একাত্তর: আগে-পরে, ৬

স্বাধীনতার পর বাম চেতনা আঁকড়ে ধরা ছিল ভুল

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামের অর্জন স্বাধীনতা। নতুন দেশ। ভেঙেপড়া প্রশাসন গড়ে তোলার বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাম ধারণার রাজনীতি কুক্ষিগত করে সব কিছু। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ওপর তারা এমনভাবে জেঁকে বসে যে, সব কিছুই তাদের ইচ্ছানুযায়ী চলতে শুরু করে। স্বাধীনতার পরপরই সমাজতন্ত্রের নামে সকল কলকারখানা জাতীয়করণ করা হয়।
কেমন ছিল সদ্য স্বাধীন দেশের সেই মুহূর্তগুলো- তা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীর বয়ানে। আজ পড়ুন ষষ্ঠ কিস্তি।
প্রশ্ন: যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন  কিন্তু অল্পদিনেই তা ব্যর্থতার দিকে কিভাবে বাঁক নেয়?  
স্বাধীনতার পরে বাম চেতনাকে আঁকড়ে ধরা ছিল বড় মাপের ভুল। বাম ধারার রাজনীতি কুক্ষিগত করেছিল সবকিছু। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী নেতৃত্বকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দলের মধ্যে তারা এমনভাবে ঝেঁকে বসে যে, সবকিছুই তাদের ইচ্ছানুযায়ী চলতে শুরু করে। বর্তমান সময়ে শেখ হাসিনার রাজনীতিও তাদের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আমাদের প্রথম ব্যর্থতা আমরা জাতির জনককে তার স্বকীয় রাজনীতিতে ধরে রাখতে পারিনি। আমরা বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রিত্ব বা রাষ্ট্রপতি না হয়ে জাতির পিতা হিসেবেই টুঙ্গীপাড়ায় অবস্থান নিতে সম্মত করাতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। এ প্রশ্নে আমার নেতাকে অনেক পীড়াপীড়ি করেছি। বুঝাতে চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি সকল সমালোচনার আওতার আবর্তে পড়েন। কিন্তু জাতির পিতা সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে। তিনি ধৈর্য ধরে কথা শুনতেন। কিন্তু তার জীবদ্দশায় কখনই এই ঘটনাটি আসেনি। ক্ষমতার জন্য তিনি অন্ধ ছিলেন এটা না বললেও ক্ষমতা পারিপার্শ্বিক অবস্থান এবং পরিবারের প্রভাব তাকে হয়তো ক্ষমতা ছেড়ে জাতির জনক হয়ে থাকার সিদ্ধান্তে আসতে দেয়নি। দুই. স্বাধীন দেশে দক্ষ প্রশাসক আমরা তেমন একটা পাইনি। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের দুই বছরের জ্যেষ্ঠতা প্রধান একটি মারাত্মক ভুল ছিল। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন করা সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। জ্যেষ্ঠতা প্রদানের কারণে অনেক জ্যেষ্ঠ প্রধান অফিসারও অধীনস্ত হয়ে যান। যারা মূল পদগুলো দখল করেন তারা প্রায় সকলেই পূর্ব-পাকিস্তানের উপ-সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন। তারা রাতারাতি স্বাধীন বাংলাদেশের সচিব হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব পেয়ে যান। একজন মেজর ৬ মাসের ব্যবধানে মেজর জেনারেল হয়ে যান। এখানে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলবো সেক্টর কমান্ডারদের সামরিক চাকরিতে না রেখে নানা রকমের সম্মান ও পদবিতে ভূষিত করে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে নিয়োগ দিলে তারা এতো উচ্চাভিলাষী হওয়ার সুযোগ পেতেন না। অস্বীকার করার সুযোগ নেই ১৫ই আগস্টের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডই নয় সকল সফল অথবা ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের দায়ভার মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারদের ঘাড়েই বর্তায়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এবং উসকানি দাতা ছিলেন পাকিস্তান ফেরত সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। মুক্তিযুদ্ধের সেনাধ্যক্ষ জেনারেল ওসমানী সাহেবের হাতে বাংলাদেশের নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তোলার দায়িত্ব দিলে সামরিক বাহিনীতে এতো গোঁজামিল সৃষ্টি হতো না। অন্যদিকে বেসামরিক প্রশাসনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি রুহুল কুদ্দুস ও আহমদ ফজলুর রহমানের হাতে প্রশাসন গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রদান করলে অনেক সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। এই ভুল সিদ্ধান্তটি সামরিক ও বেসামরিক দুটি সংস্থাতেই একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পরপরই সমাজতন্ত্রের নামে সমস্ত কলকারখানা জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু সমাজতন্ত্রকে কার্যকর করার জনশক্তি ও কোনো অবকাঠামো আমাদের ছিলো না। ফলে গোটা ব্যবসা বাণিজ্য এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি অনিশ্চয়তা ও অরাজকতার অন্ধকার নেমে আসে। পাকিস্তানিদের শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ হলেও বাঙালি শিল্পপতিদের শিল্প কারখানায় যে উৎসাহ ও প্রণোদনা দেয়া উচিত ছিল তাতো দেয়া হয়নি বরং তাদের গুলো জাতীয়করণ করা হলো এবং আস্তে আস্তে বৈদেশিক নীতিতেও আমরা সমাজতান্ত্রিক ধারার দিকে ঝুঁকে পড়লাম। যার ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ আমাদেরকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করলো এবং সাহায্য সহযোগিতায় ক্রমান্বয়ে হ্রাস টানতে টানতে চুয়াত্তরের মন্বন্তর তৈরি করে দিলো। অন্যদিকে সিরাজ শিকদার, গণবাহিনী, হক তোহা প্রভৃতি অতি বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগ্রামের মহড়ায় থানা লুট, খাদ্যশস্য ও পাটের গুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়া, ঈদের জামাতে নিরীহ ও জনপ্রিয় সংসদ হত্যা প্রভৃতি ঘটনাসমূহ বাকশাল গঠনের উপকরণ তৈরি করে। পশ্চিমা শক্তির অসহযোগিতা বঙ্গবন্ধুর সম্মান, সচেতনতা বোধে প্রচণ্ড আঘাত হানে। এটাও বাকশাল গঠনের অন্যতম উপকরণ। সে সময় দুর্নীতি এত ব্যাপক আকার ধারণ না করলেও স্বজনপ্রীতির প্রকটতা দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধুর কর্মীর প্রতি ভালোবাসা আকাশছোঁয়া হলেও অনেকেই তার নেপোটিজমের বা স্বজনপ্রীতির দিকটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করতেন। আমি তাদের সঙ্গে ষোলআনা একমত না হলেও বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতেও পারি না।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন