‘সত্যবাবু মারা গেছেন’ বইয়ের একাদশ অধ্যায়

জেলখানার ভাত আমি খাব না

মিডিয়া কর্নার

| ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার
প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের দেখা বহুল বঠিত গ্রন্থ ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’। বইটির একাদশ অধ্যায় জেলখানার ভাত আমি খাব না:

এমন সময় দুর্গাদাস ভট্টো এসে উপস্থিত। মাথায় উসখুসে চুল, বুদ্ধিদীপ্ত চক্ষু অনবরত ঘুরছে, সার্টের বোতাম ঠিক মতো লাগানো নেই- একেবারে ডন্টুক্যায়ার ভাব। নাজির জমাদার সম্মুখেই পেলো বৃদ্ধ কমিউনিস্ট নেতা নগেন সরকারকে, বলল: দুর্গাদাস বাবুকো লেইয়ে। ইয়ে ওয়ার্ড মে রাহেগা। আমরা একজন বন্ধু-সাথী পেলাম।
সবাই খুব খুশি, দলে ভারী হলাম তো। অদ্ভুত আমাদের চরিত্রের গাঁথুনি বলতে হবে- এক ভদ্রলোক কি না কি বিপদে পড়ে নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে খোয়াড়ে বাসিন্দাদের সংখ্যা বাড়ালো, তাতে রাজনৈতিক দিক থেকেও দুঃখিত না হবার কারণ নেই। কিন্তু হাসি মুখেই আমরা তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালাম। আমাদের এই পৃথিবীতে অনেক কিছুই ভিন্ন প্রেক্ষিতে দেখা হয় এবং আমরা কেউ তখনো পাগল হইনি- অর্থাৎ আমাদের মধ্যে অনেকই জীবনে বহু বার জেল খাটার পরও পাগল হয়নি; এক কথায় তাদের পাগল করা যায়নি। তবে কি দুর্গাদাস পাগল হয়েই এলো? পাগলের কথাটা এজন্যে আসছে যে, ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের দু’নম্বর ওয়ার্ড বা ‘খাতার’ অদূরেই পাগলাগারদ বা রক্ষিত পাগলদের ওয়ার্ড। আমরা যেমন নতুন বন্দী এলে স্বাগত জানাই, এই পাগলাগারদের বাসিন্দারাও তেমনি নতুন অতিথিকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আগমন সংবর্ধনা জানায়। জেলে গিয়েই পাগলাগারদে সংবর্ধনার ঘটনাটি শুনেছিলাম, এখন তো কাহিনীটা সর্বত্রই চালু। জেল কর্তৃপক্ষ একদিন সকালে আপাততঃ দৃষ্টিতে দেখতে সুস্থ ও পরিপাটি এক ভদ্রলোককে পাগলাগারদে ভর্তি করতে নিয়ে এলো। সংবর্ধনার এক পর্যায়ে যখন কোত্থেকে এলেন, বাড়ি কোথায়, আপনাকে দেখেছি মনে হয়, শরীর সুস্থ তো ইত্যাকার আলাপ গেটেই চলছিল, তখন খিটখিটে মেজাজের একজন এগিয়ে এসে নবাগত ব্যক্তির গন্ডদেশে ঠাস্ করে এক কঠোর চপেটাঘাত বসিয়ে দিয়ে বলল: পুরাতন পাগলে ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানী!
চপেটাঘাতের চাইতে বক্তব্যটা বাস্তব সত্য ছিল; আমরা সে পর্যায়ে পৌঁছাইনি বলে আমাদের অতিথি বন্দী দুর্গাদাসের কোন শারীরিক ক্ষতি হয়নি। কোন চার্জসীট নেই, বিচার নেই, আইনানুগ শাস্তি নেই; সে কারণে আমাদের কোন কাজও নেই। তবে আর কি করা? কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ টুয়ান্টি নাইন খেলছেন ফালতুদের সঙ্গে। আর কেউ কেউ চিঠি লিখছেন প্রিয়জন বা গুরুজনদের কাছে। এই ¤্রয়িমান পরিবেশে দুর্গাদাস এমনভাবে প্রবেশ করল যে, মনে হলো আমাদের মধ্যে সে অনেক আগেই ছিল। একজনের খাটের পাশে বসে দুর্গাবাবু হেসে বললেন: চিঠি লিখছেন, চমৎকার কিন্তু ব্যাপারটা।
ভদ্রলোক রসিক মানুষ। না কি কর্তৃপক্ষ ভুল করে পাশের ওয়ার্ডে না দিয়ে আমাদের আমাদের এখানে রেখে গেলেন। অগ্নিযুগের রাজনীতিক ফনি মজুমদার বিছানা থেকে ওঠে এসে বললেন: দুপুরে খেয়েছেন? ভাতের বন্দোবস্ত করি।
‘না না না! ও ব্যবস্থা করতে হবে না। আমার এক কথা- জেলখানার ভাত আমি খাব না!’ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল দুর্গাবাবু। চিঠির প্রতি আকর্ষণ, ভাতের প্রতি অনাকর্ষণ। না খেয়ে লোকটা বাঁচলে কি করে? আর জেলখানার কোন কিছুই তার বৈচিত্রপূর্ণ মনে হলো না, চিঠিই মহা আকর্ষণীয় বস্তু? হ্যাঁ, পরে দেখা গেল এই চিঠিই শেষ পর্যন্ত তাকে জেলে পুরেছে এবং জেলখানার ভাতের প্রতি বৈরাগ্য এনে দিয়েছে। প্রথম মার্শাল ল আটপঞ্চআশে জারী হবার পর থেকে যেন চট্টগ্রামের দুর্গাবাবুর চিঠি লেখার আকর্ষণ বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়ে গেল। এই চিঠি লেখার দিকে ঝোঁক তার আগেও ছিল। কিন্তু সে সময়টা তিনি যেন বেছে নিয়েছিলেন বন্ধু-বান্ধবদের কাছে অনবরত চিঠি লেখার জন্যে। গুপ্ত পুলিশের কাছে সে সমস্ত চিঠি গিয়ে পৌঁছাতে লাগল। অনেক হেঁয়ালিপূর্ণ বক্তব্য ও অসংলগ্ন বাক্যসমূহ তাদের কাছে দুর্বোধ্য নয়, গভীর অর্থবাহী বলে মনে হতে লাগল। তবে সঠিকভাবে কোন প্রকার মর্ম উদ্ধার করতে না পেরে দুর্গাবাবুকে বন্দী করাটাই তারা শ্রেয় মনে করলেন। কারণ এই সমস্ত দুর্বোধ্য বক্তব্য যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রটাকে উড়িয়ে দেয়, তখন? অজ্ঞানের জন্যে এ যুক্তি সজ্ঞানযুক্ত!
দুর্গাদাস বাবুর চিঠি লিখে জেল খাটাটা পৃথিবীতে এমন কিছু নয়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুতর কা- করে বসেছেন তিনি জেলের ভাত খাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করে। তিনি পুলিশকে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণযোগ্য অভিযোগ নেই; সে কারণে জেলের ভাত তিনি খাবেন না। অর্থ দু’টো হতে পারেÑ তিনি জেলে যাবেন না অথবা জেলে গেলেও জেলের খাদ্য খাবেন না। জেলে না আসলে মঙ্গলই ছিল। কিন্তু জেলে প্রবেশ করে যদি ভাত (খাদ্য) স্পর্শ না আসলে মঙ্গলই ছিল। কিন্তু জেলে প্রবেশ করে ভাত (খাদ্য) স্পর্শ না করেন, তবে তা’ জেলের ভাষায় গণ্য হতে পারে অনশন ধর্মঘট বলে। এতে বিপত্তি সঙ্গী বাসিন্দাদেরও।
তার চিঠি লেখায় কোন অভিনবত্ব ছিল কিনা জানি না; তবে চিঠি লেখার অভ্যাসটা বিশ্বময় প্রচলিত এবং মানব সমাজের এক সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মধ্যে এই পত্র লেখা গণ্য। দূরে যেতে হবে না। আমাদের সাথেই বন্দী ছিলেন সেকালের ‘পাকিস্তান অবজারভারে’ চীফ রিপোর্টার বন্ধু মাহবুব জামাল জাহেদী। কিছুদিনের জন্য আমাদের সুযোগ এলো এক পাতার চারটি পর্যন্ত চিঠি সপ্তাহে লেখার। পরে সেটা মাসে চারটি হয়। জাহেদীকে সে সব চিঠি সবার কাছ থেকে নিয়ে জেল গেটে পাঠিয়ে দেয়ার বিরাট দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি দক্ষতার সাথে কাজ পালন করতেন আর আমরা তাকে বলতাম পোস্ট মাস্টার জেনারেল।
সবার তো আর লেখার জায়গা নেই। তা’ ছাড়া এই চিঠি লেখার দেদার সুযোগকে আমরা কর্তৃপক্ষের ফাঁদ বলেও মনে করতাম। কিন্তু আমাদের পিএমজি জাহেদী সাহেব একটিও সাদা পাতা ফেরৎ দিতেন না। মনের শান্তিতে প্রতি সপ্তাহেই তিনি চিঠি লিখে যেতেন। আর এ সমস্ত চিঠি ছিল ধারাবাহিক উপন্যাসের মতোÑঅর্থাৎ একটা চিঠিই তিনি বছরখানেক পূর্বে শুরু করেছেন, এখনো চলছে।
জিজ্ঞেস করলাম: এতো চিঠি লিখছেন কার কাছে? আর এতো কথা লেখারই বা কি আছে?
: কেন, বউ-এর কাছে। তার কাছে তো বিষয়বস্তুর কোন ঘাটতি হবার কথা নয়। সব কিছুই লেখা যায়। শুনবে?
তিনি একটা পাতা পড়তে দিলেন। ভাবলাম পারিবারিক বা জেলখানার প্রত্যেকটি অক্ষর প্রাপকের কাছে যায়।
তিনি হেসে বললেন: একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত পত্র লেখার অধিকার আছে এবং সে চিঠি সেন্সর হয় না বলেই ধরে নিয়েছি। তা’ছাড়া স্বামী-স্ত্রী সংক্রান্ত যে সমস্ত কথা এসব চিঠিতে লিখছি, তা’ পড়ে ওরা দ্বিতীয়বার পড়বে না, একথা মনে করে এসব লিখছি। জাহেদী সায়েব যে সভ্য জগতের কথা বললেন, সেখানে চিঠির পবিত্রতা অবশ্যই আছে।
চিঠির জগতের বিকাশ বিশ্ব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গেই হয়েছে। অতীতে চিঠি লিখে রাজ্য আক্রমণের নজীর আছে এবং চিঠি লিখে বশ্যতা স্বীকারের উদাহরণ অনেক। চিঠি সাহিত্য হয়েছে এবং চিঠি নিয়েও সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বরের পূর্বে যুক্ত কমান্ডের পক্ষ থেকে জেনারেল স্যাম ম্যানেকশ’র নামে পাকিস্তানী সেনানায়ক নিয়াজীকে আত্মসমর্পণের জন্যে যে প্রচারপত্র বিমানযোগে বিলি করা হয়েছিল, তাও পত্র। সাম্প্রতিককালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের পূর্বে প্রধানমন্ত্রী মিসেস থ্যাচার আর্জেন্টিনাকে ধমক দিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাকেও আমরা পরদেশ আক্রমণের হুমকীসহ পত্র বরেই গণ্য করি। চিঠি লিখে অপরের কন্যা বরণ বা হরণ (প্রেমে) যেমন অহরহ ঘটনা, তেমনি আবার চিঠি লিখে ডাকাতি করতে যাওয়ার বা চাকরি খাওয়ার ব্যাপার কম নয়। চিঠি লিখে বিশ্বাসঘাতকতা বা চিঠির বক্তব্য পাল্টে দিয়ে রাজ্য শাসনেরও দৃষ্টান্ত আছে। চিঠি লিখে স্বাভাবিক কূটনৈতিক কার্যক্রম তো অনবরতই চলছে; তৃতীয় পক্ষের শিশুর মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েও উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক কর্মকা-ের উদাহরণ কালকের ঘটনা থেকেও দেখা যায়।
এ বছরের এপ্রিল মাসে আমেরিকার (মেইন, ম্যানচেস্টার) পঞ্চম গ্রেডের দশ বছরের স্কুল ছাত্রী সামান্থা সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান আন্দ্রোপভকে আশঙ্কিত আণবিক যুদ্ধ সম্পর্কে একটি চিঠি লিখেছিল। সেই চিঠির প্রতিটি অক্ষর দাঁড়ি কমা যেমন সোভিয়েত সরকার বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছে, তেমনি আন্দ্রোপভের উত্তরও হোয়াইট হাউজ ও প্যান্টাগণ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব রাজনীতি ও মারণাস্ত্র সীমিতকরণ বা বন্ধের কথা বিবেচনা করেই চিঠিটি লেখানো হয়েছিল এবং উত্তরও সেভাবেই বিশেষ গুরুত্ব সহকারে অথচ হালকা সুরে দেয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, উভয় পক্ষই নিজ নিজ স্বার্থে চিঠির অংশ বিশেষ প্রকাশ করেছে। চিঠিটি লেখানোর ব্যাপারে আমেরিকার শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলো কাজ করেছে। অপরদিকে ক্রেমলিনের শ্রেষ্ঠ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এই চিঠির উত্তর তৈরি করতে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সবটাই ব্যয় করেছেন। আন্দ্রোপভ সতর্কতা ও চাতুর্যের সঙ্গে উত্তরে সামান্থাকে ‘টম সয়্যারে’র সাহসী ও সৎ বন্ধু বেকীর সঙ্গ্ েতুলনা করেছেন। তার এই সতর্কতার একমাত্র কারণ তিনি জানতেন যে সামান্থাকে তিনি উত্তর দিচ্ছেন না। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে। চিঠিটি নিয়ে শেষ খেলা জমল দু’পক্ষ থেকেই চিঠির অংশ বিশেষ প্রকাশের ঘটনায়! উত্তর নিয়ে তেমন নয়। সোভিয়েট জানালো চিঠির প্রশ্ন ছিল: ‘আপনি যুদ্ধের পক্ষেনা বিপক্ষে? বিপক্ষে হলে কিভাবে যুদ্ধ এড়াবেন?’ অপরদিকে আমেরিকা সামান্থার চিঠির অংশ-বিশেষ প্রকাশ করল: ‘আপনি কেন বিশ্ব বিজয় করতে চান, অথবা অন্ততঃ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র?’
দুর্গাদাস সে সময় এই স্কুল ছাত্রীর চিঠির গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত হলে নিশ্চয়ই তার অর্থহীন চিঠিপত্র নিয়ে কেন যে সরকার উৎকন্ঠিত হয়ে তাকে জেলে পাঠালেন, তা’ উপলব্ধি করতে পারতেন।
প্রেমের জগতে চিঠির আমেজ ও গুরুত্ব অপরিসীমÑএর মূল্যায়নই করা সম্ভব নয়, যেমন প্রেমের। প্রায়ই যেমন এর সাফল্যও আনন্দঘন প্রকাশ দেখা যায়, তেমনি আবার অগণন বিপর্যয়ও ঘটে থাকে। এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক মিঃ বাকলার অতীতে তারুণ্যের তাড়নায় লিখিত প্রথম প্রেমের চিঠির দুর্গতির কথা লিখেছেন। তের বছরের প্রেমিকাকে চিঠি লেখার ম্যানুয়েল থেকে নকল করে যে পত্রটি তরুণ বয়সে লিখেছিলেন, তাতে দু’টি শব্দ ছিল ‘মেইনডেন্লী ডিগনিটি’। অর্থাৎ কুমারীসুলভ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থা। বিপর্যয় এমনই হল যে, চিঠিটা পড়ল গিয়ে মেয়ের পরিবর্তে মা’র হাতে। তিনি জানেন তরুণ প্রেমিককে কেমন করে শাস্তি দিতে হয়। তিনি ছোট চিঠিটা দরজায় ম্যাট-টাঙানোর ছকের সঙ্গে টাঙ্গিয়ে রাখলেনÑ যাতে রাস্তার সবাই পড়তে পারে! আর যায় কোথায়? সেই পথ দিয়ে যখনই এই তরুণ যেত, তখনই পাড়ার ছেলেরা তাকে দেখিয়ে বলত: অই সে, কুমারীসুলভ মর্যাদা দর্শনে যাচ্ছে!
