএনপি নেতা অমিতের বক্তব্যে তোলপাড়

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু

‘বিষয়টি নিয়ে আমি বেশ উত্তেজিত’

পাঁচ দশকের দীর্ঘ লড়াই

ভিডিও দেখে অস্ত্রধারীদের খোঁজা হচ্ছে

‘অতিষ্ঠ হয়ে প্রেমিককে ছুরিকাঘাত’

ফল প্রকাশের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, অবরোধ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সময় লাগবে ৯ বছর!

মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, আক্রমণের শিকার নাগরিক সমাজ

মেয়র আইভী হাসপাতালে

জিয়াউর রহমানের ৮২ তম জন্মবার্ষিকী আজ