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কার্যে চিঠির ব্যবহার আদিকাল থেকেই চলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এ জাতীয় চিঠি নিয়ে প্রতারণাই শুধু হয়নি, চিঠিকে ষড়যন্ত্রের অস্ত্র করে রাজ্যের শাসকই পালটে গেছে। চীনে খৃস্টপূর্ব দুইশত বিশে প্রথম সংযুক্ত চীনের চিঙ্ সাম্রাজ্য স্থাপনের পর সম্রাট চিঙ্ শি হুয়াং দেশে চরম ব্যাভিচারমূলক শাসন পরিচালনা করেন। ২১০ খৃস্ট পূর্ব সালের জুলাই মাসে মৃত্যুর পূর্বে তিনি বিতাড়িত জ্যেষ্ঠপুত্র ফু সুকে পত্র লেখেন রাজধানীতে ফিরে এসে রাজ্যভার গ্রহণের সুযোগ নিতে। ফু সু ছিলেন অত্যাচারের বিরুদ্ধে। সে জন্যে প্রধানমন্ত্রী লি সি সম্রাটের চিঠির জাল কপি প্রকাশ করে ঘোষণা করেন যে, মৃত্যুর পূর্বে সম্রাট ফু সু ও তার সমর্থক জেনারেল মেঙ তিয়ানের মৃত্যু চেয়েছেন। একই সঙ্গে মৃত সম্রাটের একটি জাল ফরমানের কথা প্রচার করে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থক দ্বিতীয় পুত্র হু হাইকে সম্রাট বলে ঘোষণা করা হয়। এভাবে সম্রাটের চিঠিও জাল করে স¤্রাট বদলে দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চিঠির গুরুত্ব ও চিঠি নিয়ে ষড়যন্ত্রের এমন ইতিহাস পৃথিবীর বহু দেশেই দেখতে পাওয়া যাবে।
বিশ্ব সাহিত্যের নানা ধারা বা শাখার মধ্যে পত্রসাহিত্য একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর পত্র লেখক-সাহিত্যিক হেনরী এডামস-এর কথা সাহিত্য কর্মের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি মাত্রেই জানেন। তাঁর সাড়ে চার হাজার চিঠির সংগ্রহ একশ’ বছর পরও মূল্যবান সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। সুন্দরী প্রেমিকা এলিজাবেথ সারম্যানের কাছেই কেবল তিনি ন’শ’ আট খানা পত্র লিখেছিলেন। বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যে চিঠির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
দুর্গাদাস বাবুর চিঠি সংক্রান্ত এতা কিছু ইতিহাস জানার কোন প্রয়োজন ছিল না। কারণ, তারই ওয়ার্ডে জেলের চিঠি নিয়ে তোলপাড় এমন এক পর্যায়ে যায় যে, অনেককে শাস্তি ভোগও করতে হয়েছে। এক পর্যায়ে দেখা গেল বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে বেছে বেছে নিরাপত্তা বন্দীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আইবি-র মূল অফিস লালবাগ ফোর্টে বা কেল্লা এলাকায়। একদিন গেলেন শহীদুল্লাহ কায়সার, পরে গেলেন সরদার ফজলুল করীম। কিশোরগঞ্জের আর,এ, এমন, সাঈদ নামক এক তরুণকেও নিয়ে যাওয়া হলো একদিন। সাঈদ পাঁচ দিন পর জেলে ফিরে আমাদের ওয়ার্ডে সরাসরি আসতে পারেনি; তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় জেল হাসপাতালে নিয়ে যায় সেপাইরা। এরপরেই আমার ডাক আসল। তিনদিন তিনরাত একটি ক্ষুদ্র পৃথক কক্ষে একটানা জিজ্ঞাসাবাদের পর আমি জেল ওয়ার্ডে ফিরে আসি। একটি চিঠি নাকি ছিল এই বিশেষ জিজ্ঞাসাবাদের কারণ। কোথাও একটি গোপন চিঠি পাওয়া গিয়েছিল, তারই সূত্র ধরে পরোক্ষভাবে গোয়েন্দা পুলিশ তথ্য আবিষ্কার করতে চেয়েছিল। সুতরাং চিঠির কারণে জেলে এলেও জেলের ভিতরেও চিঠির দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি নেই। এই সত্যটা দুর্গাদাস ক্রমেই উপলব্ধি করছিল।
একষট্টি সালের মার্চ-এপ্রিলের এক দুপুরে আমাকে এসোসিয়েশন ওয়ার্ড থেকে নিয়ে বিশ-সেল এলাকার একটি একক-সেলে পুরে দেয়া হলো। অপরাধ ছিল জনৈক ডাক্তারকে আমি মেরেছি। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়; তাই জেলশাস্তি। পাশাপাশি বিশ-সেলের এগার নম্বরে আমার আস্তানা, বাইরে জেল সেপাই প্রহরায়। সে সময় গুরুতর অপরাধীদের জন্যে নির্দিষ্ট এই ভূতুড়ে সেগ্রিগেশন সেলে আর কোন বাসিন্দা ছিল না। ছয় মাস আমাকে একা থাকতে হবে। মাস দুই যেতেই এক বিকেলে লম্বাচওড়া বলিষ্ঠ একজন নিরাপত্তা বন্দীকে আমার স্থান থেকে চার সেল দূরে এনে আটক করা হলো।
যে কোনভাবেই হোক জানতে হবে আমার মতো শাস্তি ভোগ করতে কে এসেছেন এই অন্ধকূপে। একটি মাত্র খাট প্রবেশ করতে পারে, এমনি একটি ক্ষুদ্র কক্ষের সম্মুখে লোহার গারদ। সামনে সবটা খোলা আর তিন দিকে দেয়াল, কক্ষে কোন জানালা নেই। দুপুরের রোদ সমস্তটাই বিছানায় এবং বৃষ্টি এলে কম্বল দিয়ে গারদ না ঢাকলে বিছানাটা খোলা মাঠের মতো ভিজে যায়।
পাহারাদার জেল পুলিশ সেলের নতুন অতিথির নাম বলতে নারাজ, চাকরি যাবে। এতোদিন পরে চিৎকার করে হলেও কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে আমি উৎফুল্ল। শেষে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বললাম; কে এসেছেন সেলে; আমি ফয়েজ। সুউচ্চ কণ্ঠে উত্তর দিলেন নয়া সেলবাসী; মহিউদ্দিন। আপনার কথা জানি।
তিনি থাকতেন দেওয়ানীতে, ভিন্ন ওয়ার্ডে; আমার আদিবাস দুই নম্বর ওয়ার্ড বা খাতা।
সেই থেকে আমরা চিৎকার করেই কথা বলতাম। কেউ কারো চেহারা দেখতাম না। জেল আইনে বাধা থাকলেও, এভাবে কথা বন্ধ করার তো কোন উপায় ছিল না। কিন্তু তখনো আমি জানি না মহিউদ্দিন সাহেব (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা, তখন ন্যাপ নেতা ছিলন।) কি অপরাধে নিরিবিধি সেলবাসী।
ছয় মাস সেল-শাস্তি খেটে ওয়ার্ডে ফিরে এলাম। বন্ধুদের কাছে জানতে পারলাম মহিউদ্দিন সাহেবকে কোন একটি চিঠি বাইরে প্রেরণের চেষ্টার অভিযোগে আমার মতো একক সেল-শাস্তি দেয়া হয়েছে। বিকেলে পাহারাদার জেল পুলিশদের ব্যাচ পরিবর্তনের সময় জেল গোয়েন্দা বিভাগ জনৈক পুলিশের কাছ থেকে যে চিঠিটা উদ্ধার করেছিল, সেটা নাকি, জেল কর্তৃপক্ষের মতে মহিউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে বাইরে প্রেরিত।
জেলখানায় প্রধানতঃ রাজনৈতিক কারণেই বৃটিশ আমল থেকে নিরাপত্তা বন্দীগণ নানাভাবে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আসছেন, চিঠি একটি মাধ্যমে। মহিউদ্দিন সাহেব হয়তো সেই ঐতিহ্যপূর্ণ কাজের সঙ্গেই জড়িত হয়েছিলেন।
দুর্গাকে এসে পেলাম। বললাম: তুমি চিঠি খেলার অপরাধে বাইরে থেকে জেলে এসেছ; আর একজন চিঠির কারণেই জেল থেকে সেল গিয়ে বাস করছেন।
: তাইতো বলি চমৎকার ব্যাপারটা।
সে তার প্রথম দিনর উক্তি স্মারণ করিয়ে দিল। তারপর হেসে বলল: আমার কথার নড়চড়ে নেই। এখনো রুটি খেয়ে বেঁচে আছি। আমি জেলের ভাত খাব না।

[আগামীকাল পড়ুন বইটির দ্বাদশ অধ্যায় ‘এ তো মানুষ কমিউনিস্ট কোথায়!’]

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন